
শেষ আপডেট: 14 August 2023 02:35
বর্তমানে সবথেকে যে সিরিয়াল আলোচনায় রয়েছে, সেটি হল লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র অর্ক গঙ্গোপাধ্যায়ের নিবেদনে 'কার কাছে কই মনের কথা' (Kar Kache Koi Moner Kotha)। সদ্য বিবাহিতা শিমুলের শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকটি সদস্যই যেন সমাজের অন্ধকার দিক প্রদর্শন করছে। যেমন তাঁর দজ্জাল শাশুড়ি, তেমনি কুচক্রী দেওর, বাদ যায় না স্বামী পরাগ চরিত্রটিকেও। ওই বাড়ির একমাত্র 'সুস্থ' মানুষ হল, বিশেষ ভাবে সক্ষম ননদ পুতুল। সেটুকুই নতুন বৌ শিমুলের আশ্রয়।

যে স্বামীর হাত ধরে শিমুল শ্বশুরবাড়িতে পা রেখেছে, সেই পরাগ কখনও শিমুলের পাশে দাঁড়ায় না। উল্টে সে সারাদিনে স্ত্রীকে নানাভাবে ধমক দেয় আর অপমান করে। তবে রাতের বেলা স্ত্রীর থেকে ঠিকই বুঝে নিতে চায় শারিরীক হিসেব-নিকেষ, জোর করে হলেও। অথচ স্বামী পরাগ চরিত্রটি একজন শিক্ষকের। সে কো-এড স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়ে এসে বাড়িতে স্ত্রীর উপর রীতিমতো অত্যাচার করে।

প্রশ্ন উঠেছে, এমন শিক্ষক কি বাস্তবে হয়? নাকি সবটাই সিরিয়ালের টিআরপি বাড়াতে! এমন সব অত্যাচারের দৃশ্য অবতারণা করা হচ্ছে, যা দেখে সহ্য করা কঠিন অথচ দর্শকদেরই একাংশ বলছেন, সিরিয়ালে যা দেখানো হচ্ছে তা যে একেবারই অবাস্তব কিছু, তা নয়। বাস্তব সমাজেই এমন শিক্ষক রয়েছেন, যাঁরা আদতে মুখোশ পরে ঘোরেন। স্ত্রী তাঁদের কাছে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো। স্ত্রীর মনের খবর এই শিক্ষকরা রাখেন না। স্কুলে তাঁরা শিক্ষক হলেও বাড়িতে তাঁরা রীতিমমতো প্রভুর মতো শাসন করেন এবং ভোগ করেন স্ত্রীকে।

এই সিরিয়ালের গল্প এখন আর কেবল শাশুড়ি-বৌমার দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিমুলের স্বামী পরাগও কিছু কম যায় না। সে অঙ্কের শিক্ষক। কিন্তু নিজের স্ত্রীর সঙ্গে প্রতিনিয়ত সে যে দুর্ব্যবহার করে চলেছে, তা মেনে নিতে পারছেন না দর্শকরা। বউকে উঠতে-বসতে শুধু খোঁটা দেওয়া নয়, পরাগ স্ত্রীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ার জন্য জোরাজুরি করতেও পিছপা হয় না।

অনেক দর্শকের মতে, প্রাইম টাইমে এই সিরিয়াল পরিবারের সঙ্গে বসে দেখা যাচ্ছে না। স্বামী-স্ত্রীর বন্ধ ঘরের কথাবার্তা অবলীলাক্রমে সংলাপে রাখা হচ্ছে। পরাগ চরিত্রটি তাঁর স্ত্রীকে দিনের বেলা মায়ের সঙ্গে দল বেঁধে অপমান করে। আর রাতের বেলা সে বৌকে বলে "তোমার সঙ্গে আমার রাতের বেলার কিছু হিসেবনিকেশ আছে, সেগুলো আমি মিটিয়ে নেবই।" তাঁর সংলাপের আরও উদাহরণ, "মেয়েরা আবার কখনও ছেলেদের বন্ধু হয় নাকি? তোমাকে যা যা করতে বলব তা তুমি করতে বাধ্য। তুমি আমার বিয়ে করার বৌ। বিছানায় চলো।"

