দ্য ওয়াল ব্যুরো: শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন "থ্যাটারে (থিয়েটার) লোকশিক্ষে হয়।" লেকগার্ডেনসের অনির্বাণ চক্রবর্তী লোকশিক্ষার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন তথ্যচিত্রকে। পেশায় স্কুল শিক্ষক অনির্বাণকে বহুদিন ধরে ভাবিয়ে তুলত বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা।
একা হাতে সমস্যাগুলির সমাধান করতে পারবেন না। কিন্তু কিছু মানুষের কাছে সমস্যাগুলি তুলে ধরে সমাধানের পথদিশা দেখাতে পারবেন। এই চিন্তা থেকেই স্বল্পদৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্র তৈরি করা শুরু করেছিলেন অনির্বাণ ।
২০১৬ সালে তিনি তৈরি করেছিলেন তাঁর প্রথম তথ্যচিত্র
Ode To Sundarbans। যেটি দিল্লীর সপ্তম ন্যাশনাল সায়েন্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে চূড়ান্ত পর্বের জন্য মনোনীত হয়েছিল। তথ্যচিত্রটিতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্রকে কীভাবে বিভিন্ন ফ্যাক্টর সংকটাপন্ন করে তুলছে, তার হদিশ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে তাঁর তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায় মানুষের টিকে থাকার লড়াই।
https://youtu.be/YJ9wgi-7iHc
২০১৭ সালে অনির্বাণ তৈরি করেন
Jhanklai -The Mystery নামে আরেকটি তথ্যচিত্র। সেই তথ্যচিত্রে উঠে এসেছিল বর্ধমানের কিছু গ্রামের মানুষদের আশ্চর্য্যজনক জীবনযাত্রার জলছবি। যার সঙ্গে প্রায় পাঁচশো বছর ধরে জড়িয়ে আছে ঝনকলাই বা কেউটে সাপ।
এই সব গ্রামে কেউটে সাপেরা নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায় মাঠ ঘাট রাস্তা থেকে শুরু করে গ্রামবাসীদের বাড়ির আসে পাশে, এমন কি রান্নাঘরেও।
গ্রামের মানুষরা ভুলেও সাপ মারেন না। গ্রামবাসীরা মনে করেন কেউটে সাপ আঘাত না পেলে কাউকে কামড়ায় না।
এছাড়াও বেহুলা-লখীন্দর, ঝনকেশ্বরী মন্দির সংক্রান্ত কিছু সংস্কার, ধর্ম ও বিজ্ঞানের তথাকথিত অহি-নকুল সম্পর্ক ও সাপ নিয়ে মানুষের কিছু অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার উঠে এসেছিল অনির্বাণের এই তথ্যচিত্রে। যা সমাজকে যথেষ্ট নাড়া দিয়েছিল। এবং আজও তার রেশ শেষ হয়নি।
https://youtu.be/vBFZ57PHp_k
২০১৮ সালে অনির্বাণ তৈরি করেন তাঁর তৃতীয় তথ্যচিত্র
The Oasis। কলকাতা নামের কংক্রিটের মরুভূমিতে এক টুকরো মরুদ্যান গ্রিন ট্যাক্সি ও তাঁর চালক ধনঞ্জয় চক্রবর্তীকে নিয়ে। যিনি কলকাতার মানুষের মন থেকে হারিয়ে যাওয়া সবুজ আবার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ছবিটি ইতিমধ্যেই দেশে বিদেশে দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
https://youtu.be/lPHpW-xKlUs
হঠাৎ তথ্যচিত্র তৈরি করার কথা ভাবলেন কেন?
অনির্বাণ: আমি বিশ্বাস করি তথ্যচিত্র সমাজের সমস্ত স্তরের মানুষের কাছে কোনও তথ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য আদর্শ এক মাধ্যমI
তথ্যচিত্রগুলি বানানোর জন্য অর্থের সংস্থান কীভাবে করেছেন?
