সিনেমার গল্প নিয়ে আলোচনায় কৌশিক শেয়ার করলেন আসল ট্রেনটি নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা - যা মানুষ, সমাজ, শিল্প - সবকিছুকে ছুঁয়ে যায় একসঙ্গে (Kaushik Ganguly interview The wall)।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 27 November 2025 20:27
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শিয়ালদহ থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে আধা গ্রাম আধা মফস্বল এলাকা - লক্ষ্মীকান্তপুর। রোজ ভোর হতেই এখানকার হাজার হাজার মহিলা উঠে পড়েন লোকাল ট্রেনে। আপ লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল (Lakshmikantapur local)। কমবেশি প্রায় সকলেই শহরে গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন। কেউ খাওয়া পরার কাজ করেন। মাসে এক আধদিনের জন্য বাড়ি ফেরেন। কেউ বা স্রেফ ঠিকে কাজ। সকালে গিয়ে দু-বাড়ি বা তিন-বাড়িতে ঘর মোছা, বাসন মাজা, কাপড় কাচা, বা স্কুল থেকে বাচ্চা আনার কাজ করে সন্ধেয় ট্রেনে চেপে ফিরে যান বাড়িতে।
এই রোজকার লড়াই আর তাঁদের বারমাস্যা নিয়েই তৈরি রামকমল মুখোপাধ্যায় (Ram Kamal Mukherjee) পরিচালিত ও কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় (Kaushik Ganguly) অভিনীত ছবি ‘লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল’। সিনেমার গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কৌশিক শেয়ার করলেন আসল ট্রেনটি নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা—যে অভিজ্ঞতা মানুষ, সমাজ, শিল্প—সবকিছুকে ছুঁয়ে যায় একসঙ্গে।
“বেড়াল ডাকছে, ওঁর ভয় লেগেছে… তাই কাজ ছেড়ে চলে গেল”
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় বলেন—“লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালে এমন মানুষও এসেছে, যে ২৪ ঘণ্টার জন্যই এসেছিল। দু’দিন থেকে কাজ ছেড়ে চলে গেছে। তখন বেড়ালদের মেটিং সিজন ছিল বোধহয়, রাতে তারা ওঁয়াও ওঁয়াও করে কাঁদছে। তার বোধহয় (পড়ুন সেই পরিচারিকার) ভয় লাগে বেড়ালের ডাক শুনলে… রাতে ঘুমোতে পারেনি, তাই কাজ ছেড়ে চলে গেল গ্রামে..”।
কৌশিকের কথায়, “কীরকম ইনোসেন্ট, ট্রান্সপারেন্ট মাইন্ড। বেড়াল ডাকছে, ওর ভয় লেগেছে, তাই কাজ ছেড়ে চলে গেল। দুম করেই চলে গেল। সে তো চলে গেল, কিন্তু পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, অভিনেত্রী চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় বিপদে পড়ে গেল”।
একটু মজা করেই কৌশিক বলেন, “সেদিন বলতে পারেন বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকে বিপদে ফেলে দিয়েছিল লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল!”
লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালে শহরে আসা একজন মহিলার কাজ ছেড়ে চলে যাওয়া হয়তো আপাত ভাবে সাধারণ ঘটনা। অথচ তা মোটেও যে সাধারণ ঘটনা নয়, সেই গল্পটাই দেখিয়েছে রামকমলের ছবিটি। যাদবপুর, সেলিমপুর, ঢাকুরিয়া, বালিগঞ্জ, শিয়ালদহে কত শত পরিবারের রোজকারের সিস্টেম দাঁড়িয়ে থাকে এই এক-একজন মহিলাকে ঘিরে। হঠাৎ কাজ ছেড়ে দিলে, শরীর খারাপ বা অন্য কারণে ডুব দিলে সেই সিস্টেম মুহূর্তে বসে যায়। তবে এ ঘটনায় কখনও একটি ছবির শ্যুটিং শিডিউলও যে ঘেঁটে যেতে পারে, কৌশিক গল্প না শুনলে জানা যেত কী!
কৌশিক বলেন—“আমার পরের দিন শুটিং আছে, সে কী অবস্থা বাড়িতে! কে কোথায় যাবে, কী করবে! কেউ বুঝতে পারছে না। অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা হয় এইসব ট্রেনকে ঘিরে।”
লোকাল ট্রেন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়—এ যেমন সমাজের আর্থিক ভাবে অনগ্রসর একটা শ্রেণির কাছে কর্মসংস্থান, সন্তানের মুখে দু'মুঠো খাবার তুলে দেওয়া, স্বপ্ন, আর টিকে থাকা তেমনই সমান্তরাল আরও একটা ছবি থাকে। তা হল শহর কলকাতার অবলম্বন। কৌশিকের এই ছোট গল্পে যেন অবলম্বনের কাহিনীটাই ধরা আছে।
তাঁর কথায়, “কলকাতার একটি পরিবারের শিশু বলুন বা পোষ্য—সবার জীবন এই ট্রেনের ওপর দাঁড়িয়ে। আমরা তো সমস্ত হাঁড়ির ভাত টিপে টিপে দেখি না সেদ্ধ হয়েছে কিনা। দুটো-তিনটে দেখে বুঝি। লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল ছবিটিতেও তিনটে জীবনকে দেখলে বোঝা যাবে, আমাদের এই শহর কলকাতা বা আশপাশের জায়গাগুলো কীভাবে, কাদের ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে”।
এক রাতের ‘ট্রানজিট’ যাত্রী
লোকাল ট্রেনের গল্প শুধু শ্রমজীবী মানুষের উপাখ্যান নয়, কখনও তা থ্রিলারের মতো মোচড় দিয়েও ওঠে। অভিনেতা ও পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সেরকম অভিজ্ঞতাও রয়েছে। বললেন,“একবার একটি মেয়েকে নিয়ে এল, এজেন্সি থেকেই নিয়ে এল। সে এসেছিল খুব সেজেগুজে। আনকমফর্টেবল লাগছিল আমার”। পরিচালক রামকমল যেচে বলেন, ‘কৌশিক দা আন-ইউজুয়াল বলতে পারো।’ মানে সচরাচর এমনটা তো হয় না!
