বাংলা ব্যান্ডের তীর্থভূমি যেন হয়ে উঠল এদিন নজরুল মঞ্চ। আইকনিক 'ক্যাকটাস', 'ভূমি', 'ফসিলস'-এর ত্রিবেণী সঙ্গম ঘটল।

গ্রাফিক্স -দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 23 August 2025 14:47
কলকাতা শহরের গর্ব তবলিয়া (Tabla Player) পণ্ডিত শুভেন চট্টোপাধ্যায় (Subhen Chatterjee)। তালবাদ্যে তিনি খুলে দিয়েছেন নতুন দিগন্ত। কিংবদন্তি তবলিয়া জাকির হোসেন তাঁর গুরু। যাঁর আশীর্বাদধন্য হতে পেরেছিলেন শুভেন। জাকির হোসেনের সঙ্গে শুভেনের ব্যক্তিত্ব থেকে সাজপোশাক ভীষণ ভাবে তাই মিলে যায়। জাকির সাবকেই এই অনুষ্ঠান সমর্পণ করলেন তিনি। শুভেন চট্টোপাধ্যায় তাঁর তবলিয়া জীবনের ৪০ বছর (40 Years Celebration) পূর্ণ করলেন।
গত শনিবার ১৬ই আগস্ট ২০২৫ শুভেন চট্টোপাধ্যায়ের চার দশক উদযাপনে নজরুল মঞ্চে 'রক ফিউশন' নিয়ে হাজির হলেন রূপম, সিধু, জোজো, নিকিতা, সুরজিৎ, অমিত দত্ত সহ আরো শিল্পীরা। কলকাতা সঙ্গীতের একটি ঐতিহাসিক সন্ধ্যার সাক্ষী থাকল। যে সঙ্গীত সন্ধ্যার নাম ছিল 'গানে ফিউশনে – সিজন ৩'। সঙ্গে ছিল শুভেনের 'কার্মা' ব্যান্ড। যে ব্যান্ডের তরুণ তুর্কী শুভেন পুত্র সম্বিৎ চট্টোপাধ্যায়।

অ্যালগোস ইভেন্টস অ্যান্ড ডেকোর এর ভাবনায়, পরিকল্পনায়, পরিচালনায় এই সিজনে ফিউশন সঙ্গীতে পণ্ডিত শুভেন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গীত যাত্রার চল্লিশটি গৌরবময় বসন্ত উদযাপন করা হল। 'রক ফিউশন' ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীত এবং রকের সাথে বিশ্ব সঙ্গীতের এক অভূতপূর্ব মিশ্রণের ফসল যা তারকাখচিত পরিবেশনায় আরও দুর্ধর্ষ হয়ে উঠল।
শুধু গান বা মিউজিক নয়, রক ফিউশন মিউজিকের সঙ্গে ফ্যাশন শো দিয়ে শুরু হল অনুষ্ঠানের। যদিও বাড়তি ছিল এই শো।
'গুরু বন্দনা' দিয়ে যখন শুভেন চট্টোপাধ্যায় তবলার তালবাদ্য শুরু করলেন মঞ্চে যেন স্বর্গ নেমে এল। শুভেনের তবলার সঙ্গে সঙ্গতে ছিল 'কার্মা' ব্যান্ড। এরপর বিখ্যাত গীটারিস্ট অমিত দত্তর সঙ্গে ছিল শুভেনের তবলার সঙ্গ।
শুভেন চট্টোপাধ্যায়ের কম্পোজিশনে জোজো দু দশক আগে রেকর্ড করেছিলেন 'রঙ্গি সারি'। সেই গান এত বছর পর জোজো-শুভেনের যুগলবন্দিতে জমে গেল। সবুজ পোশাকে জোজো নতুন রূপে ধরা দিলেন। এরপর তিনি আরও মাতিয়ে দিলেন জোজো 'মাস্ত কালান্দার' সুফি গানে। যেন পাকিস্তানি গায়িকা আবিদা পারভীনকে মনে করিয়ে দিল জোজোর প্রাণশক্তি।
এরপর বাংলা ব্যান্ডের তীর্থভূমি যেন হয়ে উঠল এদিন নজরুল মঞ্চ। আইকনিক 'ক্যাকটাস', 'ভূমি', 'ফসিলস'-এর ত্রিবেণী সঙ্গম ঘটল।
