“তুমিই কি এই ছবির স্টার?” — প্রশ্নটা শুনে লাজুক হাসি ফুটে উঠল ছোট মুখে। খুদে মেয়েটি ধীরে বলে উঠল, “হ্যাঁ।” একটু থেমে নিজেই যোগ করল, “জয়া আন্টি সব থেকে মিস্টি ছিল।” আর একেবারে সহজ সুরে, শিশুসুলভ আন্তরিকতায় বলে ফেলল, “তোমরা সবাই হলে গিয়ে ছবিটা দেখবে, কারণ তাতে আমি আছি।”

অহনা
শেষ আপডেট: 15 July 2025 16:53
“তুমিই কি এই ছবির স্টার?” — প্রশ্নটা শুনে লাজুক হাসি ফুটে উঠল ছোট মুখে। খুদে মেয়েটি ধীরে বলে উঠল, “হ্যাঁ।” একটু থেমে নিজেই যোগ করল, “জয়া আন্টি সব থেকে মিস্টি ছিল।” আর একেবারে সহজ সুরে, শিশুসুলভ আন্তরিকতায় বলে ফেলল, “তোমরা সবাই হলে গিয়ে ছবিটা দেখবে, কারণ তাতে আমি আছি।”
ছবির নাম ‘ডিয়ার মা’। পরিচালক অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীর ক্যামেরায় এই ছবির মাধ্যমে প্রথম অভিনয়জীবনে পা রাখল যে ছোট্ট মেয়ে, তার নাম অহনা। বয়স মাত্র ছয়। ডিপিএস রুবি পার্কের ক্লাস টুয়ের ছাত্রী। ট্রেলর লঞ্চের দিন ওর উপস্থিতি ছিল যেমন সংযত, তেমনই নিবিষ্ট। খুব বেশি কথা বলেনি, একটু আড়ষ্ট হয়তো ছিল, কিন্তু চারপাশে ঘটে যাওয়া প্রতিটা মুহূর্ত যেন গিলে নিচ্ছিল চোখের ভেতর দিয়ে। তার চাহনিতে ছিল এক ধরনের অনুভব, যেটা বয়সের তুলনায় বিস্ময়কর।
ট্রেলারে অহনাকে যতবার দেখা গেছে, তার সহজ, সরল মুখটা যেন পর্দার বাকি সবকিছুকে পেছনে ফেলে দেয়। এক মুহূর্তের জন্যেও চোখ সরানো যায় না। প্রাণবন্ত চোখে যেমন নিস্পাপ দীপ্তি, তেমনই কোথাও যেন এক নিঃসঙ্গ কষ্টও ধরা পড়ে। পরিচালক নিজেও স্বীকার করেছেন, অহনার অভিনয় শুধুই সংলাপ মুখস্থ করে বলা নয়— বরং অনুভব থেকে জন্ম নেওয়া। অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী বললেন, “আমি নিশ্চিত না ও পুরোপুরি বুঝেছিল কিনা সংলাপ বা আবেগের গভীরতা। কিন্তু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর পর যেভাবে প্রতিবার ওর চোখের ভাষা ফুটে উঠছিল, সেটা অলৌকিক। প্রায় ১৩-১৪ দিন শুট করেছি ওর সঙ্গে। একটিবারের জন্যও ওর মধ্যে ক্লান্তি বা বিরক্তি দেখিনি। ওর অভিনয়ের কথা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়েছে।”
ট্রেলার লঞ্চ অনুষ্ঠানের মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন অহনার মা মানালী দে-ও। নিজের মেয়েকে বড় পর্দায় দেখে তাঁর চোখে তখন গর্ব আর বিস্ময়ের এক মিশ্র আবেগ। তাঁর কথাতেও ধরা পড়ল এক সেই অভিজ্ঞতা। “ও ছোট থেকেই একটু আলাদা। অভিনয় ভালোবাসে, বুঝিনি, কিন্তু পর্দায় যেভাবে নিজেকে প্রকাশ করল, সেটা দেখার পর আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনে হচ্ছে, ওর ভেতরে আরও অনেক কিছু আছে, যা আমরা এখনও আবিষ্কার করিনি।” একটু থেমে তিনি বলেন, “যাকে কোলে নিয়ে ঘুরেছি, হামাগুড়ি দিতে শিখেছে চোখের সামনে, সেই মেয়েই আজ বড় পর্দায়! এটা কেমন অনুভূতি, ভাষায় বোঝাতে পারব না। অনিরুদ্ধদাকে অসীম কৃতজ্ঞতা, কারণ সেলুলয়েডে এখন ওর শৈশবটা ধরা থাকল।”
এই ছোট্ট মেয়েটির মুখই যেন থমকে দিয়েছে আরেক বর্ষীয়ান পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়কেও। বহু শিশু শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি, দেখেছেন প্রতিভা আর তার সীমাবদ্ধতাও। কিন্তু অহনার মুখে তিনি যেন দেখেছেন এক অনন্য অভিব্যক্তি। নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, ‘অনেক বছর পর একটা সিনেমার পোস্টারে, প্রচারে এক শিশুর মুখ আমায় থমকে দিয়েছে! বারবার দেখছি ওর মুখ— চেনা, অথচ এমনভাবে আগে দেখিনি। এত প্রাণবন্ত, এত উজ্জ্বল, অথচ এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতাও যেন লুকিয়ে আছে ওর চোখেমুখে। গল্পটা এখনও জানি না, তবু আটকে আছি ওর সেই সরল হাসিতে। ভালো নাম অহনা। বড় পর্দার থেকেও অনেক বড় হোক ওর জীবন। ওকে জানাই অগাধ স্নেহ আর ভালোবাসা।’
এই বয়সে কেউ জানে না, তারা যা করছে, তা কতদূর পৌঁছতে পারে, কত হৃদয় ছুঁয়ে যেতে পারে। কিন্তু কিছু কিছু মুখ, কিছু কিছু চাহনি— হয়তো নিজের অজান্তেই এমন কিছু সৃষ্টি করে, যা সহজে ভোলা যায় না। অহনা তেমনই একটি নাম। হয়তো সে নিজেই জানে না, ঠিক কত বড় এক দুনিয়ার দরজা সে খুলে ফেলেছে নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে। কিন্তু পর্দায় তার প্রতিটা উপস্থিতি, প্রতিটা ভঙ্গি যেন বলে— সে প্রস্তুত।
এই ছবির ট্রেলারই বলে দেয়, অহনার অভিনয় নিছক শেখা অভ্যেস নয়। ও যেন অনুভব করছে চরিত্রকে, নিজের মতো করে বুঝে নিচ্ছে আবেগগুলো। চোখের ভাষায়, শরীরী ভঙ্গিমায় সে যা প্রকাশ করছে, তা কোনও বড়দের চর্চিত অভিনয়ের চেয়েও অনেক বেশি বেশি সত্যি।
ভবিষ্যতে অহনা ঠিক কতদূর পৌঁছবে, সেটাই হয়তো এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নয়। বরং আজ, এই মুহূর্তে, তার নিঃশব্দ আত্মপ্রকাশ, তার স্থির চাহনি, আর ছোট ছোট পদক্ষেপ— সেগুলোই এক এক করে গড়ে তুলছে এক সম্ভাবনার পথ। আজকের দিনে অহনার এই চুপচাপ, কিন্তু দৃঢ় উপস্থিতি— এটাই বলে দেয়, বড় পর্দা নয়, জীবনটা হোক আরও বড়, আরও উজ্জ্বল। সেই কামনায়, এই মুগ্ধতা, অহনার নামের পাশে গায়ে কাঁটা দেওয়া এক অনুভবের স্মারক হিসেবে থেকে যাবে।