বলিউডের ঝলমলে আলোয় যাঁদের প্রতিদিন দেখা যায়, তাঁদের অনেকের শিকড় কিন্তু ভারতের মাটিতে গাঁথা নয়। জন্মভূমি অন্য কোথাও, নাগরিকত্ব অন্য দেশের—তবু তাঁদের পরিচয় গড়ে উঠেছে হিন্দি সিনেমার পর্দায়, গান, নাচ, অভিনয় আর ব্যক্তিগত জীবনের নানা মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে।

ছবি: এআই
শেষ আপডেট: 11 March 2026 13:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বলিউডের ঝলমলে আলোয় যাঁদের প্রতিদিন দেখা যায়, তাঁদের অনেকের শিকড় কিন্তু ভারতের মাটিতে গাঁথা নয়। জন্মভূমি অন্য কোথাও, নাগরিকত্ব অন্য দেশের—তবু তাঁদের পরিচয় গড়ে উঠেছে হিন্দি সিনেমার পর্দায়, গান, নাচ, অভিনয় আর ব্যক্তিগত জীবনের নানা মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে। কখনও বিদেশে জন্ম, কখনও বাবা-মায়ের সূত্রে অন্য দেশের নাগরিকত্ব—এই ভিন্ন ভিন্ন পথ পেরিয়েও ছয়জন অভিনেতা-অভিনেত্রী নিজেদের তৈরি করেছেন বলিউডের আলাদা এক উজ্জ্বল পরিচয়ে। ক্যাটরিনা কাইফ, নোরা ফতেহি, আলিয়া ভাট, ইমরান খান, জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজ এবং সানি লিওনি—তাঁদের নাগরিকত্ব, কাজ আর ব্যক্তিগত জীবনের গল্প যেন এক আন্তর্জাতিক ক্যানভাস, যেখানে ভারতীয় সিনেমা হয়ে উঠেছে মিলনের সেতু।
ক্যাটরিনা কাইফের (Katrina Kaif), নাম বললেই মনে পড়ে বলিউডের এক দীর্ঘ সফল যাত্রা। কিন্তু তাঁর নাগরিকত্ব ব্রিটিশ। হংকংয়ে জন্ম নেওয়া ক্যাটরিনার মা ব্রিটিশ নাগরিক। সেখান থেকেই তাঁর ব্রিটিশ পরিচয়। অথচ সেই বিদেশি পরিচয় কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি তাঁর বলিউড-স্বপ্নে। ‘নমস্তে লন্ডন’, ‘সিং ইজ কিং’, ‘এক থা টাইগার’, ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’, ‘ভারত’, ‘সূর্যবংশী’, ‘টাইগার ৩’ কিংবা ‘মেরি ক্রিসমাস’—একটার পর একটা বড় ছবিতে অভিনয় করে তিনি হয়ে উঠেছেন হিন্দি ছবির অন্যতম সফল অভিনেত্রী। রোম্যান্স থেকে অ্যাকশন, আবার বড় বাজেটের বিনোদন—সব ক্ষেত্রেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি। পর্দার বাইরে তাঁর আরেক পরিচয়ও তৈরি হয়েছে। তিনি সৌন্দর্যপণ্যের জগতে বড় নাম, এবং একটি বিউটি ব্র্যান্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও নিজের উপস্থিতি শক্ত করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে ক্যাটরিনা এখন অভিনেতা ভিকি কৌশলের স্ত্রী—একটি নতুন অধ্যায়ের উজ্জ্বল সঙ্গী।
নোরা ফতেহির গল্পটাও কম চমকপ্রদ নয়। কানাডার টরন্টোতে জন্ম তাঁর, আর তাঁর শিকড় মরক্কোতে। তাই নাগরিকত্ব কানাডার। কিন্তু খ্যাতির পথ তিনি খুঁজে পেয়েছেন ভারতে। নাচ, মিউজিক ভিডিও, বিশেষ গানের উপস্থিতি আর বিভিন্ন ছবিতে অভিনয়—সব মিলিয়ে নোরা তৈরি করেছেন এক অনন্য জনপ্রিয়তা। তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘রোর: টাইগার্স অফ দ্য সুন্দরবনস’। এরপর ‘সত্যমেব জয়তে’ কিংবা ‘বাটলা হাউস’-এর মতো ছবির গান ও উপস্থিতির মাধ্যমে তিনি পৌঁছে যান দর্শকের হৃদয়ে। শুধু হিন্দি নয়, তেলুগু এবং মালয়ালম ছবিতেও কাজ করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিজের পারফরম্যান্সের ছাপ রেখেছেন নোরা। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে পছন্দ করেন না তিনি, তবে পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ আর কঠোর পরিশ্রমের গল্প তিনি বহুবার শোনিয়েছেন। (nora fatehi)
