দিলীপ কুমার তখন মাদ্রাজে শ্যুটিং করছেন। সবে বিয়ে করেছেন সায়রা বানুকে। তপন সিনহাকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন দিলীপ কুমার।

গ্রাফিক্স -দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 23 August 2025 16:33
দিলীপ কুমার বম্বেতে মধ্যগগনে থাকাকালীন বাংলাকে ভালবেসে দুটি বাংলা ছবিও করেছিলেন। 'পাড়ি' এবং 'সাগিনা মাহাতো'। দুটি ছবি অরিজিনালি বাংলা ছবি। পরে হিন্দিতে ডাবড হয়। 'সাগিনা মাহাতো' যদিও হিন্দির জন্য নতুন করে শ্যুট হয়েছিল। দিলীপ কুমার-সায়রা বানু, সেসময়ের সবথেকে চর্চিত জুটি এই বাংলা ছবি করতে এসেছিলেন । কিন্তু সায়রা বরের চরিত্রে দিলীপ কুমার নয়। বাংলার চিন্ময় রায়কে বরের চরিত্রে দেখে ভিরমি খেয়েছিলেন সায়রা বানু। আজ সায়রা বানুর জন্মদিনে সেই মজার গল্প।
গৌরকিশোর ঘোষের 'সাগিনা মাহাতো' গল্পটি নিয়ে ছবি করার কথা অনেকদিনই ভেবেছিলেন তপন সিনহা। কিন্তু শ্রমিক আন্দোলন সহ রাজনৈতিক ছবি সে অর্থে করার সাহস পাচ্ছিলেন না তিনি সেই সময় দাঁড়িয়ে। হেমেন গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি তপন সিনহার 'ক্ষুধিত পাষাণ' ছবির প্রযোজক, তিনি অনেকদিন ধরেই বসেছিলেন। তাঁর ইচ্ছে তপন সিনহা বাদে কারও সঙ্গেই ছবি করবেন না। তপন সিনহা হেমেন বাবুর কাছেই সাগিনা করার কথাটা পাড়লেন। কথা প্রসঙ্গে বোঝা গেল, সাগিনা করার জন্য অবাঙালি নায়ক চাই। হেমেনবাবু দিলীপ কুমারের নাম সাজেস্ট করলেন।

দিলীপ কুমার তখন মাদ্রাজে শ্যুটিং করছেন। সবে বিয়ে করেছেন সায়রা বানুকে। তপন সিনহাকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন দিলীপ কুমার। তপন সিনহা সংক্ষেপে 'সাগিনা মাহাতো'র গল্পটা ইংরাজিতে লিখে দিলেন এবং বললেন "তুমি যত বড় স্টার, তোমায় অত টাকা দিতে পারব না।" দিলীপ কুমার বললেন "আমি কি টাকার জন্য বাংলা ছবি করতে যাচ্ছি?"
শুরু হল, 'সাগিনা মাহাতো'র শ্যুটিং। বাংলা ছবিতে অভিনয় করবেন দিলীপ কুমার ও সায়রা বানু দু'জনেই, এ খবরে সাজো সাজো রব উঠল বাংলায়। বম্বের দুই সুপারস্টার এবার বাংলা ছবিতে। সঙ্গে অনিল চট্টোপাধ্যায়, চিন্ময় রায়, সুমিতা সান্যাল, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। হিন্দিতে সুমিতা সান্যালের রোলটা করেছিলেন অপর্ণা সেন।

তিনধারিয়া রেলওয়ে কারখানা, গয়াবাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হল। শ্রীমতী ইলা রায়চৌধুরীর ছেলেরা তাঁদের বাড়িটা ছেড়ে দিলেন দিলীপ কুমার, সায়রা বানু ও তাঁর মা নাসিম বানু ওখানেই থাকলেন। শ্যুটিং অসম্ভব জমে গেল। তপন সিনহার বাঙালি ইউনিটের সঙ্গে কাজ করেও তৃপ্ত হলেন দিলীপ কুমার। অন্যদিকে সায়রা বানু ভেবেছিলেন, ছবিতে তাঁর বরের চরিত্র করবেন হয়তো উত্তম কুমার বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু সায়রা দেখলেন তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন রোগা পাতলা চিন্ময় রায়। সায়রার তো ভিরমি খাবার যোগাড়। সায়রা কিছুতেই রাজি হলেন না এমন অভিনেতাকে বর রূপে। শেষে তপন সিনহা বোঝালেন বরের চরিত্রটি এরকমই। শেষে ছবির স্বার্থে রাজি হন সায়রা। যদিও পরে সায়রা আর চিন্ময়ের বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। একসঙ্গে রীতিমতো নাচ করেছিলেন সায়রা ও চিন্ময়।
দিলীপ কুমার একদিন শ্যুটিং শেষে তপন সিনহাকে বললেন "আরও ঘন্টা চারেক কাজ করলে অসুবিধে হবে? সকালের সিনটায় আমি ভাল অভিনয় করিনি, যদি রিটেক করেন।" অনিল চ্যাটার্জী-সহ সকলকে নিজে অনুরোধ করে রাত দশটা অবধি সেই দৃশ্যে অভিনয় করেন দিলীপ কুমার। সবটাই বিনা পারিশ্রমিকে।

কিন্তু ছবির শ্যুটিং শেষ হলেও রাজনৈতিক বাধা আসতে শুরু করল। রীতিমতো হুমকি। ছবির সেন্সর করার পর শোনা গেল, 'সাগিনা মাহাতো' রিলিজ করতে দেওয়া হবে না। সিনেমাহলের সামনে পিকেটিং করা হবে। প্রযোজক হেমেন গাঙ্গুলির মুখ চেয়ে স্পেশাল শোয়ের ব্যবস্থা করলেন তপন সিনহা। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন সেসব রাজনৈতিক দলের লোকরাও। অদ্ভুত ভাবে ছবি দেখে তাঁরাই বললেন "চমৎকার ছবি! আপনি ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্টের ভন্ডামির মুখোশ খুলে দিয়েছেন। ছবি রিলিজ করুন। তারপর যা হয় দেখা যাবে। আমরা আপনার সঙ্গে আছি।"
১৯৭০ সালে ছবি রিলিজ হতেই সুপার ডুপার হিট। একে দিলীপ কুমার-সায়রা বানু বাংলা ছবিতে, তার ওপর তপন সিনহার ছবি। ছবির গানও অসম্ভব হিট। আরতি মুখোপাধ্যায় আর অনুপ ঘোষালের 'ছোটি সি পঞ্ছি' ডুয়েট মন মাতাল সবার। দর্শকের ভালবাসায় মুছে গেল সব বিতর্ক।

'সাগিনা মাহাতো' মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অ্যাফ্রো-এশিয়ান অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল। 'সাগিনা মাহাতো' কলকাতায় সুবর্ণ জয়ন্তী সপ্তাহও হিট করে। দিলীপ কুমার সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান বিএফজেএ-তে। অনিল চট্টোপাধ্যায় সেরা সহ-অভিনেতার বিএফজেএ পুরস্কার পান।
আজও এই বাংলা ছবি দিয়ে বাঙালির মনে সায়রা-দিলীপ জুটি অমর হয়ে আছে।