বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ‘ব্যান’ শব্দটি আগুন ছড়িয়েছে। অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্যের কাজ বন্ধ থাকা ঘিরে যখন রাজ চক্রবর্তী প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব রাখছেন, দেব লাইভে এসে কাজ বন্ধ থাকার বাস্তব ক্ষতির কথা তুলে ধরছেন—ঠিক সেই মুহূর্তে একেবারে অন্য সুরে কথা বললেন অভিনেতা রাজা দত্ত।

শেষ আপডেট: 22 January 2026 12:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ‘ব্যান’ শব্দটি আগুন ছড়িয়েছে। অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্যের কাজ বন্ধ থাকা ঘিরে যখন রাজ চক্রবর্তী প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব রাখছেন, দেব লাইভে এসে কাজ বন্ধ থাকার বাস্তব ক্ষতির কথা তুলে ধরছেন—ঠিক সেই মুহূর্তে একেবারে অন্য সুরে কথা বললেন অভিনেতা রাজা দত্ত। কোনও লাইভ নয়, কোনও মঞ্চ নয়—সোজাসুজি সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ পোস্ট। (Anirban bhattacharya, raj chakraborty, dev, Raja datta)
কিন্তু সে লেখার লাইনে ছিল অভিমান, প্রশ্ন, আত্মসম্মান আর পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। রাজা দত্ত স্পষ্ট করেই লিখেছেন, আজকাল বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তার এক দিক তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলছে। একপক্ষ যেখানে হাতজোড় করে, পা ধরেও ক্ষমা চাইতে প্রস্তুত—শুধু একজন শিল্পীকে আবার কাজের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য—সেখানে তিনি দ্বিমত পোষণ করছেন। তাঁর মতে, অনির্বাণ নিঃসন্দেহে প্রতিভাবান অভিনেতা, বাংলার তাঁর প্রয়োজন আছে—এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। কাজ পাওয়ার জন্য কি সত্যিই কাউকে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে হবে?
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে রাজা দত্ত জানান, তিনি কোনও দিন কারও সুপারিশে, তেল মারার রাজনীতিতে বা লবির ছায়ায় কাজ করেননি, ভবিষ্যতেও করবেন না। কাজ পাওয়ার জন্য কারও সামনে মাথা নোয়ানো বা পা ধরা—এই সংস্কৃতিকে তিনি মানতে পারেন না। তাঁর অভিনয় ক্ষমতা কতটা, তিনি কত বড় শিল্পী—তার বিচার তিনি দর্শকদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন। দর্শকদের ভালোবাসাতেই তিনি একাধিক ছবি ও ধারাবাহিকে কাজ করেছেন, এবং সেই চরিত্রগুলো আজও বাংলার মানুষের মনে জায়গা করে আছে—এটাই তাঁর প্রাপ্তি।
তবু বাস্তবটা নির্মম। আজ বাংলা ইন্ডাস্ট্রির বড় বড় প্রযোজনা সংস্থার ছত্রছায়ায় থেকেও বহু শিল্পী ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। কেউ চা-কফির দোকান খুলেছেন, কেউ মুদির দোকানে বসছেন, কেউ আবার সম্পূর্ণ অন্য পেশায় চলে গিয়েছেন—শুধু সংসার চালানোর জন্য। তারাও একদিন স্বপ্ন দেখেছিলেন, পরিচিত মুখ হবেন, নাম করবেন। কিন্তু তাঁদের জন্য কে হাতজোড় করেছে? কে পা ধরেছে?
রাজা দত্তের লেখায় সবচেয়ে তীক্ষ্ণ জায়গাটা আসে মতপ্রকাশের প্রশ্নে। তিনি লিখেছেন, একজন মানুষ যদি নিজের মত প্রকাশ করেন, তার জন্য তাঁকে ইন্ডাস্ট্রি থেকে নিষিদ্ধ করা হলে, সেটি আসলে সেই ব্যবস্থার শিক্ষাগত ও নৈতিক দেউলিয়াপনারই প্রমাণ। কোনও শিল্পী যদি সম্মান না পান, তাহলে তাঁর মতামতও কেন শোনা হবে না? আর যদি নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনই হয়, তাহলে সেই একই মানদণ্ডে সবাইকে বিচার করা উচিত।
রাজনীতির অনুপ্রবেশ নিয়েও স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন তিনি। অভিনয় তো মুখে রং মেখে চরিত্র হয়ে ওঠা—দর্শকের বিনোদনের জন্য। কিন্তু যখন সেখানে রাজনৈতিক রং, দলীয় হস্তক্ষেপ ঢুকে পড়ে, তখন পুরো ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ কাঠামো কোথায় দাঁড়াচ্ছে, তা আজ আর কারও অজানা নয়।
রাজা দত্ত বারবারই জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের প্রতিনিধি হয়ে কথা বলছেন না। এ তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনা। তবু শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছেন এক ভয়—এই কথা বলার পর তাঁর নিজের কাজ থাকবে তো? তিনিও কি নিষিদ্ধ হবেন? তবু বলছেন, যদি ভবিষ্যতে কাজ করার সুযোগ পান, দর্শকদের বিনোদনে তাঁর পক্ষ থেকে কোনও খামতি থাকবে না।
শেষ লাইনে এসে তিনি হাতজোড় করেই ক্ষমা চেয়েছেন—কাজ পাওয়ার জন্য নয়, ভুল কিছু বলে থাকলে। আর সকলকে অনুরোধ করেছেন, একটু ভাবার, ভাবার অভ্যাস করার। ভালো থাকার, সুস্থ থাকার। এই দীর্ঘ লেখার পর প্রশ্নটা থেকেই যায়—একজন শিল্পীর কাজ কি তাঁর প্রতিভায় নির্ধারিত হবে, নাকি তাঁর মাথা নোয়ানোর ক্ষমতায়? আর এই প্রশ্নের উত্তর দিতে কি বাংলা ইন্ডাস্ট্রি আদৌ প্রস্তুত?