শহরের ব্যস্ত জীবনে কমবেশি অভ্যস্ত একঘেয়ে রুটিন। অফিস, বাড়ি, সম্পর্ক—সব যেন বাঁধা ছকে চলতে থাকে।
_2.jpg.webp)
শেষ আপডেট: 15 January 2026 15:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শহরের ব্যস্ত জীবনে কমবেশি অভ্যস্ত একঘেয়ে রুটিন। অফিস, বাড়ি, সম্পর্ক—সব যেন বাঁধা ছকে চলতে থাকে। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার আড়ালেই যদি লুকিয়ে থাকে ভয়ংকর এক অস্বাভাবিক সত্য? এমনই প্রশ্ন ছুড়ে দেয় নতুন মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ছবি ‘আদর— এ হাউজ অফ লাভ’।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন বছর তিরিশের আইটি পেশাজীবী অনির্বাণ রায়। বাইরে থেকে দেখলে তাঁর জীবন একেবারেই সাজানোগোছানো—‘আদর’ নামের বাড়িটি, স্ত্রী মেঘলা, আর ছোট্ট ছেলে মেহুল। সন্ধ্যেবেলায় থ্রিলার ওয়েব সিরিজ দেখতে দেখতে দিন কেটে যায়, পাশে বসে মেঘলা রাতের খাবারের আয়োজন করেন, আর ভিডিও গেমে ডুবে থাকে মেহুল। সবকিছু যেন নিখুঁত পারিবারিক ছবির মতো।
কিন্তু এক রাতেই সেই নিখুঁত ছবিটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। টেলিভিশনের সামনে বসে অনির্বাণ যখন মেঘলাকে একটা দৃশ্য দেখতে ডাকেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই আচমকা উধাও হয়ে যান তিনি। কিছুক্ষণ পর হারিয়ে যায় মেহুলও। নিখোঁজের এই রহস্য ঘিরে শুরু হয় তীব্র উত্তেজনা। দায়িত্ব নেন স্পেশাল ব্রাঞ্চের অফিসার সহায় ও পাকড়াশি। ধীরে ধীরে তদন্ত যত এগোয়, ততই খুলে যেতে থাকে অনির্বাণের জীবনের গোপন স্তরগুলো।
শেষ পর্যন্ত সামনে আসে এক শিউরে ওঠার মতো সত্য—মেঘলা আর মেহুলকে হত্যা করেছে স্বয়ং অনির্বাণই। কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর বাস্তব, মেঘলা ও মেহুল আসলে কোনওদিনই ছিল না। তারা ছিল অনির্বাণের অসুস্থ মনের সৃষ্টি। পাকড়াশি আবিষ্কার করেন, অনির্বাণ ভুগছে Dissociative Identity Disorder-এ। নিজের নিঃসঙ্গতা আর অবদমিত যন্ত্রণার ভেতর থেকে সে তৈরি করেছে কাল্পনিক স্ত্রী ও সন্তানকে, এমনকি কখনও কখনও নিজেই হয়ে উঠেছে তাদের চরিত্র। বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা মুছে গিয়ে তৈরি হয়েছে এক অন্ধকার মনস্তাত্ত্বিক গোলকধাঁধা।

পরিচালক অংশুমান চক্রবর্তী ছবিটিকে দেখেছেন আধুনিক নাগরিক জীবনের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক অধ্যয়ন হিসেবে। তাঁর কথায়, ‘এই ছবি চমকনির্ভর ভয়ের গল্প নয়। বরং নিঃসঙ্গতা, অবদমিত স্মৃতি আর মানসিক চাপ কীভাবে মানুষের বাস্তববোধকে ধ্বংস করে দিতে পারে—সেই ভয়টাই এখানে আসল।’
