শেষ কবে কোনও বাংলা ছবিতে মনে রাখার মতো কোনও গজল ছিল, অনেকেই মনে করে বলতে পারবেন না। বরং এখনও বাংলা গজল বললেই প্রথম যে নামটা ভেসে ওঠে তিনি পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ।

পন্ডিত অজয় চক্রবর্তী সঙ্গে স্ত্রী চন্দনা চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: 22 November 2025 18:48
শেষ কবে কোনও বাংলা ছবিতে মনে রাখার মতো কোনও গজল ছিল, অনেকেই মনে করে বলতে পারবেন না। বরং এখনও বাংলা গজল বললেই প্রথম যে নামটা ভেসে ওঠে তিনি পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। তাঁর দেওয়া সুরে সেই অর্ধ শতাব্দীরও আগে গাওয়া কিছু গান এখনও টান টান জনপ্রিয়। যেমন— ‘পিয়া ভোলো অভিমান/মধুরাতি বয়ে যায়’। এ গানটি অবশ্য কোনও ছায়াছবির গান ছিল না।
বহু বছর পর বাংলায় ছবিতে শেষমেশ সেই খরা কাটল। আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রে ফিরল গজল। সে গান এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে মুক্তি পায়নি ঠিকই, কিন্তু তার রেকর্ডিং শুনে বলে দেওয়া যায়—মনে রাখার মতোই একটা গজল গেয়েছেন শিল্পী চন্দনা চক্রবর্তী। এই প্রথম বাংলা ছবির প্লে ব্যাকে কন্ঠ দিলেন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর (Ajoy Chakrabarty) স্ত্রী চন্দনা (Chandana Chakrabarty)।
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত চন্দনা চক্রবর্তী—শুধু পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর জীবনসঙ্গী নন, কৌশিকী চক্রবর্তীর প্রথম গুরু, আবার তাঁদের পরিবারের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অন্যতম রক্ষকও বটে। গানের কথাগুলো এমন—
দিনে দিনে শুধু বাড়ছে দেনা মকুব হবে কীসে
ঝরে যাওয়া পাতা উড়ছে গো হায় হিসেব রাখে কি সে!
জিৎ গাঙ্গুলির সুর, সুতপা বসুর লেখা, আর চন্দনা চক্রবর্তীর কণ্ঠে খুব শিগগির মুক্তি পাবে এই গান। প্রত্যুষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাজানো সুরের পরতে পরতে টান— তবলা, বাঁশি, সরোদ গিটারর মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক নিশ্ছিদ্র, নিঃশব্দ মুর্ছনা। পরিচালক অরিন্দম শীলের আসন্ন ছবি ছবি—‘মিতিন একটি খুনির সন্ধানে’ (MITIN-Ekti Khunir Sandhaney )-তে অনুসূয়া মজুমদারের লিপে থাকবে গানটি।
এমন একটি অনবদ্য রচনার বিহাইন্ড দ্য সিনের গল্পটাও কিন্তু চমৎকার। যে চন্দনা চক্রবর্তী কখনও প্লেব্যাকের আগ্রহই প্রকাশ করেননি, তাঁকে রাজি করানো সহজ ছিল না। অরিন্দম জানান, জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রায় ২২ বছর পর একসঙ্গে কাজ করছেন তিনি। কথা হচ্ছিল— যদি চন্দনা বৌদিকে ছবিতে গাওয়ানো যায়!
