আধুনিক বিট, লেয়ার্ড ভোকাল আর সিনেমাটিক ড্রামার সঙ্গে মিশে গানটি (Ishq Jalakar) পৌঁছে গেছে নতুন প্রজন্মের কাছে, যাঁরা হয়তো কখনও আসল কাওয়ালি (Qawwali) শোনেননি।

শেষ আপডেট: 15 December 2025 17:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এই মাসে মুক্তি পাওয়ার পর খুব দ্রুতই বোঝা গিয়েছিল, ধুরন্ধর (Dhurandhar) শুধু বক্সই অফিস সাফল্য নয়, আরও নতুন নানা গল্প লিখতে চলেছে। হাই-অকটেন অ্যাকশন, লার্জার দ্যান লাইফ চরিত্রের পাশাপাশি ছবির সাউন্ডট্র্যাকও (Dhurandhar soundtrack) দর্শকদের মনে আলাদা জায়গা তৈরি করে নিয়েছে - তাও এমন এক সময়ে, যখন ছবির গান সাধারণত মুক্তির উইকএন্ড পেরোলেই আলোচনার বাইরে চলে যায়। ধুরন্ধর (Dhurandhar)-এর গান একের পর এক ট্রেন্ড করছে - রিল, এডিট আর আলোচনায় ভরে উঠছে সোশ্যাল মিডিয়া।
এই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি গান, ইশক জালাকার কারভাঁ (Ishq Jalakar–Karvaan)। শুনলে একঝলক মনে হয় আধুনিক সিনেমার জন্যই বানানো, অথচ এর শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে বহু দশক পিছনে, ইতিহাসের গভীরে। অনেকেই এখন বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করছেন, এই গানটির উৎস একটি ৭০ বছরেরও বেশি পুরনো কাওয়ালি (Qawwali)।
কেন আলাদা করে নজর কাড়ছে Ishq Jalakar–Karvaan?
ধুরন্ধর অ্যালবামের সব গানের মধ্যেই ইশক জালাকার কারভাঁ (Ishq Jalakar–Karvaan) আলাদা করে উঠে এসেছে। ছবিতে এটি ব্যবহার হয়েছে রণবীর সিংয়ের ইন্ট্রো গান হিসেবে। আবার ছবির শেষের দিকেও এই গানের কিছুটা অংশ শোনা যায়।
২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে ছবির প্রচারের অংশ হিসেবে গানটি মুক্তি পায়। মুক্তির পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলে - রিল, ফ্যান এডিট, রিঅ্যাকশন ভিডিওতে ভরে যায় টাইমলাইন।
তবে এই ভাইরাল হওয়ার কারণ শুধু গানটির জায়গা বা প্রোডাকশন ভ্যালু নয়। এই গানের প্রাণ লুকিয়ে রয়েছে বলিউড সংগীত ইতিহাসের এক কিংবদন্তি কাওয়ালিতে।
৭০ বছরের পুরনো কাওয়ালি থেকে আজকের হিট
ইশক জালাকার কারভাঁ (Ishq Jalakar–Karvaan) সরাসরি অনুপ্রাণিত ১৯৬০ সালের ছবি বরসাত কি রাত (Barsaat Ki Raat)-এর বিখ্যাত কাওয়ালি 'না তো কারভাঁ কি তলাশ হ্যায়' (Na Toh Karvan Ki Talash Hai) থেকে। সুরকার রোশন এবং গীতিকার সাহির লুধিয়ানভির এই সৃষ্টি আজও বলিউড সংগীতের মাইলফলক বলে ধরা হয়।
১২ মিনিটেরও বেশি দৈর্ঘ্যের এই কাওয়ালি সেই সময়ে প্রচলিত গানের কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছিল। প্রমাণ করেছিল, দর্শক চাইলে ধৈর্য ধরে দীর্ঘ সংগীত উপভোগ করতে পারে - যদি তা সত্যিই মানুষের হৃদয়ের গভীরে পৌঁছয়।
এই কাওয়ালিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন মহম্মদ রফি, মান্না দে, আশা ভোঁসলে, এস ডি বাতিশ ও সুধা মালহোত্রার মতো শিল্পীরা। গানের গীতিকবিতা, আধ্যাত্মিক গভীরতা ও অসাধারণ নির্মাণকৌশল একে কালজয়ী করে তোলে। শুধু ‘ইশক’ শব্দটাই ব্যবহার করা হয়েছিল ৮৪ বার, যা ভালবাসা, আত্মসমর্পণ আর ভক্তির মতো এক সম্মোহনের চেয়ে কম কিছু নয়।
আরও চমকপ্রদ বিষয় হল, এই কাওয়ালিরও রয়েছে আরও পুরনো শিকড়। এটি অনুপ্রাণিত হয়েছিল ১৯৫০ সালে পাকিস্তানি শিল্পী মুবারক আলি ও ফতেহ আলি খানের গাওয়া 'না তো বাতকাদে কি তলাব মুঝে' (Na To Butkade Ki Talab Mujhe) কাওয়ালি থেকে। ফতেহ আলি খান ছিলেন কিংবদন্তি নুসরত ফতেহ আলি খানের বাবা। ফলে ইশক জালাকার কারভাঁ (Ishq Jalakar–Karvaan) দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের শেষ প্রান্তে, যা প্রজন্ম আর সীমান্ত ছাড়িয়ে এই প্রজন্মের কাছে এসে পৌঁছেছে।
কাওয়ালি যেভাবে বদলে দিয়েছিল সব নিয়ম
ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতে রোশনের অবদানকে অনেকেই 'বিপ্লবের এক ধারা' বলে থাকেন। 'না তো কারভাঁ কি তলাশ হ্যায়' তার অন্যতম উদাহরণ। সংগীতশিল্পী কিশোর দেশাই একবার বলেছিলেন, “রোশনজি কাওয়ালিতে একধরনের অ্যালজেব্রিক ভাগ এনেছিলেন”, যেখানে বহু কণ্ঠ, দর্শন আর আবেগ একসঙ্গে সহাবস্থান করে।
নেটফ্লিক্স সিরিজ The Roshans-এ রোশনের স্ত্রী ও প্লেব্যাক শিল্পী ইরা নাগরথ স্মরণ করেছিলেন, কীভাবে তিনি একসময় রোশনকে প্রশ্ন করেছিলেন, এখন যখন মানুষ তিন মিনিটের গানই শোনে না, তখন ১৫ মিনিটের কাওয়ালি কে শুনবে?
