শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
'রুই কাতলা ইলিশ তো নয়
হায় রে কী যে করি,
জাল টাইনলাম জলের থেকে,
উঠল যে জলপরী।'
শক্তি সামন্তর জুবিলি হিট ছায়াছবি 'অন্যায় অবিচার'-এর এই গান দুই বাংলার বাঙালিদের আজও প্রিয়। আশি-নব্বইয়ের দশকে ভিসিআর-এ বাংলা ছবি দেখা মানেই ছিল এই ছবি সবাই মিলে দেখার উন্মাদনা। চেক জামা পরে মাছের জাল হাতে নৌকা থেকে গাইছেন মিঠুন চক্রবর্তী। অবশ্য বলাই বাহুল্য, কিশোর কুমারের অবিস্মরণীয় কণ্ঠ। মিঠুনের বিপরীতে জলপরী রোজিনাকে আজও মনে রেখেছে মানুষ, তিনি বাংলাদেশের নায়িকা।
বহু দিন আগেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে বিদায় জানিয়েছিলেন নায়িকা। কলকাতার দর্শক নয়ের দশকের পর আর দেখা পায়নি তাঁর। কোথায়, কেমন আছেন নায়িকা, কেউ জানতেন না।

কিন্তু এবার আবার খবরে রোজিনা। বড়পর্দায় পরিচালিকা রূপে ছবি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রোজিনা আবার নিজের দেশ বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন ডিসেম্বরে। ছবিতে শুধু পরিচালিকাই নন তিনি, রোজিনা অভিনয়ও করবেন। তাঁর বিপরীতে থাকবেন ইলিয়াস কাঞ্চন। নায়ক হিসেবে নিরবকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধর প্রেক্ষাপটে সাজানো হয়েছে ছবির প্লট।
আসলে এতদিন ধরে রোজিনা নিজের সংসারে ব্যস্ত ছিলেন সুদূর ইংল্যান্ডে। লন্ডন শহরের একান্তে নিজের মতো ছিলেন নায়িকা। বহুদিন ধরেই খবরের বাইরে ছিলেন। অথচ একসময়ে এই রোজিনা নায়িকার ভূমিকায় প্রায় তিনশো ছবি করেছেন কলকাতা-বাংলাদেশ মিলিয়ে। কিন্তু কেন তিনি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন?
রোজিনা জানাচ্ছেন 'আশির দশক আর নব্বই দশকের শুরুর দিকে আমায় এত ছবির শ্যুট করতে হত যে দিনে একসঙ্গে চারটি করে ছবির কাজও করেছি। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গেছি একদিনে বারবার। ক্লান্ত হলেও প্রযোজক, পরিচালকদের কথা ভেবে কখনও চুক্তিভঙ্গ করিনি। কিন্তু নব্বই দশকের মাঝামাঝি অবসর ঘোষণা করে ফিল্ম লাইনকে বিদায় জানাই। হাতে থাকা ছবির কাজ শেষ করতে আরও দু বছর লেগে যায়। অনেক ছবি করে বিশ্রামের প্রয়োজন মনে করেছি আর সংসার করাটাও বড় কাজ।"

তবে বিদেশে গোপণচারিণী হয়ে গেলেও, রোজিনা মাঝেমধ্যে বাংলাদেশে এসে কিছু টিভি নাটক পরিচালনা করেছেন। তবে মূলধারার ছবির নায়িকার জায়গা থেকে সরে গেছিলেন রোজিনা। ‘রাক্ষুসী’ নামে তাঁর অভিনীত সর্বশেষ ছবিটি ২০০৬ সালে মুক্তি পায়।
সে যাই হোক। একটা নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ের রুপোলি পর্দার সুপারস্টার নায়িকা হয়ে ওঠার কাহিনি খুব সহজ হয় না। রোজিনারও তা ছিল না। হাজারও বাধা পার করে তিনি সফল নায়িকা হয়ে ওঠেন, তার পরে সংসারে পর্যাপ্ত সময় ও যত্ন দিয়ে এখন আবারও ফিরছেন পরিচালনায়। সফল পরিচালক হিসেবেই ফের স্বীকৃতি পাবেন তিনি, এমনটাই আশা অনুরাগীদের।
রোজিনার আসল নাম রওশন আরা রেণু। কাছের মানুষদের কাছে আজও রোজিনা রেণু নামেই আদৃতা তিনি। ফিল্মে এসে রেণু নাম পাল্টে হয়ে গেলেন রোজিনা। ছোটবেলায় যখন আর পাঁচজন ছেলেমেয়ে খেলাধুলো করে গল্পগুজব করে সময় কাটাত, সেখানে রেণু ছিল অন্যরকম। তাঁকে শুধু সিনেমা টানত। রেণুদের বাড়িটা ছিল বাংলাদেশের রাজবাড়ি রেলস্টেশনের পাশে। রিকশার পেছনে শাবানা-কবরী-ববিতা নায়িকাদের পোস্টার দেখত রেণু। মাইকে শুনত, “আসিতেছে আসিতেছে নতুন ছবি”, আর তার পেছন পেছন দৌড়ত খুদে মেয়ে। আবার মাইকে কোনেও গান বাজতে শুনলে, স্কুলব্যাগ রেখেই দৌড় দিত সে পিছু পিছু। এসবের জন্য মায়ের কাছে, পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে কত যে মার খেয়েছে সে! কিন্তু তাঁর মাথায় শুধু এটাই ছিল, শাবানা-কবরীর মতো হতেই হবে তাকে।

বাড়ির পাশেই 'চিত্রা' সিনেমা হলে স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখতে চলে যেত সে। এরকমই একদিন খবর পেল বাড়ির কাছে সিনেমার শ্যুটিং হচ্ছে। ব্যস বন্ধুদের নিয়ে শ্যুটিং স্পটে দে ছুট! ভিড়ে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে রেণু দেখছিল নায়ক-নায়িকাকে। সেখানেই সেই ছবির সহকারী পরিচালকের রেণুকে দেখে পছন্দ হয়। ডেকে বললেন 'একটা সিন আছে মদের গ্লাস নিয়ে গিয়ে সার্ভ করার, করে দিতে পারবে?' রেণু তো এক কথায় রাজি। তাঁকে ছবির পোশাকে সাজিয়ে শ্যুটিং শুরু হল। ওয়ান টেক ওকে। ছবিটা ছিল 'জানোয়ার'। এক্সট্রা হিসেবেই চলচ্চিত্রে হাতখড়ি। তখন এক ফোটোগ্রাফার রেণুর অনেক ছবিও তুলেছিলেন।
বাড়ি ফিরতেই মায়ের বকাবকি। মা চাননি মেয়ে সিনেমায় নামুক।
বেশ কয়েক বছর পরে ঢাকার অফিসক্লাবে এক ভদ্রলোক রেণুর চেনা ছিলেন, যিনি বর্তমানে রোজিনার ছোট বোনের স্বামী। তাঁদের দলেই রেণু অভিনয় করত। গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় তাঁদের সঙ্গে পালিয়ে এল রেণু। বাড়ি থেকে পালিয়েই ছবি করতে আসা। নাটক করতে করতে এল আবার চলচ্চিত্রে সুযোগ। ‘মিন্টু আমার নাম’ ছবিতে নায়িকা হচ্ছেন রেণু। পরিচালক মহিউদ্দিন রেণুর নতুন নামকরণ করলেন রোজিনা। কিন্তু কদিন মহড়া করার পর রোজিনা জানতে পারলেন, তিনি বাদ পড়েছেন। দুঃখে ভেঙে পড়লেন। এত চেষ্টা কি বৃথা গেল। দুলাভাই বললেন, "ফিরে যাও গ্রামে।" রোজিনা বললেন, "কিছু না হয়ে তো আমি আর গ্রামে ফিরব না।"