প্রশ্ন উঠতে পারে, হঠাৎ চন্দনা কেন? অরিন্দম বলেন, “অনেক ধরে ইচ্ছা ছিল বাংলা ছবিতে একটা গজল যদি ফিরিয়ে আনা যায়। কিন্তু চাইলেই তো হয় না, বাংলা ছায়াছবিতে গান তো সিয়েচুশন অনুযায়ী হয়। তেমন যুৎসই মুহূর্ত তৈরি হচ্ছিল না। এবার ভেবে ফেললাম।”
অরিন্দমের কথায়,“মুশকিল হল, চন্দনা বৌদি তো সেভাবে প্লেব্যাক করেননি কোনওদিন। জিৎ বলল— একবার অজয়দার (পন্ডিত অজয় চক্রবর্তী) সঙ্গে কথা বলা যাক। অজয়দার সঙ্গে কথা বলল জিৎ। এরপর অজয়দা নিজেই আমাকে ফোন করলেন। খুব সরল গলায় বললেন— ‘তোমাদের বৌদি প্লেব্যাকে খুব স্বচ্ছন্দ নন।’
তবে এটুকু শুনেই ছেড়ে দিতে চাননি অরিন্দম বা জিৎ কেউই। অরিন্দম বলেন, “আমি তখন তাঁকে বললাম— আমরা একটা বাংলা গজল করতে চাই। সুতপা লিখেছেন, জিত সুরও করেছে যে অসাধারণ … স্ক্র্যাচ ভার্সানটা অন্তত শুনে দেখুন। তারপর ওঁকে গানটি পাঠাই। স্ক্র্যাচ পাঠানোর কিছুক্ষণ পরই অজয়দা ফোন করে জানালেন— বৌদি রাজি হয়েছেন। কী অপূর্ব গেয়েছেন চন্দনা বৌদি”।
সদ্য প্লে ব্যাকের এই অভিজ্ঞতা নিয়ে শনিবাসরীয় দুপুরে চন্দনা চক্রবর্তী যে কথা শোনালেন তাও মণিমুক্তোর মতো। বেঙ্গালুরুতে রয়েছেন তিনি। ফোনে দ্য ওয়ালকে বলেন,“আমি যদি বলি এই প্রথম প্লে-ব্যাক করলাম, তা হলে পুরোটা ঠিক বলা হবে না। ক্লাস সেভেন–এইটে পড়ার সময়ে সঙ্গীত পরিচালক সুরিৎ মিত্র ‘রংমশাল’ নামে একটি ছবিতে আমাকে সাত-আটটি গান রেকর্ড করিয়েছিলেন। সেই ছবিতে অভিনয়ও করেছিলাম আমি”।

চন্দনা চক্রবর্তী
চন্দনার বাড়ি তো বটেই, তাঁর মামার বাড়িতেও গান-বাজনার পরিবেশ ছিল, তাই অতো ছোট বয়সে রেকর্ডিং নিয়ে পরিবারের কেউ তখন আপত্তি করেননি। দমদমে থাকতেন তাঁরা। এদিন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চন্দনা বলেন, “সুরিৎদাই গাড়িতে করে আমাকে নিউ থিয়েটার্স স্টুডিয়োতে নিয়ে যেতেন এবং বাড়ি পৌঁছে দিতেন। প্রায় দশ-বারো দিন ধরে রেকর্ডিং চলেছিল। তবে পরে আর কখনও জানতে পারিনি ঠিক কেন গানগুলো মুক্তি পেল না। তেমন জানার আগ্রহও ছিল না”।
ফিরে আসা যাক প্লেব্যাকের কথায়। চন্দনা চক্রবর্তী বলেন, “আমার কর্তার (পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী) কিন্তু আমার প্লে-ব্যাক না গাওয়া নিয়ে খানিক আক্ষেপ ছিল। বারবার বলতো—এত বছর ধরে গান গাইছো, কিন্তু প্লে-ব্যাক করলে না! অথচ উনি নিজে তো বহু ছবিতে প্লে-ব্যাক করেছেন। সাম্প্রতিককালে ‘বন্দিশ ব্যান্ডিত’-এও গান গাইলেন, সেই গানে ঠোঁট মিলিয়েছিলেন নাসিরুদ্দিন শাহর মতো প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা”।
