শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
তিনি বিশ্বাস করতেন, 'ক্লাস দর্শকদের জন্য ছবি' বলে কিছু হয় না। ছবি হবে এমন, যা দেখে সকলেরই কিছু না কিছু প্রাপ্তি হবে। তাই তিনি বলতেন "আমার ছবি দেখে অশিক্ষিতরাও শিক্ষিত হয়ে হল থেকে বেরোবে।" শতবর্ষ পার করেও তাই আজও তিনি ও তাঁর সিনেমা সকলের প্রিয়। শুধু আজ নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম রয়ে যাবে তাঁর আহ্বান, অগ্নীশ্বর, মৌচাক, ধন্যি মেয়ে, পিতাপুত্র, অর্পিতা।
তিনি পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, ইন্ডাস্ট্রির সকলের প্রিয় ঢুলুদা। ১৯১৯ সালের এই দিনেই জন্মেছিলেন তিনি। আজ শতবর্ষ পার করে ১০১ তম বছরে পড়লেন তিনি।
পুরস্কার নয়, দর্শকের ভালবাসাই আসল প্রাপ্তি-- এই মনোভাবেই বিশ্বাসী ছিলেন ঢুলুদা। চলছে তাঁর শতজন্মবার্ষিকী। অবশ্য এই সেঞ্চুরি শুধু বয়সে নয়, তাঁর অগ্নীশ্বর, নিশিপদ্ম, মৌচাক, নতুন জীবন-- এই ছবিগুলোও সেঞ্চুরি হাঁকানো ব্লকব্লাস্টার হিট।
[caption id="attachment_231080" align="aligncenter" width="750"]

মৌচাকের সেটে উত্তম, মিঠু , ঢুলুদা[/caption]
একটা গল্প শোনা যায়। একবার দোকানে চাল কিনতে গিয়েছেন ঢুলুদা। দু’হাতে পাঁচ কেজি, পাঁচ কেজি দশ কেজির দুটো থলে। দোকান থেকে রিক্সায় উঠেছেন, যথাসময়ে বাড়িও পৌঁছলেন। রিক্সা থেকে নেমে তিনি চালককে টাকা দিতে যাবেন, চালক হঠাৎ বলে উঠলেন, “আমি আজ আপনার থেকে টাকা নিতে পারব না বাবু।” অরবিন্দ বাবু বুঝে উঠতে পারলেন না কারণ। রিক্সাচালক বললেন, “বাবু, আমি জানি আপনি কে। আপনি অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। আপনার পরিচালিত ‘অগ্নীশ্বর’ কাল আমি দেখেছি। উত্তম কুমারের বিশাল ভক্ত আমি। কিন্তু ওই মানুষটার এমন রূপ আগে কখনও দেখিনি। আপনার জন্যই তা সম্ভব হল। কাল ‘অগ্নীশ্বর’ দেখতে বসে খুব কেঁদেছি। আজ কিছুতেই আপনার থেকে টাকা নিতে পারব না।”

একথা শুনে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ওই রিক্সাওয়ালা ভদ্রলোককে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, তিনি তাঁর আসল পুরস্কার পেয়ে গিয়েছেন। একজন রিক্সাওয়ালার ভালবাসাও কিন্তু সেদিন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে ফেলে দেননি তিনি। এটাই হলেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। দর্শককে অনাবিল আনন্দ দিতেই ছবি বানাতেন তিনি। পুরস্কারের কথা ভাবতেন না, ভাবতেন না সমালোচনার কথা। এখানেই তাঁর স্বতন্ত্রতা।
সত্যচরণ মুখোপাধ্যায়ের কনিষ্ঠ পুত্র অরবিন্দ। ছয় ছেলের বড় হলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক বনফুল বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়। বিহারের কাটিহার জেলার মণিহারি গ্রামে জন্ম। কাটিহারেই ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পরে অরবিন্দবাবু ১৯৩৯ সালে পড়াশোনা করতে আসেন শান্তিনিকেতনে। রবীন্দ্রনাথের স্নেহ ও সাহচর্যও পান তিনি।
[caption id="attachment_231078" align="aligncenter" width="600"]

সপরিবার।[/caption]
এর পরে তিনি চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে ভর্তি হন বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজে। তবে ডাক্তারি পড়া অসমাপ্ত রেখে চতুর্থ বর্ষের শেষে তিনি চলে আসেন কলকাতায়। যোগ দেন সুখ্যাত চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান ‘নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও’য়। অগ্রদূতের বিভূতি লাহার সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন ‘পথে হল দেরী’, ’ত্রিযামা’র মতো ছবিতে। খুব কাছ থেকেই জীবনের শুরুতে পান ছবি বিশ্বাস, ছায়া দেবী, উত্তম, সুচিত্রাদের। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, পশুপতি চট্টোপাধ্যায়, বিমল রায়দের মতো পরিচালকের সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন।
প্রথম ছবি ‘কিছুক্ষণ’ করে চমকে দিয়েছিলেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। অরুন্ধতী দেবী ও অসীম কুমার অভিনীত ছবিটি নির্বাচিত হয় রাষ্ট্রপতি পুরস্কারের জন্য। রেলস্টেশনে কয়েক ঘণ্টার গল্প। কিন্তু এখানে বাস্তবকে সাজানোর একটা কারুকার্য আছে। অনেকটা যেমন দু’বছর পরে তৈরি সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’য় করলেন। কিন্তু 'কিছুক্ষন' হারিয়ে গেল চর্চা থেকে।

