'The past is never dead, It's not even past'- দেবীপক্ষতে এক নির্বাসিত মেয়ের নিজের ঘরে ফেরার গল্প নিয়েই হয়েছিল নয়ের দশকের আলোড়িত নাটক 'বাসভূমি'।

শেষ আপডেট: 3 October 2025 20:24
এক ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় আনন্দমোহন চক্রবর্তীর মেজ মেয়ে হৈমন্তী হঠাৎ ফিরে আসে তার এককালের বাসভূমিতে। যেখান থেকে সে নির্বাসিত হয়েছিল বছর ছয়েক আগে এক পাশবিক ঘটনার শিকার হয়ে। এ এক নতুন হৈমন্তী নিঃসন্দেহে। কিন্তু বাড়ির অন্য মানুষগুলোও কি নতুন নয় তার কাছে? এবারও এক নতুন অভিজ্ঞতা হয় হৈমন্তীর। ছ'বছর আগের অভিজ্ঞতার চেয়েও হয়তো আরও তীব্র। আরও অপমানের। তফাত একটাই হৈমন্তীর এ অপমান এবার ছুঁয়ে যায় তার ছোট বোন জয়ন্তীকে। হঠাৎ যেন জয়ন্তী বড় হয়ে ওঠে।
'The past is never dead, It's not even past'- দেবীপক্ষতে এক নির্বাসিত মেয়ের নিজের ঘরে ফেরার গল্প নিয়েই হয়েছিল নয়ের দশকের আলোড়িত নাটক 'বাসভূমি'। অ্যাকাডেমিতে ২৮৩ রজনী রমরমিয়ে চলে এই কালজয়ী নাটক। নির্দেশনায় 'সায়ক' গোষ্ঠীর মেঘনাদ ভট্টাচার্য। পরবর্তীকালে ২০০৪ সালে একই গল্প নিয়ে রাজা সেন বানান চলচ্চিত্র 'দেবীপক্ষ' (Debipakkha)। যা মুক্তি পায় ২০০৪ (2004) সালের পুজোতে।

আনন্দমোহন চক্রবর্তী এলাকার জনপ্রিয় পুরোহিত। যিনি সৎ পথে চিরকাল জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তাঁর স্ত্রী ও তিন মেয়ে রেবতী, হৈমন্তী ও জয়ন্তী। ঠাকুরের নিত্যসেবা করেও তাঁর সংসারে এসেছে বারবার কালো ছায়া। তিন মেয়ের উপর একের পর এক বিপদ। বড় মেয়ে রেবতীর ভাল ঘরে বিয়ে হলেও তার বর মারা যায় অকালে। রেবতী বিধবা হয়ে ফিরে আসে বাপের বাড়ি। শোক সহ্য করতে না পেরে, সংসার করার সাধ না মেটায় রেবতী আজ মানসিক বিপর্যয়ে স্বাভাবিক নয়।
মেজ মেয়ে হৈমন্তী তাঁর প্রথম যৌবনে পাড়ার গুণ্ডা রতন সামন্তর হাতে ধর্ষিতা হয়। হৈমর প্রেমিক ছিল শিক্ষিত এক বেকার যুবক, নিখিলেশ। কিন্তু হৈমর উপর নজর পড়ে গুণ্ডা রতন সামন্তর। পুরোহিত বাবা ও মায়ের কাছে এ যেন এক অন্ধকার অধ্যায়। ধর্ষিতা মেয়েকে রাতের অন্ধকারে তারা মুম্বইতে এক কাকার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। লোকলজ্জা থেকে রেহাই পেতেই। কিন্তু হৈমন্তীর যৌবন তাকে রেহাই দেয় না। ঐ কাকাই তাকে আবার ধর্ষণ করার চেষ্টা করে। ঘর ছাড়া হৈমন্তী রোজগারের তাগিদে অচেনা শহরে চলে আসতে বাধ্য হয় অন্ধকার দেহ ব্যবসার পথে। উচ্চবিত্ত মহলের রাতের রজনীগন্ধা হয়ে যায় সে। এক উচ্চবিত্ত মিঃ শুক্লার রক্ষিতা হয়ে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে যায় হৈমন্তী। হৈমর অঙ্গুলি নির্দেশে সব চলতে থাকে। সতী হয়ে থেকে কী হবে এই সমাজে? 'বাসভূমি' (Basbhumi) নাটকে গল্পের নায়িকা হৈমন্তীর একটি সংলাপ ছিল 'অনেকখানি নিচে নামলে তবে অনেকখানি ওপরে ওঠা যায়'।
![]()
ছ বছর পর আনন্দমোহন চক্রবর্তীর বাসভূমি কিনে নিতে চায় রতন সামন্ত। নিরুপায় পুরোহিত এবার চিন্তিত হয়ে পড়ে তার ছোট মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তাহলে কি তারা ভিটেমাটি ছাড়া হবে?
এক ষষ্ঠীর সকালে ফিরে আসে হৈমন্তী তার বাপের বাড়িতে। চমকে যায় তার বাবা, মা, বোনেরা। তখনও পাড়ার লোকের চোখের আড়ালে চিলেকোঠার ঘরে স্থান হয় হৈমর। কিন্তু বাসভূমি বাঁচাতেই হৈমর প্রত্যাবর্তন। অনেক টাকা দিয়ে হৈম নিজের বাড়ি কিনে নেয় রতন সামন্তর কাছ থেকে। যে ধর্ষিতা মেয়েকে অশুচি ভেবে লোকলজ্জার ভয়ে নির্বাসিত করেছিল বাবা-মা, সেই মেয়ের টাকাতেই উদ্ধার হয় বাসভূমি। হোক না অন্ধগলির টাকা। তবু টাকাই যে শেষ কথা।
১৯৯৩ সালে 'বাসভূমি' নাটকে হৈমন্তীর চরিত্র করে সাড়া ফেলে দেন স্বাগতা মুখোপাধ্যায়। তখন স্বাগতা চক্রবর্তী তিনি। বড় মেয়ে মানসী সিনহা, ছোট মেয়ে দেবলীনা দাশগুপ্ত, হৈমর প্রেমিক নিখিলেশ মেঘনাদ ভট্টাচার্য, বাবা আনন্দমোহনের চরিত্রে পার্থ গোস্বামী, মা অনিমা বীণা মুখোপাধ্যায়। রতন ধূর্জটি দে।
নাট্যকার অভিনেতা মেঘনাদ ভট্টাচার্যর নির্দেশনায় 'সায়ক' গোষ্ঠীর 'বাসভূমি' নাটক আজও নাটকের ইতিহাসে মাইলস্টোন। পরে আবার ২০০৬ সালে গিরিশ মঞ্চেও নতুন চরিত্র চিত্রণে হয়েছিল। তখন হৈমন্তীর ভূমিকা করেন সুদীপা বসু। কিন্তু আজও হৈমন্তী মানেই দর্শক মনে স্বাগতা মুখোপাধ্যায় জায়গা করে আছেন। নাটকটি লিখেছিলেন ইন্দ্রাশিস লাহিড়ি।

