দেশজুড়ে অনলাইন বেটিং অ্যাপে—চকচকে অফার, সেলিব্রিটির হাসি, স্পোর্টস ব্রেকের ঝলমলে জিঙ্গল—সব মিলিয়ে বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় ছিল জোয়ার।

অনলাইন বেটিং অ্যাপ নিষিদ্ধ
শেষ আপডেট: 29 August 2025 17:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশজুড়ে অনলাইন বেটিং অ্যাপে—চকচকে অফার, সেলিব্রিটির হাসি, স্পোর্টস ব্রেকের ঝলমলে জিঙ্গল—সব মিলিয়ে বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় ছিল জোয়ার। কিন্তু সেই ঢেউ একদিনে থেমে গেল। ভারত সরকার টাকা লাগানো অনলাইন গেম/বেটিং নিষিদ্ধ করায়—‘অনলাইন বেটিং অ্যাপ ভারতে ব্যান’, তার খুঁটিনাটি, কেন ব্যান হলো, আর এর ধাক্কা স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে—সবকিছুর উত্তর এক ছবিতে মিলল। সংসদ ২১ আগস্ট ২০২৫-এ যে আইন পাশ করে, তাতে টাকায় খেলা অনলাইন গেম নিষিদ্ধ; মূল যুক্তি—আসক্তি, প্রতারণা, মানি লন্ডারিং ও সামাজিক ক্ষতি রোধ। এই পথেই বহুদিন ধরে চলা মন্ত্রণালয়ের নানা ‘অ্যাডভাইজরি’ আর ব্লকিং অর্ডার আইনে পরিণত হল।
কেন ব্যান? কারণ সংখ্যার অঙ্কের ভেতর লুকিয়ে আছে বহু গল্প। নেশায় ডুবে যাওয়া তরুণ, ঋণে জর্জরিত পরিবার, প্রলোভনের টানে ভাঙা সম্পর্ক। সরকার বলছে, এই আগুন আর ছড়াতে দেওয়া যাবে না। তাই ‘অনলাইন বেটিং অ্যাপ ব্যান ইন ইন্ডিয়া’—এটাই এখন নীতি, যাতে টাকায় খেলা, ফ্যান্টাসি লিগ, পোকার-রমির মতো প্ল্যাটফর্মও ধরা পড়ে। কিন্তু নিষেধের ফাঁক গলে অফশোর সাইটগুলোও যে বসে নেই—তারা আবার নতুন লোভের টোপ ছুড়ছে, এ কথাও শিল্পমহল জানাচ্ছে।

এবার আঘাতটা কোথায় লাগল সবচেয়ে বেশি? স্যাটেলাইট চ্যানেল আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। স্পোর্টস সম্প্রচারের মাঝের বিজ্ঞাপন-বিরতিতে যে রঙিন ঝড় বইত, সেখানে এখন হাওয়া থমথমে। সূত্র বলছে, দুই হাজার থেকে দু’হাজার দুইশো কোটি টাকার বিজ্ঞাপন এক ধাক্কায় থেমে গেছে—শিল্পের হিসাবও মিলছে কাছাকাছি, কেবল ব্রডকাস্টার, স্ট্রিমিং, আউটডোর, প্রিন্ট এবং সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে বছরে প্রায় ₹২,০০০ কোটি টাকার আয় উধাও হতে পারে, আইপিএল-সহ বড় ক্রীড়াসূচিতে ২৫% পর্যন্ত রাজশ্ব ঝরে পড়ার আশঙ্কা। কারও কারও মতে, এই শূন্যতা মিলিয়ে গিয়ে মোট বিজ্ঞাপন বাজারে এক বিলিয়ন ডলারের গর্তও তৈরি করতে পারে।
বিজ্ঞাপন তো শুধু টাকা নয়—হাজার স্বপ্নের রং। যে প্রোডাকশন হাউস কথায়-ছবিতে আলো জ্বালাত, যে ডিজিটাল টিম রাত জেগে ক্যাম্পেইন চালাত, যে স্পোর্টস সম্প্রচার হাত ধরে চলত—তাদের কাছে এই ব্যান আকস্মিক ধাক্কা। চ্যানেলের মিড-রোল শিডিউল ফাঁকা, ওটিটি-র ব্যানার স্পট নিস্তব্ধ, ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্র্যান্ড ডিল ঝুলে আছে। তবু এ-ও সত্যি—এটা যে শুধু ক্ষতির কিতাব নয়, সুরক্ষার গল্পও। আগের অ্যাডভাইজরিগুলো বলেই দিয়েছিল, জনস্বার্থে এই প্রচার ‘অনুচিত’; আজ আইন সেই অনুচিতকে নিষিদ্ধ করেছে।
তাই ছবিটা একরঙা নয়। একদিকে হঠাৎ নিভে যাওয়া আয়ের আলো—দুই হাজার থেকে দু’হাজার দুইশো কোটির বিজ্ঞাপন থেমে গিয়ে টেলিভিশন-ডিজিটাল—সবখানেই খরা; অন্যদিকে, যে আগুনে পুড়ছিল ঘরবাড়ি, সেই আগুনে জল পড়েছে। বাজার সামলে নেবে—নতুন ক্যাটাগরি, নতুন ব্র্যান্ড, ধীরে ধীরে ফাঁকা জায়গা ভরবে। কিন্তু যে পরিবারগুলো হারিয়েছে ঘুম, যে বাবা হাতে হাত রেখে ছেলেকে ফেরাতে চেয়েছিলেন, যে সম্পর্ক একঘেয়েমির রাতে ভাঙার মুখে দাঁড়িয়েছিল—তাদের কাছে এই নীরবতা বরং প্রশান্তি।
আজ পর্দার ঝলমলে আলো একটু ম্লান বটে, কিন্তু তার আড়ালে যে নরম, স্থির আলো জ্বলে উঠেছে—সেই আলোয় হয়তো আবার গল্প লেখা হবে; রেটিং-শিটের নয়, ঘরবাঁচানোর। যে আলো শেখায়—কিছু আলো নিভলেও, মানুষের ভেতরের আলোগুলো বাঁচিয়ে রাখাই শেষ কথা।