দ্বিতীয় ছবি ‘আহ্বান’-এ অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় তাঁর জাত চিনিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ বুঝে গিয়েছিল, এক অনন্য প্রতিভাবান পরিচালকের আগমন ঘটল। শুধু সফল পরিচালকই নন, অরবিন্দবাবু ছিলেন দক্ষ চিত্রনাট্যকারও।
'এক্সট্রা'দের জীবন নিয়ে করলেন অন্য ধারার ছবি ‘নকল সোনা’। যাতে আবার উত্তম, হেমন্ত, শ্যামল, সৌমিত্র, অপর্ণারা গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্সও দেন। অরবিন্দবাবু তৈরি করেছেন কমেডি ছবি ‘মৌচাক’, 'ধন্যি মেয়ে’। নতুন মুখ মিঠুন চক্রবর্তী ও দেবশ্রী রায়কে নায়ক-নায়িকা করে তৈরি করেছেন ‘নদী থেকে সাগর’। মিঠুনের প্রথম বাংলা ছবি এটি এবং দেবশ্রীরও নায়িকা রূপে ডেবিউ ছবি এটিই। শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়েরও নায়ক রূপে প্রথম ছবি অরবিন্দ বাবুর হাত ধরেই, 'শীলা'।

শক্তি সামন্তের অনুরোধে হিন্দি ছবি ‘অমরপ্রেম’-এর চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন তিনি। রাজেশ খান্না-শর্মিলা ঠাকুর অভিনীত যে ছবি ছিল আসলে অরবিন্দর উত্তম-সাবিত্রী অভিনীত ‘নিশিপদ্ম’র রিমেক। এই ছবির চিত্রনাট্যের জন্য ‘ফিল্মফেয়ার’ পুরস্কারও পান তিনি। যার ফলে একের পর এক ডাক আসতে থাকে বলিউড থেকে। কিন্তু বাংলা ছবিকে ভালোবেসে, বাংলার দর্শককে ভালোবেসে সেসব অফার ফিরিয়ে দেন তিনি। ছোট দুঃখ, সুখ নিয়ে যেমন ছবি বানাতেন, তেমনই ছোট ছোট সুখ নিয়েই অল্পতে খুশি থাকার মন্ত্রটি তিনি জানতেন।
[caption id="attachment_231077" align="aligncenter" width="712"]

স্বামী-স্ত্রী[/caption]
অরবিন্দবাবু কখনওই শুধু বড় নামের বড় স্টারের পেছনে ছুটতেন না। তাই উত্তম কুমারকে নিয়ে তিনি যেমন কাজ করেছেন, স্বরূপ দত্ত বা গায়ক শৈলেন্দ্র সিংকেও হিরো করেছেন তাঁর ছবি পিতাপুত্র কিংবা 'অজস্র ধন্যবাদ'-এ। রঞ্জিত মল্লিকের কেরিয়ারে মাইলস্টোন মৌচাক। জয়া বচ্চনের মাইলস্টোন ছবি 'ধন্যি মেয়ে'। পরিচালক ঢুলুবাবুই।

অরবিন্দ বাবু নতুনদের সবসময় উৎসাহ দিতেন। এখনকার নায়ক জিৎ তাঁর বাড়িতে গিয়ে প্রণাম করেছিলেন। জন্মভূমিতে নবীন নায়ক বিক্রমের চরিত্র করে ভাস্বর চট্টোপাধ্যায় যখন বিশাল জনপ্রিয়, তখন অরবিন্দবাবু টিভিতে ওঁর অভিনয় দেখে ফোন করেন। ভাস্বর ঢুলুবাবুর বাড়ি গিয়ে দেখাও করেছিলেন। শেষ দিকে ছবি না বানালেও নতুনদের নিয়ে কাজ করার তাঁর আগ্রহ ছিল।
২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি, ৯৬ বছর বয়সে প্রয়াত হন কিংবদন্তি পরিচালক। তবে অরবিন্দবাবুর শিল্পমূল্যর বিচার হয়নি তেমন করে। রিক্সাওয়ালা থেকে বিদেশের কর্পোরেট অফিসার পর্যন্ত যাঁর ছবি আগ্রহ নিয়ে দেখতেন, তাঁর ছবির সম্পূর্ণ লিস্টই নেই উইকিপিডিয়ায়। অথচ অনেক খারাপ মানের পরিচালকদের ছবির লম্বা লিস্ট মেলে সেখানে। শতবর্ষ পেরিয়ে ঢুলুদা অবশ্য আজও দর্শকদের শ্রদ্ধার ও ভালবাসার আপনজন। মৌচাক, অগ্নীশ্বর আজও টিভিতে হলে টিআরপি বেড়ে যায় চ্যানেলের।

বাংলা ছায়াছবির স্বর্ণযুগে তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার, অগ্রগামী ও অগ্রদূত যেমন স্মরণীয়, তেমনই স্বচ্ছ ও সুস্থ বাণিজ্যধর্মী ছবির জন্য অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ও অভিনন্দনযোগ্য থেকে যাবেন চিরকাল।