একইসঙ্গে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দুই গোত্রের ধ্রুপদী সংগীতেই মুনশিয়ানা ছিল সত্যজিতের। তাঁর যে কোনও ছায়াছবি, যেখানে তিনি নিজে আবহসংগীত পরিচালনা করেছেন, খুঁটিয়ে দেখলে, মন দিয়ে শুনলে বিষয়টি বোঝা যায়।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 27 May 2025 11:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক বেকার গ্র্যাজুয়েট। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখে। উচ্চাশী। বিত্তবাসনার অন্ত নেই। পরিশ্রমীও বটে। কিন্তু শিকে ছেঁড়ে না।
থাকে দু'কামরার ভাড়াবাড়িতে। কাজের খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটে বেড়ায়। উদয়াস্ত পরিশ্রম। অবসাদ। কিন্তু দেখনদারিও ষোলো আনা! ভিখিরির সামনে শো-অফ করে আমোদ পায়। আবার পরক্ষণে বুঝতে পারে, তার জমানো নগদ ওই ভিখিরির চেয়েও কম!
রাস্তায় বেরিয়ে পথচলতি মানুষের বোলচাল লক্ষ্য করে। দেখে—এক সুন্দরী যুবতী গয়নার দোকানে দামি কানের দুল পছন্দ করছে। আবার সেই মেয়েই কিনা চাকরির দরখাস্ত দিতে লম্বা লাইনে হাপিত্যেশ দাঁড়িয়ে!
একদিন এক মাতাল পয়সাওয়ালা ব্যবসায়ীকে রাস্তার ধারে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে ওই যুবক৷ পকেট নাড়াচাড়া করতেই বেরিয়ে আসে ‘পুষ্পক’ নামে এক ঝাঁ-চকচকে হোটেলের জমকালো স্যুটের চাবি। কালবিলম্ব না করে সে ওই ব্যক্তিকে বাড়ি এনে বন্দি করে রাখে। তারপর হোটেলের চাবি নিয়ে শুরু হয় বিত্তবান ব্যবসায়ীর জীবনযাত্রার হুবহু নকল!
এই সূত্রে যুবকের জীবনে ঘনিয়ে আসে বিপর্যয়। অনেকের নজরে আসে, সন্দেহ দানা বাঁধে। এক সুপারি কিলারের টার্গেট পর্যন্ত বনে যায়৷
আর কী কী হয় সেই গল্প ধরা আছে ফিল্মের পর্দায়। গল্পটা বুনেছিলেন দক্ষিণী পরিচালক শ্রীনিবাস রাও (Singeetam Srinivasa Rao)৷ আজ থেকে ৩৮ বছর আগে, সেই ১৯৮৭ সালে!
ছায়াছবির নাম ‘পুষ্পক বিমান’ (Pushpak Vimana)। নির্বাক চলচ্চিত্র। যেখানে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন অভিনেতা কমল হাসান (Kaamal Hasan)। এরপর দিন পেরিয়েছে, বছর ঘুরেছে। একের পর এক ব্লকবাস্টার ফিল্ম, রুপোলি পর্দায় স্মরণীয় পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন কমল। কিন্তু পুষ্পকের (Pushpak) মতো চ্যালেঞ্জিং রোলে তাঁকে খুব একটা দেখা যায়নি।
সম্প্রতি আসন্ন চলচ্চিত্র ‘থাগ লাইফে'র (Thug Life) (পরিচালক মণি রত্নম) প্রচারে একটি পডকাস্টে অতিথি হিসেবে এসেছিলেন কমল। সেখানে তাঁর অভিনয় জীবনের একের পর এক বাঁকবদল, ঘটনা-দুর্ঘটনা নিয়ে আলাপচর্চা শুরু হয়৷ কথাপ্রসঙ্গে উঠে আসে পুষ্পক! আর দর্শক-শ্রোতাদের খানিক চমকে দিয়েই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক পুষ্পকের সুখ্যাতি করতে গিয়ে দাঁড় করান সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) একটি বক্তব্য! যেখানে প্রাবন্ধিক সত্যজিৎ এই দক্ষিণী ছবির ন্যারেটিভ স্টাইল এবং বিশেষ একটি দৃশ্যের সুখ্যাতি করেছিলেন। যেভাবে সংলাপ ছাড়াই বেহুঁশ এবং তারপর বন্দি এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজিয়েছেন পরিচালক, তাকে একটি নিবন্ধে সাবাশি জানিয়েছিলেন কিংবদন্তি বাঙালি পরিচালক!
