পাড়ায় পাড়ায় মাইকে বেজে উঠল, আমি এক যাযাবর, গঙ্গা আমার মা..., বিস্তীর্ণ দুপারে অসংখ্য মানুষের, দোলা এ দোলা, আমাদের জীবনের ঘামে ভেজা শরীরের এরকম বেশ কয়েকটি নতুন গান।

শ্রোতার মন জিতে নিলেন যিনি, তাঁর নাম ভূপেন হাজারিকা।
শেষ আপডেট: 8 September 2025 11:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাঙালির দুর্গাপুজো একসময় ছিল একেক শিল্পী ও একেকটি হিট গানের উদ্বোধনী মঞ্চ। পুজোর গান হিট তো সেই শিল্পীরও সম্বৎসরের বায়নার ঢাক বেজে যেত। তারপর থেকে ডাক পড়ত শুধু ফাংশনে, সিনেমায়, রেকর্ড কোম্পানির চিঠিতে। ঠিক তেমনই সম্ভবত সাতের দশকের শেষে অথবা আটের দশকের গোড়ায় পাড়ায় পাড়ায় মাইকে বেজে উঠল, আমি এক যাযাবর, গঙ্গা আমার মা..., বিস্তীর্ণ দুপারে অসংখ্য মানুষের, দোলা এ দোলা, আমাদের জীবনের ঘামে ভেজা শরীরের এরকম বেশ কয়েকটি নতুন গান।
কে এই শিল্পী? পুজোর মাইকে ততদিনে হেমন্ত, মান্না, শ্যামল, সতীনাথ, মানবেন্দ্রর জায়গা নিয়ে নিয়েছে পিয়া তু অব তো আজা, মেহবুবা মেহবুবা। দাপিয়ে বাজছে রফি-কিশোরের গান। সেখানে না গণসঙ্গীত, না প্রেমের, না বিরহের, এক অনবদ্য কথা, সুর ও সর্বোপরি কণ্ঠ নিয়ে বাঙালি শ্রোতার মন জিতে নিলেন যিনি, তাঁর নাম ভূপেন হাজারিকা। বাড়ি অসমে। ত্রিপুরার শচীন দেব বর্মনের পর ফের উত্তর-পুবের এক শিল্পীর জন্ম নিলেন বাংলাতেও।
বম্বের (বর্তমানের মুম্বই) ছবির জগতে ভূপেন হাজারিকা ছিলেন বেশ পরিচিত নাম। তা সে প্রায় ছয়ের দশক তো হবেই। অসমের ‘গাঁয়ের সীমানায় পাহাড়ের ওপারে প্রতিধ্বনি’ শোনা তরুণ কণ্ঠকে চিনে ফেলেছিলেন হেমন্ত কুমার (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়)। সেখান থেকে টেনে এনে ফেলেছিলেন আরব সাগরের অগাধ সুরের দুনিয়ায়। একরত্তি পাহাড়ি ধুনে বড় হওয়া ছেলে বম্বের রোমান্টিক সুরের জগতে নিয়ে এলেন সেই তাল ও লয়। প্রেমের ভাসা ভাসা কণ্ঠের জায়গায় নিয়ে এলেন একটি পুরনো চেনা ‘নাকি’ কণ্ঠ। তাতেই দর্শকের মন জিতে নিলেন।
২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার শ্রোতা সমীক্ষায় তাঁর ‘মানুষ মানুষের জন্যে’ গানটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করে। ভূপেন হাজারিকা ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অসমের সাদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম নীলকান্ত হাজারিকা, মায়ের নাম শান্তিপ্রিয়া হাজারিকা। ব্যক্তিগত জীবনে ভূপেন হাজারিকা কানাডায় বসবাসরত প্রিয়ম্বদা প্যাটেলকে বিয়ে করেন। ১৯৪২ সালে গুয়াহাটির কটন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট আর্টস, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে বিএ এবং ১৯৪৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পাশ করেন।
পরবর্তী সময়ে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্রহ্মপুত্রের চারণকবি ভূপেন হাজারিকার প্রথম গান প্রকাশ হয় ১১-১২ বছর বয়সে। পাহাড়ি আদিবাসীদের গান, বাঁশি, ঢোলকের বাদ্য তিনি আধুনিকমনস্কদের মনে গেঁথে দিলেন। প্রথম সঙ্গীতশিক্ষা মায়ের ঘুমপাড়ানি গান থেকে। তাঁর প্রতিভা প্রথম নজরে আসে অসমিয়া গীতিকার জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পী বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার।
তিনি পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ভূপেন রুদালি সিনেমার দিল হুম হুম করে গানটির সুরও তাঁর মায়ের ঘুমপাড়ানি গানের সুরে করা হয়েছিল। সেই ভূপেন হাজারিকা অসমের মাটি ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিলেন সুরের ব্রহ্মাণ্ড জয় করতে। গোড়া থেকেই বামপন্থী ঘরানার ভূপেন হাজারিকা ছিলেন অসমের গণনাট্য সঙ্ঘের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাই তাঁর গানে রয়েছে পল রোবসন থেকে জীবন সংগ্রাম ও সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে এক অদ্ভূত লড়াই ও জয়ের সুর। সে কারণে রাষ্ট্রশক্তিও ডরাত ভূপেন হাজারিকাকে। সেই ভূপেন হাজারিকাই শেষমেশ গুয়াহাটি লোকসভা কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে ২০০৪ সালে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু, হেরে যান। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে- ১৯৭৫ সালে সেরা সুরকারের জাতীয় পুরস্কার, ১৯৭৭ সালে পদ্মশ্রী, সঙ্গীত-নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার ১৯৮৭, ১৯৯২ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, ২০০১ সালে পদ্মভূষণ এবং মৃত্যুর পর ২০১২ সালে পদ্মবিভূষণ এবং ২০১৯ সালে ভারতরত্ন পুরস্কার দেয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার।