Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
পয়লা বৈশাখেই কালবৈশাখীর দুর্যোগ! মাটি হতে পারে বেরনোর প্ল্যান, কোন কোন জেলায় বৃষ্টির পূর্বাভাসমেয়েকে শ্বাসরোধ করে মেরে আত্মঘাতী মহিলা! বেঙ্গালুরুর ফ্ল্যাটে জোড়া মৃত্যু ঘিরে ঘনীভূত রহস্য UCL: চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ চারে পিএসজি-আতলেতিকো, ছিটকে গেল বার্সা-লিভারপুল‘ইরানকে বিশ্বাস নেই’, যুদ্ধবিরতির মাঝে বিস্ফোরক জেডি ভ্যান্স! তবে কি ভেস্তে যাবে শান্তি আলোচনা?১৮০ নাবালিকাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শোষণ! মোবাইলে মিলল ৩৫০ অশ্লীল ভিডিও, ধৃতের রয়েছে রাজনৈতিক যোগ ৩৩ বছর পর মুখোমুখি ইজরায়েল-লেবানন! ওয়াশিংটনের বৈঠকে কি মিলবে যুদ্ধবিরতির সমাধান?ইউরোপের আদালতে ‘গোপনীয়তা’ কবচ পেলেন নীরব মোদী, জটিল হচ্ছে পলাতক ব্যবসায়ীর প্রত্যর্পণ-লড়াইইরানের সঙ্গে সংঘাত এবার শেষের পথে? ইঙ্গিত ভ্যান্সের কথায়, দ্বিতীয় বৈঠকের আগে বড় দাবি ট্রাম্পেরওIPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়

গুলাবো সিতাবো— প্রতীকী বাস্তবতার এক অন্য ভাষ্য

হিন্দোল ভট্টাচার্য গুলাবো এবং সিতাবো, দুটি পুতুল। এই পুতুলদুটি দিয়েই শুরু হয় গুলাবো সিতাবো ছবিটি। কিন্তু যত ছবিটি গড়ায়, ক্রমশ আমরা বুঝতে পারি, আমরা প্রত্যেকেই সেই পুতুল। আর যখন বুঝতে পারি, তখন এক সাধারণ মানবিক ছবি পরিণত হয়ে যায় এক অসামান্য

