মাধুরী মুখোপাধ্যায়ের নাম বদলে মাধবী মুখোপাধ্যায় করে নবাগতা রূপে তাঁকে এই ছবিতে নায়িকা করেন মৃণাল সেন। তাঁর বিপরীতে নায়ক জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়।

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 8 August 2025 15:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মৃণাল সেন (Mrinal Sen) প্রথম যে ছবি দিয়ে সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত হন সেটি হল 'বাইশে শ্রাবণ' (Baishe Srabon)। যদিও তাঁর তৃতীয় ছবি এটি। প্রথম ছবি 'রাতভোর' সুপার ফ্লপ। দ্বিতীয় ছবি 'নীল আকাশের নীচে' সুপারহিট। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এই ছবি দেখেছিলেন। কিন্তু মিউজিক্যাল ছবিটিকে মৃণাল সেন তাঁর ছবির তালিকায় ধরেননি কোনওদিন। 'বাইশে শ্রাবণ' থেকেই নিজের ছবির তালিকা শুরু করেছেন মৃণাল সেন চিরকাল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুদিন, কেন ছবির নাম হবে? তাও প্রেমের ছবির? এই নিয়ে বিতর্কের মুখে বারবার পড়েছিলেন মৃণাল সেন? তাতেও মৃণাল সেনকে থামানো যায়নি।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুদিন মৃণাল সেন নিজের চোখে দেখেছিলেন। ২২ শে শ্রাবণ ইংরেজির ৭ অগস্ট ১৯৪১। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে পড়াশুনা করছিলেন এক তরুণ। হঠাৎই ক্লাসের মাঝে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন প্রিন্সিপাল রেভারেন্ড অ্যালেন ক্যামেরন, জানালেন বিশ্বকবি আর নেই। এই দুঃসংবাদ শোনা মাত্রই সেই তরুণ অধ্যাপকের অনুমতি না নিয়েই খালি পায়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জোড়াসাঁকোর দিকে হাঁটতে শুরু করে দিলেন।

জোড়াসাঁকো গিয়ে দেখলেন লোকে লোকারণ্য, তিলধারণের জায়গা নেই। ঠাকুরবাড়ি পৌঁছেও রবীন্দ্রনাথের ঘরে পৌঁছতে পারলেন না মৃণাল সেন। শেষ অবধি আবার পা মেলালেন শোকমিছিলে। যাতে নিমতলা শশ্মানের দিকে তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছে এক মর্মান্তিক দৃশ্যের সাক্ষী হলেন মৃণাল। তখন সেখানে মৃত শিশুর শবদেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন শোকে বিধ্বস্ত এক পিতা। আচমকাই শ্মশানঘাট ভরে উঠলো মানুষে। পুলিসের সমস্তরকম রক্ষণাবেক্ষন ভেঙে নিমতলা শ্মশানে তখন চরম বিশৃঙ্খলা। এরই মাঝে মানুষের পায়ে পায়ে হারিয়ে যায় সেই মৃত শিশুটি। সেই দৃশ্য ভুলতে পারেননি মৃণাল সেন। সেই দৃশ্যের রেশ মৃণাল সেনের মনে অনেকদিন ছিল। সঙ্গে তো ছিলই কবির শেষকৃত্য দেখার সেই যন্ত্রণা। কিন্তু শেষ থেকেও তো শুরু হয়। যা ঘটাতে পারেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্রষ্টারাই।
তাই এত মৃত্যুর উল্টে দিকে একটি গ্রাম্য দম্পতির বিয়ের পরে গল্প নিয়ে ছবি বানালেন 'বাইশে শ্রাবণ'। মাধুরী মুখোপাধ্যায়ের নাম বদলে মাধবী মুখোপাধ্যায় করে নবাগতা রূপে তাঁকে এই ছবিতে নায়িকা করেন মৃণাল সেন। তাঁর বিপরীতে নায়ক জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়।

ছবির নাম যেহেতু 'বাইশে শ্রাবণ' আর এইদিন রবি ঠাকুরের মৃত্যুদিন, তাই অধ্যাপক অপূর্ব চন্দ ছবিটির নাম নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর মতে মৃণাল সেন বিশ্বকবির প্রতি অশ্রদ্ধা জানিয়ে এই নাম রেখেছেন। বেশিরভাগ সদস্যরা কিছু না বললেও সেই সময় সেন্সর বোর্ডের এক সদস্যা অশোকা গুপ্ত সহ আরো দু-একজনের সঙ্গে তুমুল বাদানুবাদ হয়েছিল পরিচালকের। তিনি সেন্সর বোর্ডের সদস্যদের জানিয়েছিলেন, তাঁর ছবির সঙ্গে কবির মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই কিন্তু তিনি যে দৃশ্য সেদিন নিমতলা শ্মশানে দেখেছিলেন তা তিনি ভুলতে পারেননি। সেই দিন সেই দৃশ্যক মনে রেখে তাঁর অধিকার আছে এই ছবির গল্পের মধ্যে দিয়ে মানুষের চোখের জল ধরে রাখার। এমনকি মৃণাল সেনকে ছবির নাম '২৩ শে শ্রাবণ' দিতে বলেছিলেন মৃণাল সেন। কিন্তু তিনি জানান 'ছবির নাম '২২ শে শ্রাবণ' দিলেই দেবেন, '২৩ শে শ্রাবণ' বা '২৪ শে শ্রাবণ' কোনওভাবেই নয়। শেষ অবধি, নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন পরিচালক।

কিন্তু দিল্লী অবধি পৌঁছে গিয়েছিল এই বিতর্ক। কলকাতায় এই বিতর্কের সমাধান না হওয়ায় ছবিটি পাঠানো হয়েছিল দিল্লিতে। সেখান থেকেই ছাড়পত্র পায় 'বাইশে শ্রাবণ'। তবে ছবিটি যতখানি চর্চায় উঠে আসে, ততখানি সাফল্য পায়নি। রবীন্দ্র বিতর্কই যেন ছবিটিকে সাফল্য পেতে দিল না। কিন্তু সৃজনশীলতায় 'বাইশে শ্রাবণ' আজও মৃণাল সেনের ক্লাসিক ছবি।