এখানেই বিষয়টা শেষ হতে পারত। কিন্তু এরপরই শোয়ের সঞ্চালকের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আরও একটি ‘ট্রিভিয়া’ জুড়ে দেন স্বয়ং কমল। জানান, সবকিছু ঠিক থাকলে আর ঠিকঠাক সময়ে ঘটলে হয়তো এই ফিল্মের সংগীত পরিচালক হতে পারতেন সত্যজিৎ রায়!
ঠিক কী জানিয়েছেন কমল? সত্যজিতের প্রশংসার কথা শুনে খানিক হতাশার সুরে আবেগ মেশানো গলায় তিনি বলে ওঠেন, ‘আমরা ছবির সংগীত পরিচালনার জন্য সত্যজিতের সঙ্গে যোগাযোগের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছিলাম। কিন্তু সুযোগ হাতছাড়া হয়। এর জন্য এখনও কপাল চাপড়াই! বাজারের চাপ ছিল প্রবল৷ তাই সবকিছু সেরে তড়িঘড়ি ফিল্ম রিলিজ করে দিতে হয়।’
একইসঙ্গে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দুই গোত্রের ধ্রুপদী সংগীতেই মুনশিয়ানা ছিল সত্যজিতের। তাঁর যে কোনও ছায়াছবি, যেখানে তিনি নিজে আবহসংগীত পরিচালনা করেছেন, খুঁটিয়ে দেখলে, মন দিয়ে শুনলে বিষয়টি বোঝা যায়। পুরোদস্তুর নির্বাক ছবি ‘পুষ্পক’, যেখানে একটিও সংলাপ নেই, চরিত্রের অভিব্যক্তি জীবন্ত হয়েছে সুরে, ধ্বনিতে, সেখানে সুরকার সত্যজিতের সংযোজন যে এই ক্লাসিক চলচ্চিত্রকে আরও ব্যাপ্তি এনে দিত, এত বছর বাদে সে কথা স্বীকার করতে কুণ্ঠিত নন কমল৷ রাখঢাক না করেই বলেছেন, ‘ব্যাপারটা ঘটলে আমাদের ছবি অন্য মাত্রা পেত। উনি আমাদের অনেক পরামর্শ দিতে পারতেন। আর সত্যি বলতে, চলচ্চিত্রে সংগীতের জন্য তাঁর কথা ভাবা হচ্ছে—এটা না জানা সত্ত্বেও সত্যজিৎ যেভাবে পুষ্পকের নাম করেছেন, তাতে বোঝাই যাচ্ছে কত বড় সুযোগ হাতছাড়া করেছি!’
এরপর আরও একধাপ এগিয়ে কমল জুড়ে দেন, ‘আমরা ভাবছি তিনি কাজটা করতে পারতেন। আসলে সত্যজিতেরই সংগীত পরিচালনা করা উচিত ছিল৷ যেভাবে পুষ্পকের একটিমাত্র দৃশ্যের প্রশংসা করেছেন, আমি নিশ্চিত, ছবিতে কাজ করে তিনি আনন্দ পেতেন। আমরা সত্যি সোনার সুযোগ হারিয়েছি। এই ইন্ডাস্ট্রি খুঁজলে এমন অজস্র হারানো সুযোগের কথা আপনি জানতে পারবেন!’