গুলাবো সিতাবো— প্রতীকী বাস্তবতার এক অন্য ভাষ্য

শেষ আপডেট: 13 June 2020 11:25

হিন্দোল ভট্টাচার্য

গুলাবো এবং সিতাবো, দুটি পুতুল। এই পুতুলদুটি দিয়েই শুরু হয় গুলাবো সিতাবো ছবিটি। কিন্তু যত ছবিটি গড়ায়, ক্রমশ আমরা বুঝতে পারি, আমরা প্রত্যেকেই সেই পুতুল। আর যখন বুঝতে পারি, তখন এক সাধারণ মানবিক ছবি পরিণত হয়ে যায় এক অসামান্য রাজনৈতিক ছবিতে। আসলে রাজনৈতিক ছবির ভাষ্য ক্রমশ পালটে যাচ্ছে। প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক বার্তার চেয়ে, অনেক স্তরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক ভাষ্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কারণ রাজনীতিটা আমরা যেভাবে দেখি, রাজনীতিটা সেভাবে নেই, কোনওদিন ছিল না। কিন্তু আমাদের এই দেশে, এত বছর ধরে, রাজনীতির একটা বিশেষ ন্যারেটিভ গড়ে উঠেছে, যাকে ছাড়া আমরা রাজনীতি-– এই শব্দটির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতেই পারি না। আমার বিশ্বাস, আমাদের ধারণাগত, ভাবনাগত এই প্যারাডাইমটিকে না ভাঙলে, রাজনৈতিক ছবির অন্য কোনও ভাষ্যের কথা ভাবতেই পারব না। আসলে গল্পটিকে তেমনভাবেই বলা হয়, যেমনভাবে আমি সেই গল্পটিকে দিয়ে যা বলাতে চাইছি, তা বলাতে সক্ষম হয়। কারণ গল্পও গুলাবো বা সিতাবোর মতো এক পুতুল। ফতিমা মহল, এককথায় একটি রূপক। আকৃতিগত দিকে একটি বিরাট হাভেলি। সেখানে পরজীবীর মতো থাকে ভাড়া না দিতে পারা অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য পরিবার, যাদের একজন তিন বোন এবং মাকে নিয়ে কোনওক্রমে একটি আটা ভাঙানোর দোকান চালিয়ে সংসার চালানো বাঁকে (আয়ুষ্মান)। বাঁকে এখানে হিরো নয়। বরং হেরে যাওয়া একজন মানুষ। সে যে হেরে যাচ্ছে প্রতিপদে, তা সে নিজেই ক্রমে ক্রমে আবিষ্কার করে। আমাদের মতো, ভারতীয় নাগরিকের মতো, যার স্বপ্ন আছে, চেষ্টা আছে এবং হেরে যাওয়া আছে। সে একটি পুতুল বাকি অসংখ্য পুতুলের মতো। আবার আরেকটি পুতুল হল মির্জা, ৭৮ বছর বয়স, যে তার চেয়ে ১৭ বছর বয়সের বড় বেগমকে বিয়ে করে হাভেলির জন্য, আবার বেগমও তার প্রেমিক আবদুর রহমানকে ছেড়ে মির্জাকে বিয়ে করে কারণ সে ছিল এই হাভেলির প্রতি অবসেসড। সে মালকিন। মির্জা অপেক্ষা করে, কবে বেগম মরবে এবং সে হবে মালিক। বুড়ো শরীরে, শরীরকে টানতে টানতে নিজের লোভ এবং বহুদিনের চেপে বসিয়ে রাখা মালিকসত্ত্বার মধ্যে বিরোধ হয় কখনও কখনও। বারবার আইনের সাহায্য নেয় এই সব ভাড়াটেদের হাত থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু কিছুই হয় না। ওদিকে আছে পুরাতত্ত্ব বিভাগের জ্ঞানেন্দ্র শুক্লা (বিজয় রাজ), যে শকুনের মতো খুঁজে বেড়ায় এমন কোনও বাড়িকে, যাকে প্রথমে হেরিটেজ বিল্ডিং আর তার পরে এলাকার রাজনীতিবিদদের নানান ব্যবসায়িক সুবিধার অঙ্গীভূত করে দেবে। এলাকার রাজনীতিবিদ, পুলিশ সকলের সঙ্গে তার লেনদেনের সম্পর্ক। আবার আছে অনেক উকিল, যাদের মূল উদ্দেশ্য এ বাড়ি বিক্রি করিয়ে শক্তিশালী প্রোমোটারের হাতে তুলে দেওয়া।অর্থাৎ ক্ষমতা এবং অধিকারের খেলা চলছে চারিদিকে। কিন্তু হাভেলিটি কী? আস্তে আস্তে বোঝা যায়, হাভেলিটি আসলে আমাদের সেই সামন্ততন্ত্র। ভেঙে পড়ে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া, বিপজ্জনক হয়ে যাওয়া সামন্ততন্ত্র, কিন্তু সেই ক্ষয়ে যাওয়া পুরনো সামন্ততন্ত্রের হাভেলিতেই থাকে আজকের প্রজন্ম, গতকালের প্রজন্ম এবং প্রাচীনতম প্রজন্মও। এই প্রত্যেকটি প্রজন্মই স্বপ্ন দেখে তারা এই হাভেলির ক্ষমতা দখল করবে। হাভেলির অধিকার ছিনিয়ে নেবে। তাদের অস্তিত্ব নিশ্চিত করবে। আর তার জন্য তারা প্রত্যেকেই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর অন্যদিকে আরেকটি খেলা শুরু হয়, চলতে থাকে, সামন্ততন্ত্রের প্রতীক এই হাভেলিকে হেরিটেজ ঘোষণা করার। সেটিও চলতে থাকে। একদিন শোনা যায় মাটি খুঁড়ে নাকি তাল তাল সোনা পাওয়া যাচ্ছে কোথাও। বাঁকে-র কাছ থেকে সেই খবর পেয়ে মির্জা হাভেলির মধ্যে মাটি খুঁড়তে শুরু করে। কিন্তু এই দেশে, থুড়ি, এই হাভেলিতে মাটি খুঁড়লেও সোনা আর মেলে না। হাভেলির চরিত্র এবং হাভেলির বাসিন্দাদের