রোজিনা তাঁর নামকরণ নিয়ে পরে বলেছিলেন, "ছবির গল্পে নায়িকার নাম ছিল রোজিনা। পাকিস্তানের একজন সুপারস্টারের নামও ছিল রোজিনা। তাঁর নামেই আমার নাম হয়। কিন্তু ছবিটায় আমার আর অভিনয় করা হয়নি। অথচ ততদিনে রোজিনা নামটি চলচ্চিত্রের সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।"
একক নায়িকা হিসেবে রোজিনার সুযোগ আসে এফ কবীর পরিচালিত ‘রাজমহল’ সিনেমায়। প্রথম নায়িকা রূপে ছবি সুপারহিট। তার পর একের পর এক সফল ছবি। যে শাবানা ও কবরীকে দেখে নায়িকা হতে চেয়েছিলেন তিনি, তাঁদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করতে শুরু করেন রোজিনা। তিনিও হয়ে ওঠেন ঢালিউডের একজন বড় তারকা।
https://youtu.be/wbQUlFZpRoI
রোজিনা অভিনীত কিছু উল্লেখযোগ্য সিনেমা হল ‘চোখের মণি’, ‘সুখের সংসার’, ‘সাহেব’, ‘তাসের ঘর’, ‘হিসাব চাই’, ‘বন্ধু আমার’, ‘কসাই’, ‘জীবনধারা’, ‘মানসী’, ‘দোলনা’, ‘দিনকাল’, ‘রসের বাইদানী’, ‘জীবনধারা’, ‘রূপবান’, ‘হামসে হ্যায় জামানা’। আমজাদ হোসেনের ‘কসাই’ আর মতিন রহমানের ‘জীবন ধারা’। এইসব ছবিতে অভিনয় করে দু'বার বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন রোজিনা।
আলমগীর, ওয়াসিম, ফিরদৌস-- সব হিরোর সঙ্গে কাজ করেছেন রোজিনা। আলমগীরের পরিচালনাতেও রোজিনা কাজ করেন। ১৯৮৬ সালে পাকিস্তানে ‘হাম তো হায় জামানা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পাকিস্তানের ‘নিগার অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। পাকিস্তানে গিয়ে ছবি করে পুরস্কার পেয়েছেন রোজিনাই প্রথম।

তবে কলকাতার দর্শক তখনও চিনত না রোজিনাকে। এর পরে 'আরাধনা', 'অমর প্রেম', 'অমানুষ' ছবিখ্যাত শক্তি সামন্তর হাত ধরেই রোজিনার কলকাতা ও বম্বেতে প্রচার পাওয়া। লেজেন্ডারি বলিউড পরিচালক শক্তি সামন্ত ডবল ভার্সন ছবির জন্য বিখ্যাত। বাংলা ও হিন্দি দু'ভাষাতেই কাজ করতেন তিনি।
কিন্তু 'অন্যায় অবিচার' ছবি করার সময়ে বাংলাদেশের অভিনেত্রীকে ভাবলেন। ভারত-বাংলাদেশ-বম্বে উদ্যোগে হয় ছবিটি। নায়ক মিঠুন চক্রবর্তী এবং বিশেষ ভূমিকায় উৎপল দত্ত। 'অন্যায় অবিচার' হিন্দি ভার্সনে 'আর পার' নামে রিলিজ করে। রোজিনাই ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম অভিনেত্রী, যিনি হিন্দি বলিউড ছবিতে প্রথম কাজ করলেন।