প্রযোজক অংশুমান চট্টোপাধ্যায়ও মনে করেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে যে ভুল ধারণা রয়েছে, এই ছবি সেই অন্ধকার দিকটাকেই মানবিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা। তাঁর মতে, “ADOR কেবল অপরাধের কাহিনি নয়—এ এক ভেঙে পড়া মানুষের ট্র্যাজিক দলিল।”
ছবির মূল ভাবনা জুড়ে রয়েছে পরিচয়ের সংকট, বাস্তব ও কল্পনার দ্বন্দ্ব, অপরাধবোধ, অস্বীকার আর মানসিক আঘাতের গভীর ছাপ। পারিবারিক সম্পর্ক যে কত ভঙ্গুর হতে পারে, তারই এক অস্থির চিত্র এঁকে দেয় এই থ্রিলার। অভিনয়ে রয়েছেন অমিতাভ ভট্টাচার্য, মনীশ চক্রবর্তী, বিক্রমজিৎ চক্রবর্তী, অনিন্দিতা কিয়ানা দাস, এবং নিশান ভট্টাচার্য। গল্প লিখেছেন অংশুমান চট্টোপাধ্যায়, আর চিত্রনাট্য ও পরিচালনার দায়িত্বে অংশুমান চক্রবর্তী।
একদিকে যখন এমন গাঢ় মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের আয়োজন, ঠিক অন্যদিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের আবেগঘন কাহিনি নিয়ে আসছে স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি ‘অন্য রূপকথা।’ এখানে গল্পের নায়ক আটাশ বছরের প্রান্তিক—বিশ্বভারতীর ছাত্র, শখের চিত্রগ্রাহক। ছবি তোলার সূত্রেই তার আলাপ হয় চল্লিশোর্ধ্ব অ্যাঞ্জেলিনার সঙ্গে—যার বাবা বাঙালি, মা ফরাসি। রবীন্দ্রসাহিত্য আর আদিবাসী সংস্কৃতির প্রতি ভালবাসাই তাকে শান্তিনিকেতনের মাটিতে বেঁধে রেখেছে।

ধীরে ধীরে প্রান্তিক ও অ্যাঞ্জেলিনার মধ্যে গড়ে ওঠে এক গভীর সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন। কিন্তু সেই সম্পর্ককে অন্য চোখে দেখতে শুরু করে প্রান্তিকের প্রেমিকা রশ্মি। সন্দেহ, টানাপড়েন আর মানসিক দ্বন্দ্বের মাঝেই হঠাৎ একদিন হারিয়ে যায় অ্যাঞ্জেলিনা। তারপর সে ফিরে আসে সম্পূর্ণ অন্য এক পরিচয়ে—এমন এক রূপে, যার জন্য প্রস্তুত ছিল না প্রান্তিক বা রশ্মি কেউই। ঘটনার ঘূর্ণাবর্ত গিয়ে পৌঁছায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মনোরথ সেনগুপ্তর কাছে, আর সেখান থেকেই নতুন গল্পের রসদ খুঁজে পান সাহিত্যিক সাত্যকি সোম।
এই ছবির মূল কাহিনি বৈশাখী চক্রবর্তীর, চিত্রগ্রহণে জয়দীপ ভৌমিক, আর চিত্রনাট্য-সংলাপ-পরিচালনার দায়িত্বে আবারও অংশুমান চক্রবর্তী। ঝুমা চক্রবর্তীর পোশাক পরিকল্পনা ও প্রযোজনায় ঝুমরি প্রোডাকশন্সের এটি প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্যের উদ্যোগ।
দুটি ছবিই আলাদা স্বাদের, আলাদা ভাষার—তবু কোথাও গিয়ে তারা একসূত্রে বাঁধা। সম্পর্ক, পরিচয় আর মানুষের মনের অদেখা অন্ধকারই দুই গল্পের মূল চালিকাশক্তি। একটিতে মনস্তত্ত্বের ভয়ংকর দিক, অন্যটিতে প্রেমের জটিল রূপান্তর—দু’ক্ষেত্রেই প্রশ্ন একটাই: আমরা যাকে সত্য বলে জানি, সেটা কি সত্যিই বাস্তব? নাকি সবই আমাদের মনের তৈরি আরেক রূপকথা?