Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

রিয়েলিটি শো, মেগা সিরিয়াল—ফরম্যাট বদলায়, মৃত্যু নয়

২০০৮ সালে এক স্বপ্নের শুরু হওয়ার কথা ছিল। বড় বাজেট, শহরজোড়া প্রচার, নতুন মুখ খোঁজার উত্তেজনা—সব মিলিয়ে বাংলা টেলিভিশনের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী আয়োজন। 

রিয়েলিটি শো, মেগা সিরিয়াল—ফরম্যাট বদলায়, মৃত্যু নয়

শুভঙ্কর চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: 4 April 2026 15:02

শুভঙ্কর চক্রবর্তী

২০০৮ সালে এক স্বপ্নের শুরু হওয়ার কথা ছিল। বড় বাজেট, শহরজোড়া প্রচার, নতুন মুখ খোঁজার উত্তেজনা—সব মিলিয়ে বাংলা টেলিভিশনের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী আয়োজন। কিন্তু সেই আলোর উৎসব আচমকাই ঢেকে যায় এক মৃত্যুর ছায়ায়। প্রায় আঠারো বছর পর, ২০২৬-এ এসে আরেকটি শুটিং সেটে অকাল মৃত্যু—ঘটনাস্থল আলাদা, সময় আলাদা, কিন্তু প্রশ্নগুলো আশ্চর্যরকম এক। বদলেছে কি কিছু?

সেই সময়ের কথা। জনপ্রিয় তারকা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম টেলিভিশন উপস্থিতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল ‘লাক্স ফাটাফাটি ফিল্মি ফাইট (এফ৩)’। ১৪ অগাস্ট রাত ৯টার স্লটে সম্প্রচারের পরিকল্পনা, মোট ৫৪ পর্ব, লক্ষ্য ছিল নতুন প্রজন্মের তারকা তৈরি করা। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় প্রায় ৭০টি হোর্ডিং, বিশাল প্রচারযজ্ঞ—প্রত্যাশা ছিল তুঙ্গে। ৩৬ জন প্রতিযোগী গ্রুমিং সেশন শেষ করে প্রস্তুত, এমনকি শুটিংয়ের আগে প্রসেনজিতের সামনেই তাঁদের মহড়াও হয়ে গিয়েছিল।

এই নির্মিত উত্তেজনার মাঝেই হঠাৎ প্রবেশ করে সহিংসতা। মেদিনীপুরের একটি হোটেলে শোয়ের ইউনিটের সঙ্গে হোটেল কর্মীদের তর্কাতর্কি বাঁধে। সেই উত্তেজনা মুহূর্তে ভয়াবহ রূপ নেয়—চারতলার ছাদ থেকে নিচে পড়ে যান হোটেল কর্মী প্রসূন অধিকারী। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। মাথায় চোট, শরীরের একাধিক হাড় ভাঙা, শ্বাসকষ্ট—শেষ পর্যন্ত ভেন্টিলেশনে রাখা হলেও রাত ১১টা ৪৫ নাগাদ তাঁর মৃত্যু হয়।

এরপর শুরু হয় বিপরীতমুখী বয়ানের লড়াই। শোয়ের প্রযোজক গৌতম জৈন ও রাজীব মেহরা, সঙ্গে প্রতিযোগী সোমনাথ রায়চৌধুরীর দাবি—হোটেলের কিছু কর্মী মদ্যপ অবস্থায় মহিলা প্রতিযোগীদের উত্যক্ত করছিলেন, সেই থেকেই বিবাদ, আর প্রসূন নাকি নিজেই পাইপ বেয়ে নামতে গিয়ে পড়ে যান। অন্যদিকে হোটেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—তাঁদের মতে, ইউনিটের সদস্যরাই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় অশান্তি সৃষ্টি করেন এবং প্রসূনকে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। 

তদন্তে পুলিশ যে ছবি পায়, তা আরও উদ্বেগজনক। মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার রাজেশ সিং স্পষ্ট জানান, ঘটনাটি দুর্ঘটনা নয়—এটি ইচ্ছাকৃতভাবে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার ঘটনা। ঘটনাস্থলের অবস্থান, দেহ পড়ার দূরত্ব—সব কিছু বিচার করেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছন তদন্তকারীরা। অভিযুক্তদের বক্তব্যেও একাধিক অসংগতি ধরা পড়ে। তাঁরা দাবি করেছিলেন, অন্য হোটেল থেকে এসেছিলেন, কিন্তু তদন্তে উঠে আসে, রাত সাড়ে ন’টা থেকেই তাঁরা ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন।

ঘটনার পর গ্রেফতার হন গৌতম জৈন, রাজীব মেহরা ও সোমনাথ রায়চৌধুরী। আদালত তাঁদের ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেয়। শোয়ের সম্প্রচার থমকে যায়। প্রসেনজিৎ নিজেও স্বীকার করেন, সব প্রস্তুতি সম্পূর্ণ থাকলেও পরিস্থিতি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি আর আগের রূপে ফিরতে পারেনি। পরে নতুন প্রযোজকের হাতে ‘লাক্স ফাটাফাটি ফাইট ২০০৮’ নামে ফিরে আসে। প্রসেনজিতের জায়গায় সঞ্চালনায় আসেন যীশু সেনগুপ্ত। নতুন অডিশন, নতুন বিচারক, নতুন ফরম্যাট—হায়দরাবাদের রামোজি ফিল্ম সিটিতে শুটিং, বিজয়ীদের জন্য পুরস্কার ও সিনেমায় সুযোগের প্রতিশ্রুতি—সব কিছু বদলে গেলেও, সেই প্রথম ঘটনার দাগ মুছে যায়নি।

