আলোলিকা ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় হেমন্তের আকাশ প্রদীপ হাতে তিন কবিকে প্রাসঙ্গিক করে তুলছেন এই বর্তমান সময়ে। তিন কবির গানকে বাংলা থেকে আন্তর্জাতিক করেছেন সঙ্গীতশিল্পী।
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 14 September 2025 17:32
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোকে তাঁর সমসাময়িক যুগের কবিরা চিরকালই কম আলো পেয়েছেন। কাজী নজরুল ইসলাম কিছুটা আলো পেলেও বাকিরা একেবারেই ব্রাত্য। রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকাতে গিয়ে বাকিদের দিকে প্রদীপ ধরার লোক পাওয়া যায় না। অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, তিন স্রষ্টা গীতিকার ও সুরকার রূপে বাংলা গানকে যে ভাবে সমৃদ্ধ করেছেন, সে তুলনায় প্রাপ্য মর্যাদা তাঁরা কিন্তু পাননি।
অতীতে যদিও এই তিন কবির গানের কদর করার সমঝদার শ্রোতা ছিল, বর্তমানে একদমই শ্রোতার সংখ্যা কমে আসছে ক্রমশ। কিন্তু সব আলো একেবারেই নিভে যায়নি। আলোলিকা ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় (Riddhi Bandyopadhyay) হেমন্তের আকাশ প্রদীপ হাতে তিন কবিকে প্রাসঙ্গিক করে তুলছেন এই বর্তমান সময়ে। তিন কবির গানকে বাংলা থেকে আন্তর্জাতিক করেছেন সঙ্গীতশিল্পী ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, 'ঋদ্ধি অ্যাকাডেমি মিউজিক অ্যাকাডেমি' আজ বড় নাম। একার জোরে ঋদ্ধি নিজের অ্যাকাডেমিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বাংলার নানা প্রান্তে। পঞ্চকবির গান ও নাটকের গান যেখানে অথেনটিক ভাবে শেখানো হয়। গুরু পূর্ণিমার (Guru Purnima) দিন 'উইজডোম ট্রি' ক্যাফে তে ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রদ্ধা জানালেন তাঁর সঙ্গীত জীবনের সকল গুরুকে। নিজের গুরুদের গল্প দ্য ওয়ালে এক্সক্লুসিভলি বললেন ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়।

একাধারে মঞ্জু গুপ্ত, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়, চণ্ডীদাস মাল, সুশীল চট্টোপাধ্যায়,মায়া সেন, শৈলেশ দাস, বাণী ঠাকুর, দেবজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক সঙ্গীতগুরুর কাছে গান শিখেছেন ঋদ্ধি।
দ্য ওয়ালে তিনি বললেন 'কোন্নগরের মেয়ে আমি। মফস্বলের মেয়ে হয়ে কলকাতার শিল্পী হয়ে ওঠার লড়াইটা কম নয়। একদম ছোটবেলায় কোন্নগরে তিন বছর বয়সে গান শেখা শুরু দীপালি মজুমদারের কাছে। তারপরে সুধীর পাকড়াশীর কাছে। এরপর ক্লাস সিক্স থেকে মঞ্জু গুপ্তর কাছে আমার গান শেখার শুরু। উনি রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল তিন কবির গানের অথেনটিক সিঙ্গার ছিলেন। মঞ্জু গুপ্তর মতো শিল্পী আগে বা পরে কেউ আর আসেনি। কোনওরকম দাঁত চেপে সঙ্গীত পরিবেশনের রক্ষণশীলতা ওঁর ছিল না। সেটা ঐ ছোটবেলায় আমি রপ্ত করেছিলাম। আমি কলকাতায় বাবার সঙ্গে এসে শিখতাম। বড় বড় শিল্পীদের কাছে শেখা আমার কলকাতা এসেই। সবাই যাঁরা পরে এলেন তাঁরা গায়িকা, কিন্তু মঞ্জু গুপ্ত ছিলেন সাধিকা। উনি তখন আত্মহত্যা করেন। যা বাংলা সঙ্গীত জগতের ক্ষতি। অথচ এমন সাধিকাকে নিয়ে কোথাও কথা হয় না।'

লেডি ব্রেবোন কলেজে পড়াকালীন ঋদ্ধির কলকাতা এসে গান শেখা আরও বিকশিত হয়। তিনি জানালেন 'ব্রেবোনে পড়ার সময় সকালবেলা কৃষ্ণাদির মার্লিন পার্কের বাড়িতে গান শিখে আমি তারপরে কলেজে যেতাম। কৃষ্ণাদি আমার গান এতই পছন্দ করেছিলেন সেজন্য আমাকে উনি একা শেখাতেন। এরপর রবীন্দ্রনাথের গান শেখা বালিগঞ্জ প্লেসে মায়া সেনের কাছে। সেও এক বিরল অভিজ্ঞতা। যদিও মায়াদির কাছে বেশিদিন শিখিনি। এরপর গান শেখা শুরু বাণী ঠাকুরের কাছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বালিগঞ্জ ল কলেজে আমাদের ইতিহাসের ক্লাস হত। হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট ছিল। উল্টোদিকেই বাণী ঠাকুরের বাড়িতে গান শিখতে কলেজ শেষে চলে যেতাম। বাণীদির বাড়িতে আমার জন্য ভাত আর নানা পদ রাখা থাকত। কখনও বা পাউরুটি-মাখন-কলা। ওঁরা জানতেন আমি কলেজ থেকে যাব খিদে পেয়ে যাবে। এইরকম গুরু আজকাল কোথায়? এছাড়া ঐসময় ডাঃ দীনেশ দাশের কাছেও গান শিখেছিলাম। উনি ছিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ছাত্র। ওঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, রাজনৈতিক কারণে। কলেজে পড়ার সময় কোন্নগর থেকে বালিতে এসে চণ্ডীদাস মালের কাছে গান শিখতাম।'
ঋদ্ধি-দেবজিৎ জুটি আজও বাংলা নাটকের গান ও পুরাতনী গানে। তবে স্বামীর পরিচয়ের থেকে বেরিয়ে ঋদ্ধি নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন।

ঋদ্ধি বললেন দ্য ওয়ালে "এরপর পুরাতনী বাংলা গান, নাটকের গান শিখতে আসা দেবজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Debojit Bandyopadhyay) কাছে। ওঁর কাছে গান শেখার কদিন পরেই প্রেম থেকে বিয়ে। এক মাসের আলাপেই বিয়ে হয়ে যায়। গান শিখতেই এসেছিলাম। দু'জনে একসঙ্গে গান গাইব বলেই বিয়ে করি আমরা। আমাদের বয়সের তফাত ছিল। কিন্তু সেটা কখনোই বাঁধা হয়নি। দু'জনেরই দু'জনকে ভাল লাগে। নাটকের গানের অলিগলি শেখা ওঁর হাত ধরেই। কিন্তু মধ্যবিত্ত বাড়িতে যা হয় ছেলে হল। সংসার, স্বামী, সন্তান সামলাতে গিয়ে আমার গানের জীবন পিছিয়ে পড়ছিল। অনেক লড়াই করে আমাকে আবার গানের জগতে ফিরতে হয়। ইন্ডাস্ট্রির লোকদের থেকে বা একাধিক লোকের থেকে শুনি আমার স্বামী নাকি আমার জায়গাটা করে দিয়েছেন। একটা কথা আমি জানি, পৃথিবীতে সবথেকে মানুষ নিজেকে ভালবাসে। সেই ক্ষমতা আমার বরের থাকলে আগে উনি নিজের জায়গা করতেন, তারপর আমার জায়গা করে দিতেন। নিজেকেই নিজের জায়গা করতে হয়। কেউ কারুর জায়গা করে দেয় না। প্রত্যেকের একক পরিচয় থাকে। আমি ক্লান্ত দেবজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী শুনতে শুনতে। দেবজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ও ক্লান্ত ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বামী শুনতে শুনতে। তাঁর বিষয়ভিত্তিক পাণ্ডিত্যের আমি কখনও অস্বীকার করি না। তেমনই আমার জায়গাটা আমি খুব লড়াই করে পেয়েছি। আন্তর্জাতিক ভাবে পেয়েছি। এই গানের জগতের অনেকেরই অনেক রাগ আছে আমার উপরে। কিন্তু আমি ঈশ্বরবিশ্বাসী মানুষ। আমার মনে হয় আমার কপালে যতটা আছে, ততটাই পাব। নিজের মনকে নোংরা করে আর মারামারি করে কোনও লাভ নেই। ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় মিউজিক অ্যাকাডেমির মাধ্যমে তিন কবির বিস্মৃত গানকে আমি আরও আন্তর্জাতিক করে তুলব।'