
শেষ আপডেট: 13 June 2020 11:25
অর্থাৎ ক্ষমতা এবং অধিকারের খেলা চলছে চারিদিকে। কিন্তু হাভেলিটি কী? আস্তে আস্তে বোঝা যায়, হাভেলিটি আসলে আমাদের সেই সামন্ততন্ত্র। ভেঙে পড়ে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া, বিপজ্জনক হয়ে যাওয়া সামন্ততন্ত্র, কিন্তু সেই ক্ষয়ে যাওয়া পুরনো সামন্ততন্ত্রের হাভেলিতেই থাকে আজকের প্রজন্ম, গতকালের প্রজন্ম এবং প্রাচীনতম প্রজন্মও। এই প্রত্যেকটি প্রজন্মই স্বপ্ন দেখে তারা এই হাভেলির ক্ষমতা দখল করবে। হাভেলির অধিকার ছিনিয়ে নেবে। তাদের অস্তিত্ব নিশ্চিত করবে। আর তার জন্য তারা প্রত্যেকেই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর অন্যদিকে আরেকটি খেলা শুরু হয়, চলতে থাকে, সামন্ততন্ত্রের প্রতীক এই হাভেলিকে হেরিটেজ ঘোষণা করার। সেটিও চলতে থাকে। একদিন শোনা যায় মাটি খুঁড়ে নাকি তাল তাল সোনা পাওয়া যাচ্ছে কোথাও। বাঁকে-র কাছ থেকে সেই খবর পেয়ে মির্জা হাভেলির মধ্যে মাটি খুঁড়তে শুরু করে। কিন্তু এই দেশে, থুড়ি, এই হাভেলিতে মাটি খুঁড়লেও সোনা আর মেলে না।
হাভেলির চরিত্র এবং হাভেলির বাসিন্দাদের চরিত্রও অনেকটাই বদলে যায়। সামন্ততন্ত্র ক্ষয়িষ্ণু। তাকে বাঁচতে গেলে দরকার টাকা। তাকে বাঁচাতে যে চাইবে, তারও দরকার টাকা। কে দেবে এত টাকা। সে এত পরিমাণ টাকা, যে মির্জাদের কল্পনার বাইরেই।
গল্পের ভিতরের গল্পগুলিতে আর ঢুকছি না। ক্রমে, আইনের খেলায় যখন পুরাতত্ত্ব বিভাগ এবং মির্জা— প্রত্যেকেই দাবি করছে এই হাভেলি তাদের, শোনা যায়, বেগম, যে কিনা প্রকৃত মালকিন, সে চলে গেছে এই হাভেলি ছেড়ে। কার সঙ্গে? ৯৫ বছর বয়সে সে হাত ধরেছে আবার তার পুরনো প্রেমিক আবদুর রহমানের, মাত্র ১ টাকায় এই হাভেলি তাকে বিক্রি করে।
সিনেমার শেষে একটি ঘর পায় মির্জা। একটি প্রাচীন কেদারা পায়, কিন্তু তা মাত্র ২৫০ টাকা দামে সে বিক্রি করে দেয়, যার দাম পরে ওঠে দেড় লক্ষ টাকা।
মাস্টারস্ট্রোকে বাজিমাত করা বেগমের জন্মদিন পালিত হয় সুসজ্জিত সংরক্ষিত হাভেলিতে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে বাঁকে ও মির্জা। মির্জা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে সামন্ততন্ত্র কেমন পুঁজিবাদের গাড়িতে চড়ে তার পাশ দিয়েই চলে গেল। হাভেলির স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। অধিকারের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। মালিক আর হয়ে ওঠা হয় না মির্জার বা ভাড়াটেদের। দেশটা পালটে যায়। হাভেলিটাও পালটে যায়।