রোশনের উত্তর ছিল যেন ভবিষ্যদ্বাণী, “একদিন এমন সময় আসবে, মানুষ প্রদীপ নিয়ে খুঁজবে, রোশন কোথায়।” দশকের পর দশক পেরিয়ে সেই কথাই যেন আজ সত্যি হয়ে উঠেছে।
এই কাওয়ালির রিহার্সালও ছিল ভীষণ কঠিন। আশা ভোঁসলে জানিয়েছিলেন, দিনের পর দিন সব শিল্পী ও কোরাস একসঙ্গে বসে অনুশীলন করতেন, যতক্ষণ না প্রতিটি ট্রানজিশন নিখুঁত হচ্ছে।
প্লেব্যাক শিল্পী শৈলেন্দ্র সিংয়ের কথায়, শেষ অন্তরার দিকে মহম্মদ রফির আলাপ শুরু হতেই সবাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। মান্না দে নাকি বলেছিলেন, “রফি আলাপ তুলতেই সবাই চুপ করে গিয়েছিল।”
শাহরুখ খানের প্রিয় রোশন-সৃষ্টি
এই কাওয়ালির প্রভাব বোঝা যায় যাঁরা একে ভালবাসেন, তাঁদের কথায়। The Roshans-এ শাহরুখ খান একে রোশনের প্রিয়তম সৃষ্টি বলে উল্লেখ করেন। তিনি মুখস্থ লাইন আওড়ে বোঝান, কীভাবে এই গানে ‘ইশক’ এমন কিছু হয়ে ওঠে, যা বিষ হলেও গ্রহণ করতে হয়, কারণ ভালবাসা তেমনই আত্মসমর্পণ চায়।
সোনু নিগম এই কাওয়ালিকে “এক জীবনে একবারই তৈরি হয় এমন সৃষ্টি” বলে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, মান্না দে, আশা ভোঁসলে বা এস ডি বাতিশ - প্রত্যেকের অংশে আলাদা প্রতিভা দরকার ছিল। আর সেই ভারসাম্যটাই ছিল রোশনের আসল জিনিয়াস সৃষ্টি।
এই কারণেই Ishq Jalakar–Karvaan আজ এতটা প্রভাব ফেলছে। এটি নিছক রিমেক নয়, বরং কয়েক দশক ধরে চলে আসা এক গভীর ভালবাসার ধারাবাহিকতা।
অতীতকে নতুন করে ভাবা
ধুরন্ধর ছবির জন্য সুরকার শাশ্বত সচদেব এই ঐতিহ্যকে নতুন করে তুলে ধরার দায়িত্ব নেন। নতুন ভার্সনে রাখা হয়েছে আইকনিক লাইন 'না তো কারভাঁ কি তলাশ হ্যায়', সঙ্গে সাহির লুধিয়ানভির অমর কিছু কথার পাশে জায়গা করে নিয়েছে ইরশাদ কামিলের নতুন শব্দগুচ্ছ।
আধুনিক বিট, লেয়ার্ড ভোকাল আর সিনেমাটিক ড্রামার সঙ্গে মিশে গানটি পৌঁছে গেছে নতুন প্রজন্মের কাছে, যাঁরা হয়তো কখনও আসল কাওয়ালি শোনেননি। তবু গানের আধ্যাত্মিক আবেগ অটুট রাখা হয়েছে।
এই সাফল্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে হিন্দি সিনেমায় কাওয়ালির বিবর্তন নিয়ে। শর্ট হুক আর অ্যালগরিদম-ফ্রেন্ডলি গানের যুগে Ishq Jalakar–Karvaan প্রমাণ করছে, শ্রোতার ভিতরে এখনও গভীরতা আর ইতিহাসকে জানার খিদে রয়ে গেছে।
ছবির উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি সাউন্ডট্র্যাক
এই অ্যালবাম ছবির অস্থির শক্তিকেই প্রতিফলিত করে। প্রতিটি গানই দৃশ্যের আবহ তৈরি করে। বাহরাইনের র্যাপার ফ্লিপেরাচির FA9LA গানটি, যা ছবির ভিলেনের এন্ট্রিতে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই উদাহরণ। আবার Ez Ez, Naal Nachana বা টাইটেল ট্র্যাক - সব ক’টিই আলাদা সাউন্ডস্কেপ তৈরি করেছে।
অ্যালবামে নস্টালজিয়ার ব্যবহারও চোখে পড়ার মতো - হাওয়া হাওয়া (Hawa Hawa), মনিকা (Monica)-র মতো পুরনো গান ফিরিয়ে এনে শ্রোতার সঙ্গে তাত্ক্ষণিক সংযোগ তৈরি করা হয়েছে। ফলে অ্যালবামটি একদিকে বৈচিত্র্যময়, অন্যদিকে একসূত্রে বাঁধা।