আলিয়া ভাটের গল্প শুনলে অনেকেই অবাক হন। মুম্বইয়ে জন্ম হলেও তাঁর নাগরিকত্ব ব্রিটিশ—মা সোনি রাজদানের সূত্রে। নিজেই বহুবার সে কথা স্বীকার করেছেন আলিয়া। কিন্তু নাগরিকত্বের সেই পরিচয়ের বাইরে গিয়ে তিনি আজ হিন্দি সিনেমার অন্যতম বড় তারকা। ‘হাইওয়ে’, ‘রাজি’, ‘গাল্লি বয়’, ‘গাঙ্গুবাই কথিয়াওয়াড়ি’, ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’, ‘জিগরা’—এমন বহু ছবিতে অভিনয় করে তিনি একইসঙ্গে বাণিজ্যিক সাফল্য আর অভিনয়ের শক্তি দেখিয়েছেন। আজ তিনি ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও ব্যাঙ্কেবল অভিনেত্রী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অভিনেতা রণবীর কাপুরের স্ত্রী, তাঁদের ছোট্ট মেয়ে রাহা তাঁদের জীবনে নতুন আলো। অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যবসার দুনিয়াতেও নিজের ব্র্যান্ড গড়ে তুলছেন আলিয়া। (Alia Bhatt)
ইমরান খানের গল্পে আছে নস্টালজিয়ার ছোঁয়া। তিনি আমেরিকার নাগরিক, কারণ তাঁর জন্ম উইসকনসিনের ম্যাডিসনে। আমির খানের ভাগ্নে হলেও নিজের অভিনয়েই তিনি বলিউডে আলাদা জায়গা করে নেন। কোমল, শহুরে রোম্যান্টিক ইমেজে তিনি হয়ে ওঠেন এক সময়ের জনপ্রিয় মুখ। ‘জানে তু… ইয়া জানে না’, ‘আই হেট লাভ স্টোরিজ’, ‘দিল্লি বেলি’, ‘মেরে ব্রাদার কি দুলহন’, ‘এক ম্যায় অউর এক্ক তু’—এই ছবিগুলো তাঁকে বিশেষভাবে পরিচিত করে তোলে। যদিও দীর্ঘদিন অভিনয় থেকে দূরে রয়েছেন, তবু দর্শকের আগ্রহ তাঁর প্রতি এখনও কমেনি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন বাবা, আর খ্যাতির ঝলকানি থেকে অনেকটাই দূরে থেকে শান্ত জীবনযাপন করার জন্যও পরিচিত। ২০০০-এর দশকের বলিউডপ্রেমীদের কাছে তাঁর নাম এখনও এক মিষ্টি স্মৃতি।
জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজের গল্পও বহুজাতিক। বাহরাইনে জন্ম তাঁর, শিকড় শ্রীলঙ্কায়। নাগরিকত্ব শ্রীলঙ্কার। শোবিজ জগতে তাঁর প্রবেশ ‘মিস ইউনিভার্স শ্রীলঙ্কা ২০০৬’ খেতাব জয়ের মাধ্যমে। এরপর বলিউডে এসে একের পর এক ছবিতে কাজ করে তিনি হয়ে ওঠেন পরিচিত মুখ। ‘মার্ডার ২’, ‘হাউসফুল ২’, ‘রেস ২’, ‘কিক’, ‘জুড়ওয়া ২’, ‘রাম সেতু’—এই ছবিগুলো তাঁকে দিয়েছে জনপ্রিয়তা। গ্ল্যামার, কমেডি আর বাণিজ্যিক আবেদন—সব মিলিয়ে তাঁর পর্দার ব্যক্তিত্ব আলাদা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও তিনি চলচ্চিত্র, পারফরম্যান্স এবং ডিজিটাল প্রকল্পে সক্রিয়। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব বেশি প্রকাশ্যে কথা বলেন না জ্যাকলিন, ফলে আলোচনার কেন্দ্রেই থাকে তাঁর কাজ, স্টাইল আর উপস্থিতি। ()
আর সানি লিওনের পথটা যেন একেবারেই আলাদা গল্প। তিনি কানাডায় অন্টারিওর সারনিয়ায় জন্মেছিলেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, যদিও কানাডিয়ান নাগরিকত্বও ধরে রেখেছেন। ফলে তিনি কানাডিয়ান-আমেরিকান অভিনেত্রী। ভারতীয় বিনোদন জগতে তাঁর মূলধারার পরিচয় তৈরি হয়েছে ‘জিসম ২’, ‘রাগিনী এমএমএস ২’, ‘এক পহেলি লীলা’, ‘কেনেডি’—এই ছবিগুলোর মাধ্যমে। শুধু সিনেমা নয়, রিয়্যালিটি শো, বিভিন্ন গানের উপস্থিতি এবং ডিজিটাল কাজের মাধ্যমেও তিনি নিজের জায়গা শক্ত করেছেন। প্রচলিত বলিউডের পথ ধরে তিনি আসেননি, তবু ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেছেন এক স্থায়ী বিনোদন-ব্র্যান্ড হিসেবে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ড্যানিয়েল ওয়েবারের স্ত্রী এবং তিন সন্তানের মা। সিনেমা, অনুষ্ঠান আর ব্যবসার নানা উদ্যোগ—সব ক্ষেত্রেই তিনি সমান ব্যস্ত। (Sunny leone)
এই ছয়জনের গল্প যেন এক অদ্ভুত সত্যি মনে করিয়ে দেয়। জন্মভূমি আলাদা হতে পারে, নাগরিকত্বও ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু স্বপ্নের ঠিকানা কখনও কখনও সেই সীমানা মানে না। বলিউডের রঙিন আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে তারা যেন প্রমাণ করেছে—সিনেমার ভাষা শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক। পর্দায় যখন আলো জ্বলে ওঠে, তখন দর্শক শুধু অভিনেতাকে দেখে, তাঁর পাসপোর্ট নয়। আর সেই কারণেই হয়তো এই তারকারা দূরের দেশ থেকে এসেও ভারতীয় দর্শকের হৃদয়ে চিরচেনা হয়ে উঠেছেন—যেন নিজেদেরই মানুষ।