বছর পেরিয়ে ২০২৬। আবার এক শুটিং সেট, আবার এক মৃত্যু। তালসারী সমুদ্রতটে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’-র শুটিং চলছিল। প্রযোজনা সংস্থার দাবি বিকেল পাঁচটা নাগাদ দৃশ্য অনুযায়ী অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় জলে গোড়ালি ডুবিয়ে দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে ধীরে ধীরে গভীর জলের দিকে এগোতে থাকেন।
 

পরিচালক বলেন,  ইউনিটের সদস্যরা তাঁকে বারবার সতর্ক করেন—ওটা শটের অংশ নয়। তবু তিনি থামেন না। কিছু দূর যাওয়ার পর, যাঁরা সাঁতার জানতেন, তাঁরা জলে নামেন। তখন জল কোমর ছুঁয়ে গেছে। সহ-অভিনেত্রী শ্বেতার হাত ধরে ছিলেন রাহুল। কিন্তু ততক্ষণে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় পরিস্থিতি। শ্বেতার হাত ধরে থাকা অবস্থাতেই ভারসাম্য হারান রাহুল। শ্বেতাকে টেনে বাইরে আনা হলেও, রাহুলকে তৎক্ষণাৎ বের করা যায়নি। কখনও ডুবে যাচ্ছেন, কখনও ভেসে উঠছেন—এমন এক সংকটময় মুহূর্ত তৈরি হয়। বেশ কিছু জল-বালি গিলে ফেলেন তিনি। (Rahul Banerjee death, Rahul Banerjee drowning incident, Rahul Banerjee shooting death Tollywood, Tollywood actor Rahul Banerjee death 2026)

পরে তাঁকে দ্রুত টেনে তীরে আনা হয়। তখনও তাঁর জ্ঞান ছিল। এরপর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিচালকের দাবি, গাড়িতেও তাঁর সাড়া ছিল। সংস্থার দাবি অনুযায়ী, উদ্ধার করার সময় রাহুল জীবিত ছিলেন এবং কিছুটা যোগাযোগ করার চেষ্টাও করছিলেন। তাঁকে জলের বাইরে এনে প্রাথমিক চিকিৎসার চেষ্টা করা হয়। প্রথমে নিকটবর্তী একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হলেও সেখানে চিকিৎসক না থাকায় পরে দিঘা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মর্মান্তিক খবর—সব শেষ।

প্রযোজনা সংস্থা ম্যাজিক মোমেন্টস-এর কর্ণধার লীনা গঙ্গোপাধ্যায় (Magic Moments production controversy, Leena Gangopadhyay production safety issue) জানান, দৃশ্যটি ছিল অগভীর জলেরই, গভীরে যাওয়ার কোনও পরিকল্পনা ছিল না। গল্প অনুযায়ী, রাহুল ও শ্বেতা মধুচন্দ্রিমায়, চরিত্রের স্বভাব একটু ভীতু—এইটুকুই দেখানোর কথা ছিল। তিনি আরও বলেন, আগের দিনও শুটিংয়ে নৌকা ছিল, তিনিও নিজে উপস্থিত ছিলেন। সেই কারণেই স্থানীয়রা ঘটনাটি বিস্তারিত বলতে পেরেছেন।

কিন্তু তদন্তে উঠে আসছে অন্য দিকও। স্থানীয় সূত্রের দাবি, শুটিংয়ের প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি। কোনও পেশাদার লাইফগার্ড বা জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাও নাকি ছিল না। উপরন্তু, তালসারির শান্ত জলের নিচে চোরাবালির মতো বিপজ্জনক স্তর থাকার সতর্কতাও নাকি আগে থেকেই জানা ছিল।

২৯ মার্চ ২০২৬—শুটিং চলাকালীনই ঘটে এই দুর্ঘটনা। ৪৩ বছর বয়সে অভিনেতার মৃত্যু গোটা ইন্ডাস্ট্রিকে নাড়িয়ে দেয়। শোকের পাশাপাশি উঠে আসে অস্বস্তিকর প্রশ্নের সারি।

এমন সময় ফিরে আসে ২০০৮-এর সেই রিয়েলিটি শোয়ের স্মৃতি। সেই ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত গৌতম জৈনের পরবর্তী মন্তব্য যেন আজকের প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থ পায়—তিনি বলেন, ‘এই ধরনের ঘটনা অনেক সময় দুর্ঘটনা বলে চালানো হয়, কিন্তু বাস্তবে তা অবহেলার ফল।’ তাঁর অভিজ্ঞতায়, মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির নিরাপত্তা কাঠামো এখনও তৃতীয় বিশ্বের মতোই দুর্বল। 

দুটি ঘটনার মধ্যে ব্যবধান প্রায় দুই দশক। তবু মিলগুলো অস্বস্তিকর—নিয়ন্ত্রণের অভাব, নিরাপত্তার ঘাটতি, দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা। গৌতমবাবু আরও বলেন, ‘ভারতে বড় শুটিং বা ইভেন্টে বিমা বাধ্যতামূলক নয়। প্রায় ১০ লক্ষ টাকার বিমার জন্য ১ লক্ষ টাকার প্রিমিয়াম—অনেক প্রযোজকের কাছে তা অতিরিক্ত খরচ’।

শেষটা কি তাহলে শুধুই শোকের পরিসংখ্যান বাড়ানোর গল্প হয়ে থাকবে? নাকি এইবার সত্যিই হিসেব চাওয়া হবে—কাগজে নয়, বাস্তবে?কারণ উত্তরটা একটাই: নিরাপত্তা যদি এখনও আপসের বিষয় হয়, তবে এই ইন্ডাস্ট্রির প্রতিটি সেটই কি আসলে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার মঞ্চ নয়?


```