মিঠুনের সঙ্গে রোজিনার প্রথম সাক্ষাৎ নিয়ে রোজিনা বলেছিলেন, "মিঠুন চক্রবর্তী ডিস্কো কিং। আমি ভাবছিলাম উনি তো হিন্দি বলেন বেশি, আমি তো হিন্দিতে অত দড় নই। পারব তো একসঙ্গে কাজ করতে। আর অত বিশাল বড় একজন স্টার। কিন্তু মিঠুন আমায় দেখে বললেন 'ও তুমি রোজিনা। আমি তো তোমার কাজ দেখেছি। খুব ভাল।' পরে বুঝেছি যাতে আমি সহজে কাজটা করতে পারি, তাই উনি আমায় সহজ করতে এভাবে মিশেছিলেন বাংলা থেকে বাঙাল কথাতেও মিঠুন জমিয়ে দিতেন।"
কলকাতায় নব্বই দশকে একটা সময় এল, যখন সব স্টুডিও পাড়া খাঁ খাঁ করছে। সেই সময়ে স্বপন সাহা বাংলাদেশের অনেক হিরো-হিরোইনকে কলকাতায় আনলেন। তেমনি রোজিনার নতুন কলকাতা অধ্যায়ও শুরু হল স্বপন সাহার হাত ধরে। বাংলাদেশ ছেড়ে রোজিনা পাকাপাকি কলকাতা নিবাসী হলেন। সবথেকে আইকনিক হিট স্বপন সাহার রোজিনা-চিরঞ্জিত জুটির 'পিতা মাতা সন্তান'। তাপস পাল, রঞ্জিত মল্লিক, প্রসেনজিৎ-- সবার সঙ্গে কাজ করেছেন রোজিনা। তাঁর শেষ কলকাতার ছবি ছিল 'বাংলার বধূ'।

চিরঞ্জিৎ-প্রসেনজিতের সঙ্গে রোজিনার 'ভাই আমার ভাই' ছবি সুপারহিট করে। এই ছবিটি ছিল ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের প্রথম বিপুল বক্সঅফিস হিট ছবি।
তবে সময়ের নিয়ম যা হয়। নব্বইয়ের শেষ ভাগে তাঁকে চরিত্রাভিনেত্রীর রোলে ভাবা হচ্ছিল। যিনি তিন দশক দাপিয়ে বাণিজ্যিক ছবিতে নায়িকার রোল করেছেন তিনি হয়তো তা মেনে নেননি, তাই পত্রপাঠ বিদায় জানান চলচ্চিত্রকে। সংসার জীবন বেছে নেন।
প্রথমে বাংলাদেশের এক প্রযোজককে বিয়ে করেন। তাঁর মৃত্যুর পর আর এক বাংলাদেশি শিল্পপতিকে বিয়ে করে লন্ডনে পাকাপাকি সংসার করতে শুরু করেন রোজিনা। বহুদিন ছবির জগতে তিনি ফেরেননি। সংসারটাই মন দিয়ে করতে চেয়েছেন। রোজিনা নিঃসন্তান। যদিও তা কোনও ব্যর্থতা বলে মনে করেন না রোজিনা। অনেক সময় তাঁর ভাই-বোনদের তাঁর সন্তান বলে ভুল খবরও পেশ করেছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম, যার প্রতিবাদ করেছেন রোজিনা নিজেই।
[caption id="attachment_295373" align="aligncenter" width="711"]

গায়িকা রুনা লায়লার সঙ্গে নায়িকা।[/caption]
লন্ডনে পাকাপাকি ভাবে থাকলেও বাংলাদেশে নিজের সুদৃশ্য বাংলো বাড়ি 'মায়ের ছায়া'তে সম্প্রতি আছেন রোজিনা। শুরু করতে চলেছেন তাঁর পরিচালনায় নতুন ছবির কাজ। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সরকার থেকে অনুদান পাওয়া ছবিটির নাম ‘ফিরে দেখা’। ১ মার্চ থেকে শ্যুটিং শুরু। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ‘ফিরে দেখা’ ছবির কাহিনি। গোয়ালন্দ উপজেলার কুমড়াকাধি গ্রামের একটি পরিবার ও রোজিনার স্মৃতি থেকে কিছু ঘটনা নিয়ে ছবির গল্প। কারণ গোয়ালন্দ ছিল রোজিনার মামারবাড়ি। সেখানেই তাঁর জন্ম। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সেখানেই ছিলেন তখন। ছবিতে রোজিনা নিজেও একটি চরিত্রে অভিনয় করবেন। প্রায় ১৫ বছর পর সিনেমায় অভিনয় করবেন তিনি।