অনির্বাণ: দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা কোনও প্রযোজক পাইনি। বিভিন্ন ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়েছি। এছাড়া আমার টিম 'অনিকেত' -এর সদস্যরা সাধ্যমতো অর্থ সাহায্য করেছেন। ছবিগুলির সাফল্যের পিছনেও আছে আমার টিমের সদস্য সদস্যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম।
[caption id="attachment_135387" align="aligncenter" width="712"]
অনির্বাণের ইউনিট[/caption]
পছন্দের শর্ট ফিল্ম পরিচালক কে?
অনির্বাণ: আমার পছন্দের শর্ট ফিল্ম মেকার বলতে কেউ নেই। আমি সবার ছবি দেখি। প্রত্যেকের কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য আমাকে শিক্ষা দেয়।
মেনস্ট্রিম সিনেমা করার স্বপ্ন দেখেন?
অনির্বাণ: হ্যাঁ মেনস্ট্রিম সিনেমা করতে চাই। তার জন্য স্ক্রিপ্টও তৈরি। কিন্তু প্রযোজকের আকস্মিক মৃত্যু হওয়ায় প্রজেক্টটি নিয়ে এগোতে পারিনি। তবে ছবি করলে গতানুগতিক ছবি করবো না। সমাজের সামনে আমি আমার কিছু বক্তব্য রাখতে চাইব যেগুলি আমি বলতে পারিনি।
তথ্যচিত্র শ্যুট করার সময়ের কোনও স্মরণীয় ঘটনা মনে আছে?
অনির্বাণ: অনেক স্মরণীয় ঘটনা আছে।
Ode to Sundarbans ছবিটির শুটিংয়ের সময় গভীর জঙ্গলের ভেতর আমার ইউনিটকে ঢুকতে হয়েছিল। আশেপাশের পরিবেশ ছিল ভয়ঙ্কর। বাঘ ও সাপের আক্রমণের সম্ভাবনা ছিল। ইউনিটের সবার মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। সবাই অপেক্ষা করছিলেন কখন ' প্যাক আপ' বলবো। সামান্য পাতা খসার শব্দেও চমকে উঠছিলাম আমরা।
Jhanklai -The Mystery ছবির শুটিং-এ আমার ইউনিটকে কাটাতে হয়েছিল একগাদা বিষাক্ত কেউটের সঙ্গে। যাদের বিষদাঁত ভাঙা ছিল না। বা মুখ সেলাই করা ছিল না। সামান্য এদিক ওদিক হলেই এক ছোবলে ছবি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
ভবিষ্যতে কী বিষয় নিয়ে তথ্যচিত্র বানাবেন ভাবছেন ?
অনির্বাণ: ভবিষ্যতে
LGBT কমিউনিটি (লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার ইত্যাদি) ও প্লাস্টিক জনিত দূষণ নিয়ে ছবি বানাবো।
অনির্বাণের The Oasis ছবিটি গত ২২ আগস্ট কলকাতায় হওয়া আন্তর্জাতিক শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃত হয়েছে। ছবিটি দিল্লির উডপ্যাকার ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ও জয়পুর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও পাঠানো হয়েছে।

তবে পুরস্কারের কথা অনির্বাণের কোনও দিন ভাবেননি। ভাবতেও চান না। তিনি চান তাঁর ছবি মানুষ দেখুন এবং সমস্যার গুরুত্ব অনুধাবন করে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসুন। সেটাই হবে তাঁর পাওয়া শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।
তথ্যচিত্র বানাতে গিয়ে বিভিন্নভাবে আর্থিককষ্ট ও সামাজিক সমস্যায় পড়েছেন অনির্বাণ। কিন্তু পিছিয়ে আসেননি। একজন শিক্ষকের মনন নিয়ে সমাজের সেই অন্ধকারে আলো ফেলার চেষ্টা করছেন, সচরাচর যেখানে আমাদের চোখ যায় না।