শিমুল চরিত্রটি খানিকটা হলেও প্রতিবাদী। তাই সে স্বামীর ভোগবাসনা মেটানোর শিকার হলেও এই রোজকার বৈবাহিক ধর্ষণের প্রতিবাদ করে। আর এই প্রতিবাদটাই ভাল লাগছে বহু মহিলা দর্শকের। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বলছেন, তাঁদের সঙ্গে ঘটা ঘটনাই যেন পর্দায় উঠে আসছে। তাঁরা গলা তুলে বলছেন, বিয়ের সময় কেবল মেয়েটিকে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলার আগে শ্বশুরবাড়ির লোকরা কেমন, সেটা যাচাই করা হোক। শুধু সরকারি চাকরি করা জামাই হলেই সে সত্যিকারের মানুষ হয় না। সরকারি চাকরি, স্কুল মাস্টার পরিচয় সমাজের চোখে বড় অলঙ্কার হলেও, তাঁদের ভিতরকার কর্কশ প্রবৃত্তিগুলো নেভে না। স্ত্রীর উপর তাঁরা অধিকার ফলানোর চেষ্টা করেন সবরকম ভাবে। বহু মেয়েকেই এই অত্যাচার সহ্য করে যেতে হয় সারাজীবন। সমাজও তাঁদের পাশে দাঁড়ায় না, দাঁড়ায় না বাপের বাড়ির মা-ভাইরাও।

তাই দর্শকদের নজরে পরাগ এ সিরিয়ালের নায়ক নয়, বরং খলনায়ক পরাগ চরিত্রে অভিনয় করছেন দ্রোণ মুখার্জী। দ্রোণ গত ২০ বছর ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনয় করলেও এই প্রথম এতটা চর্চায় উঠে এসছেন। দ্রোণ বোলপুরের ছেলে, ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তবে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন অভিনয়কে। জি বাংলার পর্দায় নতুন মুখ হলেও, এর আগে তাঁকে দেখা গেছে অনেক ধারাবাহিকে। আকাশ আটে-র একাধিক ধারাবাহিকে তাঁকে দেখা গেছে।

ধারাবাহিকের নির্মাতারাও এই চরিত্রটিকে নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন না। সে মায়ের মন রাখতে সদ্য বিয়ে করা বৌকে ডিভোর্সের হুমকি দিতে পারে, বৌয়ের গান বন্ধ করতে হারমোনিয়াম রেখে দিয়ে আসতে পারে চিলেকোঠায়, কিংবা সারা রাত বাড়ির বাইরে বউকে বের করে দিতে পারে মা ছেলে মিলে। বাংলা সিরিয়ালে এমন নায়ক চরিত্রের দেখা এর আগে মেলেনি। কথায় কথায় শিমুলকে অপমান করা, খোঁটা দেওয়া, তার ইচ্ছের মূল্য না দেওয়া-- এসব তো বিয়ের দিন থেকেই শুরু হয়ে যায়। বিয়ের পর পরাগের তীব্র কুরূপ দেখছে শিমুল। শিমুলের চরিত্রে মন জয় করছেন মানালি দে। আর শিমুলের শাশুড়ির চরিত্রে রয়েছেন ঋতা দত্ত চক্রবর্তী।

দিন কয়েক আগেই তুমুল সমালোচিত হয়েছিল এই সিরিয়ালের মা-ছেলের ফুলশয্যা দৃশ্য। এবার নিন্দার ঝড় তুলেছে শিক্ষকের নিন্দনীয় চরিত্র। বহু দর্শক বলছেন, শিক্ষক হলেই তাঁদের মনের বিকাশ হয় না। পুঁথিগতবিদ্যায় শিক্ষিত হয়েও আদতে তাঁরা পড়ে থাকেন অন্ধকার মধ্যযুগে। একের পর এক বর্বরতা তাঁদের চরিত্রে প্রকাশ পায়।