অধুনা ওপার বাংলার কিশোরগঞ্জের সন্তান দেবব্রত বিশ্বাস (Debabrata Biswas), সবার প্রিয় জর্জদা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাঁর গানের অবদান, ব্যক্তিগত লড়াই আর অনন্য শিল্পযাত্রা আজও স্মরণীয়।

জর্জ বিশ্বাস।
শেষ আপডেট: 22 August 2025 14:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অবিভক্ত বাংলার কিশোরগঞ্জে জন্মেছিলেন তিনি। যদিও পরবর্তী জীবনে কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের বাড়িই হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা, তবু মনের টানে তিনি কখনো জন্মভূমিকে ভোলেননি। মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগ, পূর্ববঙ্গের প্রতি টান, সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য সেতুবন্ধনকারী শিল্পী। তিনি সবার প্রিয় আজ দেবব্রত বিশ্বাস। ১৯১১ সালের এই দিনে অর্থাৎ ২২ অগস্ট জন্ম হয় তাঁর। ‘জর্জদা’ নামেই তিনি বাঙালির হৃদয়ে অমলিন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় যখন দুই বাংলার শিল্পীরা মঞ্চে একত্র হয়েছিলেন, তখন দেবব্রত বিশ্বাস নিজের জায়গা খুঁজেছিলেন বাংলাদেশি শিল্পীদের পাশেই। যদিও নিয়ম অনুযায়ী তাঁর গাওয়ার কথা ছিল পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের দলে, কিন্তু তিনি সরাসরি জানিয়ে দিলেন—“আমি তো বাংলাদেশের লোক, আমাকে কেন এ পারের শিল্পীদের দলে রাখবে?”
সেই যে জেদ ধরেছিলেন, সেই জেদেই জয়ী হয়েছিলেন তিনি। তাই প্রথম দিনের আসরে বাংলাদেশের শিল্পীদের সঙ্গে তিনিও মঞ্চে উঠেছিলেন। সেদিন রবীন্দ্রসদনে পরিবেশিত হয়েছিল বাংলাদেশের সম্মিলিত পরিবেশনা ‘রূপান্তরের গান’। সেই পরিবেশনার ফাঁকেই জর্জদা এককভাবে গেয়ে শোনান তিনটি রবীন্দ্রসংগীত। তাঁর এই উপস্থিতি মুক্তিযুদ্ধপন্থী শিল্পীদের আন্দোলনে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছিল। জর্জ বিশ্বাস ছিলেন এমনই অকুতোভয়।
এই যুদ্ধে তিনি গানের শক্তিকেই হাতিয়ার করেছিলেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র সৌমেন্দ্রনাথকে নিজে চিঠি লিখে অনুরোধ করেন মুক্তিযুদ্ধের আবহে দুটি গান লিখে দিতে। অনুরোধে সাড়া দেন সৌমেন্দ্রনাথ। লিখলেন দুটি গান— “ওই তারা চলে দলে দলে মুক্তি পতাকাতলে” এবং “শোনো বাংলার জনসমুদ্রে জোয়ারের হুঙ্কার”। দেবব্রত সেগুলো রেকর্ড করালেন হিন্দুস্তান রেকর্ডস থেকে। নিজে এগিয়ে এসে রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে দরকষাকষি পর্যন্ত করেছিলেন, যেন বিক্রি বাড়ে আর জনসাধারণ বাংলাদেশের সংগ্রামের সঙ্গে আবেগে যুক্ত হয়।
তবে জীবনের শুরুতে তাঁর গান সব সময় সম্মান পায়নি। রবীন্দ্রসংগীতে তাঁর অদ্বিতীয় ভঙ্গি সহজে মেনে নিতে পারেনি অনেকে। বিশ্বভারতী আপত্তি জানিয়েছিল, এইচএমভি-ও তাঁকে বাদ দিয়েছিল তাদের তালিকা থেকে। আধুনিক গান গাইতে হবে, এই নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি অস্বীকার করেছিলেন। নিজের জেদে অনড় ছিলেন।
এই জেদের ফলেই অনেকদিন পর্যন্ত তিনি সুযোগই পাননি গান রেকর্ড করার। অথচ জীবনের শেষদিকে, যখন অসুস্থতার জন্য গলা দুর্বল, তখনই তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। স্টেজে ওঠামাত্র শ্রোতাদের উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতেন তিনি। রেকর্ডের বিক্রি হু হু করে বেড়ে যেত।
ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর শিল্পীসুলভ বোঝাপড়ার। “মেঘে ঢাকা তারা” ছবিতে ঋত্বিক বেছে নিয়েছিলেন দেবব্রতকেই, কারণ তাঁর গলায় যে ব্যথা আর কান্নার অনুরণন মিলত, তা আর কারও পক্ষে নির্মাণ করা সম্ভব ছিল না। ছবির দৃশ্যের সঙ্গে গানের আবেগ এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে, মনে হতো জর্জদাই ছবির এক চরিত্র। এক সময় রেকর্ডিংয়ের দিনও তিনি গাইতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি গান ধরলেন, সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছাত্র সুশীল মল্লিক। রবীন্দ্রনাথের “কেন চেয়ে আছো গো মা” গানটি ছবিতে হয়ে উঠল অমর সৃষ্টি।
রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের ১৭৪ নম্বর বাড়িটিই ছিল তাঁর আস্তানা। অগোছালো ঘর, ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা গানের খাতা, হারমোনিয়াম, পুরোনো রেডিও, ইনহেলারের মাঝেই ইজিচেয়ারে বসেই কেটে যেত অসুস্থতার দিনগুলি। শ্বাসকষ্টে ঘুম আসত না, পরম ক্লান্তিতে হাতড়াতেন কিশোরগঞ্জের স্মৃতি।
১৯৮০ সালের ১৮ অগস্ট মারা গেলেন দেবব্রত বিশ্বাস। শহরজুড়ে নেমেছিল শোকের মিছিল। মরদেহ রাখা হয়েছিল রবীন্দ্রসদনে। সেই রবীন্দ্রসদন, যেখানে একদিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গান গেয়েছিলেন তিনিই। আজও দু'পারের বাংলাতেই বহু বাঙালির কানে ভেসে আসে তাঁর জলদগম্ভীর কণ্ঠের দৃপ্ত গায়কী। মানুষটি না থাকলেও, তাঁর সুর ও স্বর চিরঅমর।