চরিত্রও অনেকটাই বদলে যায়। সামন্ততন্ত্র ক্ষয়িষ্ণু। তাকে বাঁচতে গেলে দরকার টাকা। তাকে বাঁচাতে যে চাইবে, তারও দরকার টাকা। কে দেবে এত টাকা। সে এত পরিমাণ টাকা, যে মির্জাদের কল্পনার বাইরেই। গল্পের ভিতরের গল্পগুলিতে আর ঢুকছি না। ক্রমে, আইনের খেলায় যখন পুরাতত্ত্ব বিভাগ এবং মির্জা— প্রত্যেকেই দাবি করছে এই হাভেলি তাদের, শোনা যায়, বেগম, যে কিনা প্রকৃত মালকিন, সে চলে গেছে এই হাভেলি ছেড়ে। কার সঙ্গে? ৯৫ বছর বয়সে সে হাত ধরেছে আবার তার পুরনো প্রেমিক আবদুর রহমানের, মাত্র ১ টাকায় এই হাভেলি তাকে বিক্রি করে। সিনেমার শেষে একটি ঘর পায় মির্জা। একটি প্রাচীন কেদারা পায়, কিন্তু তা মাত্র ২৫০ টাকা দামে সে বিক্রি করে দেয়, যার দাম পরে ওঠে দেড় লক্ষ টাকা।মাস্টারস্ট্রোকে বাজিমাত করা বেগমের জন্মদিন পালিত হয় সুসজ্জিত সংরক্ষিত হাভেলিতে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে বাঁকে ও মির্জা। মির্জা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে সামন্ততন্ত্র কেমন পুঁজিবাদের গাড়িতে চড়ে তার পাশ দিয়েই চলে গেল। হাভেলির স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। অধিকারের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। মালিক আর হয়ে ওঠা হয় না মির্জার বা ভাড়াটেদের। দেশটা পালটে যায়। হাভেলিটাও পালটে যায়। কী সূক্ষ্ম প্রিসিশানে, ছোটগল্পের মিনিয়েচার আর্টিস্টের মতো সুজিত এখানে তুলে এনেছেন জীবনযন্ত্রণাগুলিকে, স্বপ্নগুলিকে। আর কী মিনিমালিস্ট অভিনয়ে, কী নৈঃশব্দ্যে, কী ভারসাম্যে অমিতাভ বচ্চন তুলে এনেছেন মির্জার চরিত্র! অকল্পনীয়। এই হাভেলি আসলে ভারতবর্ষ। এই হাভেলির পরিবর্তন আসলে বিশ্বায়ন-পরবর্তী সামন্ততন্ত্রের পোশাক বদলানোর গল্প। কিন্তু যা বদলায় না, তা হল নাগরিকদের স্বপ্ন, তাদের যন্ত্রণা, তাদের অপেক্ষা। তারা এখনও লুকিয়ে হাভেলিটাকে দেখে, নিজেদের স্বপ্নকে দূর থেকে দেখার মতো করে। এ ছবি হাসির ছবি নয়, এ ছবি শুধু স্যাটায়ারও নয়, এ ছবি রাজনৈতিক রূপক। বং-জুন হোর প্যারাসাইটকে কেউ যদি হাসির ছবি ভাবেন, তাহলে তো যিনি ভাববেন, তিনিই হাসির যোগ্য। কিন্তু কথা সেটি নয়, কথা হল, গোটা ছবি জুড়েই আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক রূপক চলতে থাকে এবং এই রূপক একটি সময়ের নয়, দীর্ঘ এক সময়ের। ভারতবর্ষের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ছোট বৃত্তান্ত সুজিত তুলে ধরেছেন এই ছবিতে। অভীক মুখোপাধ্যায়ের শান্ত নিরাসক্ত ক্যামেরা আর মায়াবী আলো ছাড়া এ ছবি তৈরিই হত না। সঙ্গে আলাদা করে বলতেই হবে সঙ্গীতের কথা, যা এক অনবদ্য আবহের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু বাঁকের ভূমিকায় আয়ুষ্মান, মির্জার ভূমিকায় দ্য গ্রেট অমিতাভ বচ্চন এবং শুক্লার ভূমিকায় বিজয় রাজ এক অনন্য হারমোনি তৈরি করেছেন এই ছবিতে।আমার শুধু মনের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফতিমামহল। হাভেলি। আমার দেশ। আর দেখছি একাকী বিধ্বস্ত মির্জাদের জীবন, বাঁকের জীবন চলছে। শেষ হয়ে যাচ্ছে। হয়তো একটি স্বপ্ন দেখতে দেখতে, একদিন তারাও ওই হাভেলির মালিক হয়ে উঠবে, নিয়ন্ত্রক হবে। পালটে যাবে বেঁচে থাকার সংজ্ঞা। কিন্তু মালিক তো কখনওই জনগণ হবে না। বরং সামন্ততন্ত্র এভাবেই নিজেকে টিকিয়ে রাখবে পুঁজিবাদের সঙ্গে আলিঙ্গন করে। আর পুঁজিবাদও, সামন্ততন্ত্রকে দেবে উত্তরাধুনিক পোশাক। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই ছবি দেখে বহুদিন পরে একটি ভাল ছবি দেখার আনন্দ পেলাম। অন্তত ভাবানোর মতো ছবি এখন হাতেও গোনা যায় না। পরিচালক সুজিত সরকারকে ধন্যবাদ। এবং ধন্যবাদ দ্য গ্রেটেস্ট অমিতাভ বচ্চনের জন্য। মির্জা বললেই চোখের সামনে ফুটে উঠছে অমিতাভ বচ্চনের মুখটিই। সেই অবয়ব। সেই ভেঙে পড়ে যাওয়া ৭৮ বছরের সামন্ততন্ত্রের শেষ প্রজন্ম। আমরা, যাদের উত্তরাধিকার। এ ছবি অনেক বৃহত্তর মঞ্চে স্বীকৃতি পাবে, এই আশা রাখি। দেখুন, ‘গুলাবো সিতাবো’র অফিশিয়াল ট্রেলার... https://www.youtube.com/watch?time_continue=5&v=o0qeQ_yHqtA&feature=emb_title

```