হ্যাপি বার্থডে ইরফান!

ছবি: দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 7 January 2026 21:18
“কাম খতম হোনে কে পেহলে জশন নহি মানাতে… নজর লাগ জাতি হ্যায়।”
ইরফানের জীবনে তাঁর কোনও কাজেই 'নজর' লাগেনি। বরং প্রতিটা কাজই নজর কেড়েছে। ঘুম কেড়েছে সেই সব মানুষের, যারা সিনেমা হলে বসে নিঃশব্দে তাঁর চোখের ভাষা পড়তে শিখেছিল। যে চোখে ছিল গভীরতা, ছিল অফুরন্ত ভালবাসা, আর ছিল সহজ-সরল জীবনের গল্প। অভিনয়কে তিনি কখনও প্রদর্শনী বানাননি, বানিয়েছিলেন অনুভূতি। এতটা ভালবাসা নিঃশব্দে দিয়ে যাওয়া মানুষটার আজ জন্মদিন। এমন একজন মানুষ, পর্দায় যাঁর উপস্থিতিই ছিল 'উৎসব'।
সালটা ১৯৬৭। ৭ জানুয়ারি। এই দিনে জন্ম হয়েছিল সেই মানুষটি, যাঁকে একবার দেখলেই মনে হত, সত্যিকারের প্রতিভা বোধহয় এতটা সহজ-সরলই হয়। ইরফান খান কেবল একজন অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বহু বহু মানুষের কাছে অনুভূতি। এক কথায় তিনি ছিলেন একটি জীবন্ত গল্প। তাঁর চোখের গভীরতা, হালকা হাসি, যা ভিড়ের মধ্যে থেকেও মনে করিয়ে দিত, এই মানুষটি আলাদা। সবার থেকে এক্কেবারে আলাদা।
ইরফানের অভিনয় শুরুতেই মনে করিয়ে দিত, সিনেমা শুধু গল্প বলার মাধ্যম নয়, মানুষের অনুভূতির এক দরজা। ‘মকবুল’-এ তার চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব, ভালবাসা এবং দায়বদ্ধতার টান দর্শকের মন ছুঁয়ে গেছিল। বড় মোনোলগের দরকার নেই। তাঁর চোখ এবং নীরবতাই যথেষ্ট। এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেখানে সে শুধু তাকিয়ে থেকেও চরিত্রের গভীরতা বোঝাতে পারতেন তিনি।

‘স্লামডগ মিলিয়নেয়ার’ সিনেমায় পুলিশ অফিসারের চরিত্রে ইরফান খানের অভিনয় ছিল অসাধারণ। তাঁর শান্ত এবং ধীরস্থির উপস্থিতি পুরো সিনেমাটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। নতুন অভিনেতাদের জন্য তাঁর সঙ্গে কাজ করা ছিল এক বড় ভরসার মতো। তাঁর মুখে সেই হালকা হাসি, বিনয়ী চোখ আর সহজাত অভিনয় আজও মানুষের মনে গেঁথে আছে। তিনি ছিলেন এমন একজন অভিনেতা, যাঁর কাছ থেকে কাজ শেখা যায়। নিজের কাজকে ভালবাসা, সততা এবং সহজভাবে মানুষের মন জয় করার এক দারুণ উদাহরণ ছিলেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে ইরফান খানের সরলতা আরও আলাদা। অ্যাওয়ার্ড শো, ফেস্টিভ্যাল, বা সিনেমার প্রচারণা সবক্ষেত্রেই তাঁর মানবিকতা স্পষ্ট। খ্যাতি, অ্যাওয়ার্ড, বা সেলিব্রিটি হওয়া কখনো তাঁর জন্য মুখ্য ছিল না। ভাল কাজ করাই তাঁর কাছে ছিল প্রকৃত আনন্দ।

ইরফানের অভিনয় মানেই হল সাধারণ মানুষের অসাধারণ সব গল্প। 'পান সিংহ তোমার' সিনেমায় আমরা দেখেছি কীভাবে একজন নিয়মনিষ্ঠ সৈনিক পরিস্থিতির চাপে পড়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। 'দ্য লাঞ্চবক্স' ছবিতে এক একাকী মানুষের মনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে তিনি এত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা দর্শকদের মন ছুঁয়ে যায়। আবার 'পিকু' সিনেমায় খুব সাধারণ একটা চরিত্রের মধ্য দিয়েও জীবনের জটিল সম্পর্কগুলোকে তিনি সহজ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

তাঁর অভিনীত প্রতিটি চরিত্রই ছিল মানবিকতায় ভরা। তাঁর অভিনয় দেখলে মনে হয়, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিটি অনুভূতিরই আলাদা মূল্য আছে।
ইরফান খানের আসল শক্তি ছিল তাঁর সহজ-সরল মেজাজ আর অসাধারণ অভিনয়। তিনি যখন কোনও চরিত্রে অভিনয় করতেন, তখন তাঁর চোখের ভাষা আর হাসিতে এক অদ্ভুত মায়া থাকত। তাঁর অভিনয় শুধু আনন্দ দিত না, বরং মানুষকে জীবনকে নতুন করে অনুভব করতে শেখাত।
আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা বুঝতে পারি, একজন মানুষ তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে মানুষের মনে কতটা গভীর জায়গা করে নিতে পারেন। মাত্র ৫৩ বছরের জীবনে তিনি যে ছাপ রেখে গেছেন, তা কখনও মুছে যাবে না। তাঁর সেই গভীর চোখ আর অমায়িক হাসি আজও আমাদের মনে পড়ে। ‘পান সিংহ তোমার’, ‘দ্য লাঞ্চবক্স’ বা ‘পিকু’ এই সিনেমাগুলো কেবল কিছু চরিত্র নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনের এক একটি স্মৃতি।