সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের নীরব প্রেক্ষাগৃহে সেদিন এক অদ্ভুত আবহ তৈরি হয়। আলো নেভার সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় ফুটে উঠেছিল জীবনের চারটি আলাদা পথ, চারটি আলাদা অনুভব—সব মিলিয়ে এক যাত্রার নাম ‘চার দিকের গল্প’।

শেষ আপডেট: 11 December 2025 11:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের নীরব প্রেক্ষাগৃহে সেদিন এক অদ্ভুত আবহ তৈরি হয়। আলো নেভার সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় ফুটে উঠেছিল জীবনের চারটি আলাদা পথ, চারটি আলাদা অনুভব—সব মিলিয়ে এক যাত্রার নাম ‘চার দিকের গল্প’। বিশেষ প্রদর্শনে হাজির ছিলেন ছবির কলাকুশলী, শিল্পী-অতিথিরা। আর সেই বিশেষ মুহূর্ত পেরিয়ে ছবিটি আজ পৌঁছে গেছে দর্শকদের আরও কাছাকাছি—মুক্তি পেয়েছে চন্দ্রকোণ-এর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে।

প্রণবেশ চন্দ্র তাঁর এই ছবিকে সাজিয়েছেন যেন এক গদ্যের মতো। হাওড়া থেকে উত্তরবঙ্গগামী একটি ট্রেনের কামরায় পাশাপাশি বসা দুই যাত্রীর কথোপকথনেই খুলে যায় চারটি গল্পের দরজা। একজন চলচ্চিত্র পরিচালক ও লেখক—সমদর্শী দত্ত। অন্যজন ইন্দ্রাশিস আচার্য—এক ডিটারজেন্ট কোম্পানির মার্কেটিং হেড, যিনি পেশার বাইরে গল্প লেখাকে নিজের গোপন ভালোলাগা হিসেবে আগলে রেখেছেন। তাদের আলাপচারিতা ক্রমে রূপ নেয় গল্প শোনানোর খেলায়। আর সেই খেলায় রেললাইনের ওপর দিয়ে ছুটে যেতে যেতে খুলে যায় জীবনের নানা অন্ধকার-আলো মেশানো অধ্যায়।
প্রথম গল্পে রয়েছে এক শিল্পীর অপূর্ণতার হাহাকার—নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে না পারার বেদনাময় অস্থিরতা। দ্বিতীয় গল্পে ফুটে ওঠে এক মূর্তি-শিল্পীর নীরব ক্ষোভ, যার কৃতিত্ব আলো পায় না, থেকেও থাকে অন্ধকারের গোপন কোণে। তৃতীয় গল্পে মানুষের দৈনন্দিন আপস—অন্যায়ের সামনে নিজের ভালোটুকুকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় যে মুহূর্তে ভেঙে যায় নৈতিকতার ভিত।

আর চতুর্থ গল্পটি যেন জীবনের সবচেয়ে চেনা সত্য—অপরের ভালোর জন্য ছুটতে ছুটতে নিজের চাওয়া-পাওয়াগুলো কোথায় হারিয়ে যায়, জানা থাকে না। এই চারটি ভিন্ন অনুভব এক সুতোর মালার মতো গেঁথে গিয়েছে ছবির নামের মধ্যেই—চার দিক, চার গল্প, চার সত্য। অসংখ্য আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত, পুরস্কৃত ও প্রশংসিত হয়েছে এই ছবি। আর এবার ডিজিটাল মাধ্যমের কল্যাণে তা পৌঁছে গেল আরও বিস্তৃত দর্শকমহলে।
ছবির নির্মাতা প্রণবেশ চন্দ্র বললেন, “খুব সহজ কথায় বলা গল্পের ছবি এটি। জীবনের বাস্তবতা মাথায় রেখে চারটি গল্পকে একটি সূতোয় বাঁধার চেষ্টা করেছি। আশা করি দর্শক ছবির মাধুর্য অনুভব করবেন।” প্রদর্শনীতে উপস্থিত গায়ক সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়ও প্রশংসা না করে পারেননি। তাঁর কথায়, “প্রণবেশের কাজে একটা আলাদা মাধুর্য আছে। বিজ্ঞাপনের জগৎ থেকে এলেও ছবি বানানোর সময় তিনি দু’টি মাধ্যমকে অনন্য দক্ষতায় আলাদা করে রাখতে জানেন।”

ট্রেনের জানলায় ভেসে ওঠা নদী-বন-আকাশ যেমন এক যাত্রার ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্য হয়ে ওঠে, ‘চার দিকের গল্প’-এর চারটি গল্পও তেমনই জীবনের আলাদা রঙ নিয়ে আসে সামনে। কোথাও নিঃশব্দ যন্ত্রণা, কোথাও নৈঃশব্দ্যের মধ্যেকার সৃষ্টিশীলতার দীপ্তি, কোথাও আবার মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্ব। সবশেষে থেকে যায় মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার অদৃশ্য সূতোর টান।