মঞ্চের আলোয় দাঁড়িয়ে ব্যঙ্গের সুরে যে কণ্ঠ গেয়ে উঠেছিল—“আমাদের কাছে কাগজ আছে… ঝাড়াই-বাছাই চলছে”—ঠিক এক মাস না যেতেই সেই গান যেন জীবনের পাতায় নেমে এল।

শেষ আপডেট: 27 December 2025 16:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মঞ্চের আলোয় দাঁড়িয়ে ব্যঙ্গের সুরে যে কণ্ঠ গেয়ে উঠেছিল—“আমাদের কাছে কাগজ আছে… ঝাড়াই-বাছাই চলছে”—ঠিক এক মাস না যেতেই সেই গান যেন জীবনের পাতায় নেমে এল। যে অনির্বাণ ভট্টাচার্য (Anirban Bhattacharya) বিদ্রুপের ছলে প্রশ্ন তুলেছিলেন SIR আর কাগজের রাজনীতি নিয়ে, এবার তাকেই ডাক পড়ল এসআইআর শুনানিতে। শিল্পীর জীবনে কখনও কখনও শিল্প নিজেই ভবিষ্যৎ লিখে দেয়—এ ঘটনাও তেমনই এক অদ্ভুত মিল।
খবরটা শোনা মাত্রই চমকে উঠেছিল টলিউড। জানা গেল, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় অনির্বাণ ভট্টাচার্যের কোনও যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিনেতা, গায়ক, পরিচালক—সব পরিচয়ের আড়ালে তিনি তো এক সাধারণ নাগরিকও। কিন্তু সেই নাগরিক পরিচয় যাচাইয়ের খাতায় প্রশ্নচিহ্ন। কারণ এনিউমারেশন ফর্মে তিনি ২০০২ সালের কোনও নথি দিতে পারেননি। শুধু তিনি নন, সেই সময়কার ভোটার তালিকায় নেই তাঁর মা-বাবা, এমনকি দাদু-ঠাকুমার নামও। অথচ ২০২৫ সালের ভোটার তালিকায় অনির্বাণের মা-বাবার নাম স্পষ্টভাবে রয়েছে। জীবনের অদ্ভুত নির্মমতা—এই বছরের জুলাই মাসেই পিতৃবিয়োগ ঘটেছে অনির্বাণের। ঠিক সেই আবহেই তাঁকে সশরীরে হাজির হয়ে ‘কাগজ দেখানোর’ ডাক।
মেদিনীপুরের শরৎপল্লীর মাটি অনির্বাণের শেকড়। জন্ম সেখানেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজ তাঁকে টেনে এনেছে কলকাতায়। গড়িয়ায় বহু বছর ধরেই মা আর বোনকে নিয়ে তাঁর সংসার। তবু ভোটার তালিকার পাতায় এখনও তাঁর নাম জ্বলজ্বল করছে মেদিনীপুরেই। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের ২৯৯ নম্বর বুথের ভোটার তিনি—একদিকে শহুরে জীবন, অন্যদিকে পুরনো ঠিকানার অদৃশ্য টান।
এই জটিলতার মাঝেই সামনে এল পরিবারের বক্তব্য। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অনির্বাণের জেঠু বিদ্যুৎ ভট্টাচার্য জানালেন, ২০০২ সালে তাঁর ভাই প্রদ্যুৎ ভট্টাচার্য কেন ভোটার তালিকায় নাম তোলেননি, সে বিষয়ে তাঁর কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই। দাদু-ঠাকুমা প্রয়াত হওয়ায় তাঁদের নাম সময়ের সঙ্গে তালিকা থেকে বাদ পড়েছে—এটুকুই জানা। বিদ্যুৎবাবু আরও বললেন, এলাকার তিনটি বুথে ঘুরেও তিনি ভাইয়ের নাম খুঁজে পাননি। তাঁর কথায়, “সেসময়ে তো এত জটিলতা ছিল না।” তবু আশ্বাস দিলেন, এবারের ভোটার তালিকায় যেন অনির্বাণ ও পরিবারের প্রত্যেকের নাম থাকে, সেই চেষ্টাই চলছে।
নথির কথাও উঠে এসেছে। অনির্বাণের কাছে রয়েছে পাসপোর্ট-সহ একাধিক সরকারি কাগজ। বিএলও-র সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে। কমিশন যা চাইবে, সেটাই দেখানো হবে—পরিবারের তরফে এমনই বার্তা। অনির্বাণ নিজেও জানিয়েছেন, তাঁর নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে। তাই শুনানিতে ডাক এলে যথাযথ নথিপত্র নিয়ে হাজির হওয়াই তাঁর স্বাভাবিক দায়িত্ব।
একদিন যে গান ব্যঙ্গ হয়ে ছুটে এসেছিল মঞ্চ থেকে, আজ সে-ই গান যেন জীবনের সংলাপ। কাগজের দেশে শিল্পীর অস্তিত্ব যাচাইয়ের এই মুহূর্তে অনির্বাণ ভট্টাচার্য শুধু এক অভিনেতা নন—তিনি সময়ের আয়নায় দাঁড়িয়ে থাকা এক নাগরিক। হয়তো খুব শিগগিরই প্রমাণের ফাইল বন্ধ হবে, তালিকার পাতায় সব নাম ঠিকঠাক বসবে। কিন্তু এই অধ্যায় মনে করিয়ে দেবে—কখনও কখনও শিল্প বাস্তবের থেকে এগিয়ে যায়, আর বাস্তব এসে শিল্পীর দরজায় কড়া নাড়ে, নিঃশব্দে, অথচ গভীর অর্থে।