কৌশিক বললেন, “না আনকম্ফর্টেবল। এমন জামা পরেছে, কনুই পর্যন্ত লেসের জামা টামা... একটু বেশি সাজা বুঝেছ! আমি ভাবলাম এত সেজে কাজ করতে এসেছে কেন? পরের দিন চলে গেল—বলল, কাজ করবে না। পরে বুঝলাম ওকে অন্য কোথাও পাঠানো হচ্ছিল, কলকাতায় এক রাত থাকার প্রয়োজন ছিল। ট্রানজিটে ছিল। পরের দিন উইথড্র করে অন্য লোক দিয়ে দিল এজেন্সি।”
কৌশিক যে অভিজ্ঞতার কথা বলছেন, লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল নিয়ে এমন হয়তো গল্প সমগ্র রয়েছে এই শহরের কত ঘরে। তাঁর কথায়, “এমন কত গল্প রয়েছে একটা ট্রেনে। সারা বছর ধরে লোকাল ট্রেনের গল্পের জন্য একটা হল (প্রেক্ষাগৃহ) রেখে দেওয়া যায়।”
শান্তিগোপালের যাত্রা, কার্ল মার্ক্স এবং লোকাল ট্রেন
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় এই লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালকেই আবার একটু দার্শনিকভাবেও দেখার চেষ্টা করেছেন এদিনের আড্ডায়। তাঁর ভাবনার যে গভীরতা রয়েছে তা কৌশিকের অভিনয় ও তাঁর তৈরি ছবিতেও দেখা যায়। অভিনেতার পর্যবেক্ষণ তীক্ষ্ণ না হলে একজন এমনি এমনিই কি ‘শঙ্কর মুদি’ হয়ে যেতে পারেন!
কৌশিক বলেন, লোকাল ট্রেনের গল্প মানেই জীবনযুদ্ধ। কখনও বিক্রি হচ্ছে আমলকী বা নেলক্লিপার, কখনও একজন মহিলা হারমোনিয়াম বাজিয়ে স্পিকার কাঁধে নিয়ে গান গাইছেন—নিজস্ব সিস্টেম সাজিয়ে। “সে কিন্তু কারও কাছ থেকে চায় না… মানুষ হয়তো দু’টাকা দেয়, তবু সে নিজের মতো করে বাঁচছে।”
জানলার ধারে চার জন তাস খেলছে—হাঁটুতে দড়ি বেঁধে রুমালকে টেবিল বানিয়ে। “জানেন কেন? কারণ তাঁদের যেতে দেড় ঘণ্টা লাগে। রোজকার ‘অ্যাগনি’-কে ভুলে থাকার জন্য রসিকতা, হাসিঠাট্টা, খেলাধুলো চলে।”
শৈশবের স্মৃতি টানেন কৌশিক। গল্পের মতো বলে চলেন তাঁর জীবনের পুরনো অভিজ্ঞতার কথা। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে খুব মসৃণভাবে লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালকে মিশিয়ে দিতে হয়তো তিনিই পারেন—“কার্ল মার্ক্সকে নিয়ে একটা যাত্রা করেছিলেন শান্তিগোপাল। ছোটবেলায় দেখেছি, মনে আছে এখনও। সেখানে একটা দৃশ্য ছিল—কার্ল মার্ক্সের সংসার চলছে না, তিনি খেতে পাচ্ছেন না। বাড়িতে অভাব, স্ত্রীর গঞ্জনা। কার্ল মার্ক্স ঘোড়া সেজে, বাচ্চাদের পিঠে নিয়ে খেলছে। স্ত্রী এসে বকাবকি করে বাচ্চাদের বার করে দিলেন, বলছেন খেলছ কেন? খাবার জোটেনি। তিনি বলছেন, খিদে ভুলে থাকার একমাত্র পথ হল খেলাধূলা করা। আমাদের এখানকার এই মানুষরা, যাঁরা লড়াই করে বেঁচে রয়েছেন, তাঁদের ওই লোকাল ট্রেনে যে খেলাধূলা, তার মাধ্যমেই এই যন্ত্রণাগুলো ভুলে থাকেন বলে আমার মনে হয়”।
কৌশিকের কথায়, “এই ট্রেন আমাদের শহরকে বাঁচিয়ে রাখে—অদৃশ্য শক্তির মতো। আর সেই শক্তির গল্পই বলেছে ‘লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল’ ছবিটি। একেবারে ঘরোয়া, তবু গভীর সেই গল্পগুলো”।