
শেষ আপডেট: 4 July 2023 09:04
ভারতীয় চলচ্চিত্র যতই আধুনিক হোক না কেন, ছায়াছবি সংরক্ষণের (Film Preservation) ব্যাপার গভীর শিথিলতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে মূলধারার পরিচালকদের ছবিও যে চলচ্চিত্র শিক্ষার দরকারি উপাদান, তা মনে করেননি প্রায় কেউই। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিকের ফিল্ম-সংক্রান্ত আলোচনা করেই বাঙালি চিরকাল ফিল্মবোদ্ধা হতে চেয়েছে। তা করতে গিয়ে, বিনোদনমূলক ছবিকে সমালোচনা করতে করতে ছবিগুলোর সংরক্ষণই হয়নি সেভাবে।
ফলে অজয় কর, তরুণ মজুমদার (Tarun Majumdar), তপন সিনহা, অগ্রদূত, অগ্রগামী, রাজেন তরফদার, ইন্দর সেনদের অনেক ছবিই কালের অতলে হারিয়ে গেছে। সরকার পক্ষও এ ব্যাপারে উদাসীন। অনেক ছবির প্রযোজক ব্যাঙ্কের লোনের টাকা শোধ করতে না পেরে ছবির প্রিন্ট খুইয়েছেন। অনেক ছবি নষ্ট হয়ে গেছে ফিল্ম ল্যাবরেটরিজে থেকেও।

২০২২ সালের ৪ জুলাই প্রয়াত হয়েছেন কিংবদন্তি পরিচালক তরুণ মজুমদার। তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর অনেক ছবি চিরতরে হারিয়ে গেছে। অথচ ষাট-সত্তরের দশকে এগুলি ছিল বহুল আলোচিত ছবি। সুপারহিট করে বক্সঅফিসে। এসব ছবি বাংলাকে পৌঁছে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক স্তরে। অথচ সেসব ছবি আজ আর ইচ্ছে করলেও দেখার উপায় নেই, যা দুর্ভাগ্যজনক।
তরুণ মজুমদারের হারিয়ে যাওয়া ছবির গল্প নিয়েই এই প্রতিবেদন।
'পলাতক' এর পর তরুণ মজুমদার 'যাত্রিক' গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে এসে 'আলোর পিপাসা' ছবি দিয়ে স্বাধীন ভাবে একক নামে ছবি পরিচালনা শুরু করেন। তিনি একক ভাবে ১৯৬৫ সালে দু'টি ছবি করেন, বসন্ত চৌধুরী, সন্ধ্যা রায়, অনুপ কুমারকে নিয়ে। 'আলোর পিপাসা'। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা রায়কে নিয়ে করেন 'এক টুকু বাসা'। সে সময় 'এক টুকু বাসা' ছিল বেশ নতুন ধারার ছবি।

ফিল্মের পোস্টারে চশমা পরা নায়িকার মুখও যে হিট করতে পারে, তা সন্ধ্যা রায়কে চশমা পরিয়ে প্রমাণ করলেন তরুণ মজুমদার। 'এক টুকু বাসা' ছবি ছিল এক ঝাঁক তারকার মেলা। সৌমিত্র-সন্ধ্যা ছাড়াও ছিলেন অনুপ কুমার, অনুভা গুপ্ত, গীতা দে, কেতকী, নৃপতি, অজিত, ভানু, জহর, হরিধন, শ্যাম লাহা, রেণুকা রায়, পদ্মা দেবী। ১৯৬৫ সালের ২৬ মার্চ মুক্তি পায় এই ছবি। মিনার, বিজলি, ছবিঘরে রোজ তিনদফায় হাউসফুল শো চলেছিল। অফুরন্ত হাসি আর ভালবাসার ছবি এই 'এক টুকু বাসা'। তরুণ মজুমদারের কমেডি ছবি খুব একটা নেই, কিন্তু 'একটুকু বাসা' ছিল তাঁর সেই কমেডি ছবি। ছবিটি প্রযোজনাও করেন তরুণ মজুমদার।

ছবির নায়ক জাঁদরেল উকিলের ছেলে এখনও সে ছাত্র। এমতাবস্থায় প্রথম যৌবনে সে নায়িকার প্রেমে পড়ে এবং বাড়ির অমতেই বউ আনল বিয়ে করে। অভিভাবকরা মেনে নিলেও নির্দেশ দিল, পরীক্ষায় পাশ না অবধি স্বামী-স্ত্রী এক ঘরে থাকবে না। শুরু হল দু'জনের একই বাড়িতে আলাদা থাকা আর অভিভাবকদের চোখ এড়িয়ে দু'জনের চোখাচোখি মন বিনিময়।

'এসো এসো আমার ঘরে এসো বসে আছি আসবে বলে' ও 'আমি সংসারে রব না মা'-- হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে ও মুকুল দত্তের কথায় গানদু'টি গেয়েছিলেন আরতি মুখোপাধ্যায়। ছবির প্রিন্ট লুপ্ত হওয়াতে গানগুলোও চলে গেছে বিস্মৃতির আড়ালে।

এই ছবি দিয়েই তরুণ মজুমদারের বম্বের হিন্দি ছবির জগতে প্রবেশ, ছবির প্রযোজক ও সঙ্গীত পরিচালক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে। বম্বে গেলে তরুণ হেমন্তর 'গীতাঞ্জলি' বাড়িতেই থাকতেন। 'পলাতক'-এর হিন্দি 'রাহগীর' করলেন তরুণ মজুমদার। তবে এবার নায়ক আর অনুপ কুমার নয়, বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়। নায়িকা সন্ধ্যা রায়।