'ভূমি'র সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায় আজ নিজের একক পরিচয়েই জনপ্রিয়।তবু তাঁর কণ্ঠে 'ভূমি'র গান তো আমাদের নস্টালজিয়া। 'ফাগুনের মোহনায়' যেমন মায়াবী তেমনই মাতিয়ে দিলেন দর্শককে 'আমি ডান দিকে রইনা'তে। শুভেনের মিউজিকে নতুন আঙ্গিকে পরিবেশন হল 'কান্দে শুধু মন কেন কান্দে রে'।
'ক্যাকটাস' এর সিধু সিদ্ধার্থ রায় শুরু করলেন 'তুই আমায় পাগল করলি রে'। সব থেকে সেরা পরিবেশনা ছিল সিধুর। স্বপ্নের মতো তাঁর গান। 'ক্যাকটাস' যখন সুব্রত সেনের 'নীল নির্জনে' ছবি করছে তখন তাঁদের একটি গান 'ধিক তিনা' শুভেন চট্টোপাধ্যায়ের কম্পোজিশনের অনুপ্রেরণায় ছিল। সে কথা নিজেই সিধু বলে 'নীল নির্জনে'র বাংলা গানের মেডলি পরিবেশন করলেন। 'তুমিও বোঝো আমিও বুঝি' গান যখন সিধু গাইছেন তখন দর্শকাসনে বসে শুনছেন পটা। মরুদ্যানে ক্যাকটাস মিলে গেল যেন। দুজনের মন কী বলল 'চাই শুধু তোমায় তুমি নেই'। 'বুদ্ধ হেসেছে, যুদ্ধ এসেছে' দুর্দান্ত লাগল 'কার্মা'র মিউজিকে। তাঁদের সিগনেচার গান 'হলুদ পাখি' গেয়ে প্রাণ জুড়িয়ে দিলেন সিধু। এখনও কানে বাজছে সিধুর কথা 'আপনাদের তোমাদের তোদের মাঝে থাকবে 'সেই যে হলুদ পাখি'। দর্শক আসন থেকে ধ্বনিত হল 'ফিরবে না সেকী ফিরবে না আর কোনওদিন'।
রূপোলি পোশাকে নিকিতা গান্ধী এ যুগের প্রজন্মকে মাতিয়ে দিলেন। তবে তাঁর কণ্ঠে বাংলা গান 'সুন্দরী কমলা' ছুঁয়ে গেল সবাইকে।
এরপর যার জন্য সবার আকুলতা মঞ্চে এলেন রূপম ইসলাম। 'হাসনুহানা' প্রাণ ভরাল এতক্ষণের অপেক্ষার। 'জীবন চলছে না কোনওমতে' তাঁর সঙ্গেই গেয়ে উঠলেন প্রতিটি দর্শক। 'হীরক রাজার দেশে' গান রূপমের মনে হয় আজও বিপ্লবের গান। সত্যজিৎ রায়ের এই মিউজিক এই গান শুনেই গায়ক হবেন কিশোরবেলায় ভেবে ফেলেন রূপম। 'কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়' আজও তাই মঞ্চে প্রাসঙ্গিক করে তুললেন রূপম। ফিউশনে নতুন মাত্রা পেল অমর পালের এই গান। অমিত দত্তের গীটারের সঙ্গে রূপম একসময় গেয়েছিলেন 'বইচোর'। সেই গান দু'জনের যুগলবন্দিতে নস্টালজিয়া ফিরিয়ে দিল মঞ্চে। শেষ নিবেদন ছিল রূপম সিগনেচার গান 'নীল রং ছিল ভীষণ প্রিয়'।
সবশেষে ছিল আরও চমক রেট্রো গান দিয়ে কার্মার মিউজিকে একসঙ্গে জোজো,রূপম,নিকিতা,সিধুর মেডলি।
এমন অনুষ্ঠান বেশ বিরল শহরে। তবে কিন্তু একটা রয়েই গেল অনুষ্ঠানের মূল বিষয় ছিল চার দশকে পণ্ডিত চট্টোপাধ্যায়ের তবলার বাহার তা যেন চাপা পড়ে গেল এতশত রক মিউজিকের আড়ালে। দর্শকরা তবলার কোনও সোলো নিবেদনও গানের সঙ্গে শুনতে পেল না। তবু শুভেনের চার দশক চার প্রজন্মকে মিলিয়ে দিল এক মঞ্চে।