কী সূক্ষ্ম প্রিসিশানে, ছোটগল্পের মিনিয়েচার আর্টিস্টের মতো সুজিত এখানে তুলে এনেছেন জীবনযন্ত্রণাগুলিকে, স্বপ্নগুলিকে। আর কী মিনিমালিস্ট অভিনয়ে, কী নৈঃশব্দ্যে, কী ভারসাম্যে অমিতাভ বচ্চন তুলে এনেছেন মির্জার চরিত্র! অকল্পনীয়।
এই হাভেলি আসলে ভারতবর্ষ। এই হাভেলির পরিবর্তন আসলে বিশ্বায়ন-পরবর্তী সামন্ততন্ত্রের পোশাক বদলানোর গল্প। কিন্তু যা বদলায় না, তা হল নাগরিকদের স্বপ্ন, তাদের যন্ত্রণা, তাদের অপেক্ষা। তারা এখনও লুকিয়ে হাভেলিটাকে দেখে, নিজেদের স্বপ্নকে দূর থেকে দেখার মতো করে।
এ ছবি হাসির ছবি নয়, এ ছবি শুধু স্যাটায়ারও নয়, এ ছবি রাজনৈতিক রূপক। বং-জুন হোর প্যারাসাইটকে কেউ যদি হাসির ছবি ভাবেন, তাহলে তো যিনি ভাববেন, তিনিই হাসির যোগ্য। কিন্তু কথা সেটি নয়, কথা হল, গোটা ছবি জুড়েই আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক রূপক চলতে থাকে এবং এই রূপক একটি সময়ের নয়, দীর্ঘ এক সময়ের। ভারতবর্ষের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ছোট বৃত্তান্ত সুজিত তুলে ধরেছেন এই ছবিতে।
অভীক মুখোপাধ্যায়ের শান্ত নিরাসক্ত ক্যামেরা আর মায়াবী আলো ছাড়া এ ছবি তৈরিই হত না।
সঙ্গে আলাদা করে বলতেই হবে সঙ্গীতের কথা, যা এক অনবদ্য আবহের জন্ম দিয়েছে।
কিন্তু বাঁকের ভূমিকায় আয়ুষ্মান, মির্জার ভূমিকায় দ্য গ্রেট অমিতাভ বচ্চন এবং শুক্লার ভূমিকায় বিজয় রাজ এক অনন্য হারমোনি তৈরি করেছেন এই ছবিতে।
আমার শুধু মনের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফতিমামহল। হাভেলি। আমার দেশ।
আর দেখছি একাকী বিধ্বস্ত মির্জাদের জীবন, বাঁকের জীবন চলছে। শেষ হয়ে যাচ্ছে। হয়তো একটি স্বপ্ন দেখতে দেখতে, একদিন তারাও ওই হাভেলির মালিক হয়ে উঠবে, নিয়ন্ত্রক হবে। পালটে যাবে বেঁচে থাকার সংজ্ঞা।
কিন্তু মালিক তো কখনওই জনগণ হবে না। বরং সামন্ততন্ত্র এভাবেই নিজেকে টিকিয়ে রাখবে পুঁজিবাদের সঙ্গে আলিঙ্গন করে। আর পুঁজিবাদও, সামন্ততন্ত্রকে দেবে উত্তরাধুনিক পোশাক।
আমি ব্যক্তিগতভাবে এই ছবি দেখে বহুদিন পরে একটি ভাল ছবি দেখার আনন্দ পেলাম। অন্তত ভাবানোর মতো ছবি এখন হাতেও গোনা যায় না। পরিচালক সুজিত সরকারকে ধন্যবাদ।
এবং ধন্যবাদ দ্য গ্রেটেস্ট অমিতাভ বচ্চনের জন্য। মির্জা বললেই চোখের সামনে ফুটে উঠছে অমিতাভ বচ্চনের মুখটিই। সেই অবয়ব। সেই ভেঙে পড়ে যাওয়া ৭৮ বছরের সামন্ততন্ত্রের শেষ প্রজন্ম। আমরা, যাদের উত্তরাধিকার।
এ ছবি অনেক বৃহত্তর মঞ্চে স্বীকৃতি পাবে, এই আশা রাখি।
দেখুন, ‘গুলাবো সিতাবো’র অফিশিয়াল ট্রেলার...
https://www.youtube.com/watch?time_continue=5&v=o0qeQ_yHqtA&feature=emb_title