এরমাঝে ২০০৪ সালে 'বাসভূমি'র গল্প নিয়েই চরিত্রের নামগুলি এক রেখেই 'দেবীপক্ষ' সিনেমা বানান রাজা সেন। পুজো রিলিজ ছবি ছিল। একেবারে তারকাখচিত ছবি 'দেবীপক্ষ'। বাবা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee), সন্ধ্যা রায় (Sandhya Roy) বহুদিন পর বাংলা ছবিতে মায়ের চরিত্রে, রেবতী শতাব্দী রায়, হৈমন্তী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত (Rituparna Sengupta) ও জয়ন্তী কোয়েল মল্লিক (Koel Mallick)। নিখিলেশ কৌশিক সেন ও রতন সামন্ত বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়।
অভিনয় সবাই ভাল করেছিলেন কারণ সকলেই পোড় খাওয়া অভিনেতা। কিন্তু নাটকের মতো ছবি চলেনি। 'বাসভূমি' কাল্ট হলেও 'দেবীপক্ষ' সেভাবে মানুষের কাছে পৌঁছয়নি। যদিও নাটকের তো কোনও সংরক্ষণ নেই। সিনেমার শেষে অতিনাটকিয়তা দেখান রাজা সেন। ত্রিশূল দিয়ে রতন সামন্তকে বধ করতে যায় হৈমন্তী। দুর্গা রূপে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত আবির্ভূতা হন। এই অতিনাটক দৃশ্যই 'দেবীপক্ষ' ছবির কাল হয়। ছবির চিত্রনাট্য দুর্বল ছিল। নাটকের মতো প্রাণ পায়নি। তবু সব বাঘা বাঘা অভিনেতা অভিনেত্রী থাকায় দেখতে ভাল লাগে। শতাব্দী রায় শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেত্রীর বিএফজেএ পুরস্কার পেয়েছিলেন রেবতীর চরিত্র করে।
আজও পুজোর বাংলা ছবি মানেই 'দেবীপক্ষ' নাম আসবেই। পুজো মানেই শুধু আনন্দের নয়। পুজোর অন্য এক দরজা খুলে দেয় 'দেবীপক্ষ'।