১৯৬২ সালে 'বিশ সাল বাদ' ছবিতে বিশ্বজিৎকে নায়ক করেই বিশাল হিটের মুখ দেখেন হেমন্ত। তাই এই ছবিতে বিশ্বজিৎকেই নায়ক করেন। অনিল চট্টোপাধ্যায়কে বম্বেতে লঞ্চ করে ফ্লপ হয়েছিলেন হেমন্ত। তাই অনুপকে নায়ক করার ঝুঁকি নেননি। বিশ্বজিৎ 'রাহগীর' এর জন্য জাতীয় পুরস্কারে সেরা অভিনেতার মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু 'রাহগীর' বক্সঅফিসে মুখ থুবড়ে পড়ল। আসলে বাংলার গল্প যেন হিন্দি পরিবেশে ঠিক কদর পেল না।

হেমন্ত কিন্তু 'পলাতক'-এর সুরেই হিন্দি সব গানের সুর করেছিলেন। রুমা-গীতার 'মন যে আমার কেমন কেমন করে', হিন্দিতে গাইলেন আশা ও ঊষা দুই বোন আর নাচলেন বম্বের দুই নৃত্য পটীয়সী শশীকলা ও পদ্মা খান্না। শশীকলা 'গোলাপ' চরিত্র করে পেয়েছিলেন বিএফজেএ পুরস্কার।
'জীবনপুরের পথিক রে ভাই' হেমন্ত গাইলেন হিন্দিতে 'জনম সে বনজারা হুঁ বন্ধু'। কিন্তু ছবিটি দেখতে পাওয়ার আর কোনও সুযোগই নেই। অজানার গহ্বরে হারিয়ে গেছে বিশ্বজিৎ-সন্ধ্যা রায়ের সেরা অভিনয়ের 'রাহগীর'।
‘সংসার সীমান্তে’র অঘোর করতে চাননি উত্তম কুমার। তখন নায়ক ইমেজ ছেড়ে ডিগ্ল্যামারাইজড চোরের চরিত্র করতে সাহস পাননি উত্তম। তাই অঘোর চরিত্রটি পেয়েছিলেন সৌমিত্র। তিনি বলেছিলেন, 'উত্তমদা সংসার সীমান্তের চোর করলে আমার স্বপ্নের চরিত্র করা হতো না। শেষ অবধি নায়ক ইমেজ সাহস করে ছেড়ে উত্তমদা 'দেবদাস'-এ চুনীলালের রোলে গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরলেন।'

বাঙালির আইকনিক যে ফেলুদা উটের পিঠে চেপে চোর ধরতে যান, তিনি আবার পরক্ষণেই পোশাক বদলে ছ্যাঁচড়া চোর রূপে অবতীর্ণ হন ‘সংসার সীমান্তে’।

ঋত্বিক ঘটক এই ছবি করবেন বলে ঠিক করলেও পরে তা না করায় তরুণ মজুমদার করলেন সংসার সীমান্তে। অঘোর চোরের ভূমিকায় সৌমিত্র আর পতিতার রোলে সন্ধ্যা রায়। পতিতাগৃহে চুরি করতে যায় চোর এবং সেখানে পতিতাকেই ভালোবেসে ফেলে সেই চোর। চোরটি পতিতাকে দেয় নতুন সংসার, নতুন জীবন। সৌমিত্রর জীবনের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয় অঘোর। সত্যজিতের ছবি করেও জীবনের শেষ দিন অবধি এই অঘোরকে ভালবেসে গেছেন সৌমিত্র আর আক্ষেপ করে গেছেন ‘সংসার সীমান্তে’র প্রিন্ট পাওয়া যায় না বলে।
তরুণ মজুমদারের সর্বকালীন জনপ্রিয় ছবি বাসিকা বধূ। অথচ এই ছবিটি দেখার সুযোগ কম। পূর্ণাঙ্গ ছবির প্রিন্ট দুঃষ্প্রাপ্য। কিছুজনের ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে। এই ছবি দিয়েই মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের ফিল্মে আগমন। জুঁই বন্দ্যোপাধ্যায়েরও ফিল্মে আসা তরুণ মজুমদারের এই ছবির হাত ধরে।

শুধু তাই নয়, গানেও এই ছবি এগিয়ে। সন্ধ্যা রায় ও রবি ঘোষ দারুণ একটি আইটেম নাম্বার নেচেছিলেন যে ভাবে সন্ধ্যা রায়কে আগে দেখা যায়নি। 'শুক বলে কেন সারি বাপের বাড়ি যাস' দ্বৈত সঙ্গীতে গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও বেলা মুখোপাধ্যায়।
শ্রী প্রাচী ইন্দিরা পদ্মশ্রীতে মুক্তি পায় কিশোর প্রেমের এই অম্লমধুর কাহিনি। ছবিটির হিন্দি রূপও করেন তরুণ মজুমদার, যার কালার প্রিন্ট পাওয়া যায়। অভিনেতারা বম্বের। হিন্দিতে বাংলার সেই মিষ্টত্ব আসেনি। তবে ছবিটি যথেষ্ট জনপ্রিয়।

বাঙালি বোধহয় তার হারানো সম্পদের দুঃখবিলাস যাপন করেই সুখী থাকে। তাই শুধু ছবিগুলি নয়, ছবিগুলি যেসব সিনেমাহলে হাউসফুল চলেছিল, সেইসব হলও আজ প্রায় ধুলিসাৎ। ছবির প্রিন্ট রক্ষা করার কথা ওঠে পালা-পার্বনে, কিন্তু সে কথা আর রাখা হয় না কখনওই।
তরুণ মজুমদার (১৯৩১-২০২২): কানন দেবীর শিক্ষানবীশ থেকে বাঙালির ‘ভালবাসার অনেক নাম’