চন্দনা বলে চলেন, “সত্যি বলতে, আমার জীবনের বহু সঙ্গীত-ইচ্ছাই পূরণ হয়েছে আমার কর্তা এবং মেয়ের (কৌশিকী চক্রবর্তী) মাধ্যমে। ছেলে অনঞ্জন গান না গাইলেও সঙ্গীত প্রোডাকশনের সঙ্গে যুক্ত—এটাও আমার ভীষণ ভাল লাগে। আমাদের পরিবারে কেউই ‘চাকরি করবে বলে পড়াশোনা’ এই গতানুগতিক পথে হাঁটেনি। তাই আমার মধ্যে খামতি অনুভব করিনি কোনওদিনই। তবে কর্তার ইচ্ছেতে, ছেলের জোরাজুরিতে বহু পরে কয়েকটি প্লে-ব্যাক গান রেকর্ড করি। ভিডিও-শুট থেকে শুরু করে আরও কত কী যে করিয়েছে আমার ছেলে সে আর বলছি না! প্রায় দশটি গান রেকর্ড হয়েছিল তখন। সেই নিয়েই আমি খুশি ছিলাম”
তাহলে এবার এমন কী ঘটে গেল, যে মন পরিবর্তন করে ফেললেন চন্দনা? সঙ্গীত রিসার্চ আকাডেমির সময় থেকেই তাঁর সমসাময়িক অনেকের তুলনায় সুরেলা গলা ছিল তাঁর। বন্ধুরা বলেন, চন্দনার গায়কিতে একটা আলাদাই মাধুর্য ছিল। এহেন অজয়-পত্নী এদিন বলেন, “মনে আছে, কর্তার সদ্য বাইপাস সার্জারি হয়েছে, তিনি বিছানায় শুয়ে। এমন সময় জিৎ (জিৎ গাঙ্গুলী, সুরকার) ওকে ফোন করেন। কর্তা একবিন্দুও দেরি না করে বলে দিল—আমিই গান গাইব! আমি তো শুনে হতভম্ব—এই অবস্থায় কীভাবে? সংসার, দেখাশোনা সবকিছুই তখন আমার কাঁধে। কিন্তু কর্তা একটুও শুনলেন না”।
জিৎ তখন প্রত্যুষকে (প্রত্যুষ বন্দ্যোপাধ্যায়) বললেন সুর করে আমাকে গানটি পাঠাতে—যাতে আমি বাড়িতে বসেই গানটি তুলে নিতে পারি। রেকর্ডিংও আমাদের স্টুডিয়োতেই হবে। জিৎও যেমন জেদ করেছিল, তার থেকেও বেশি জেদ ছিল আমার কর্তার।
এতদিন পর বাংলা ছায়াছবিতে একটি গজল গাওয়া হবে—এই বয়সেও চন্দনা চক্রবর্তীর অধ্যবসায়ের ত্রুটি ছিল না। এদিন তিনিই জানান—"রাত দেড়টার দিকে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আমি হারমোনিয়াম বের করে চুপচাপ প্র্যাক্টিস করতাম। ছোট্ট গান, কিন্তু অত্যন্ত স্পর্শকাতর। চার-পাঁচ দিন ধরে মন দিয়ে গানটা ঘষামাজা করে তৈরি করেছিলাম। দুপুর ১২টায় রেকর্ডিং ছিল। আমি সওয়া ১২টায় পৌঁছে যাই। প্রায় পনেরো মিনিটেই রেকর্ডিং শেষ হয়ে গেল। প্রত্যুষ শুনে অবাক—বলল, ‘প্লে-ব্যাক গায়করা এত দ্রুত করে না, আপনি কীভাবে করলেন?’ আমি হাসতে হাসতে বলি, এত প্রশংসা করে লাভ নেই ভাই!”
চন্দনার কথায়, “জিৎ গানটি মাস্টারিং করে কর্তাকে পাঠতেই ও শুনে বলল—দারুণ হয়েছে। আমারও ভালোই লাগল, যদিও মনে হলো—আরও একটু ভেবে, শব্দগুলোর অনুভূতি আরেকটু ফুটিয়ে তুলতে পারতাম। কিন্তু সঙ্গীত পরিচালক খুশি হলে আর কিছু বলার থাকে না। জিৎ তো বলেই ফেলল—'তুমি যা গেয়েছ, তাতে মাথা ঠিক রাখা মুশকিল!’—আমার অবশ্য মনে হয়েছে,‘এ সব বাড়াবাড়ি কথা!’
বড় দিনে মুক্তি পাবে মিতিন মাসি। তার প্রমোশন নভেম্বরের শেষ থেকেই শুরু হয়ে যাবে। পরিচালক অরিন্দম শীল এদিন জানান, “কিছুদিন আগে বেঙ্গল ক্লাবে দেখা হয় অজয়দা আর চন্দনাদির সঙ্গে। তখন অজয়দা একটু দুশ্চিন্তায় বললেন— গানটা মুক্তি পাবে তো? ছবিতে থাকবে তো? আমি হেসে বললাম— কী বলছেন! এত সুন্দর গান, বাদ দেওয়া যায় নাকি!” তবে চন্দনার কথায়, “আমি আসলে সিনেমা হলে বড় পর্দায় গানটি শুনলেই খুশি হব—আমরা পুরোনো দিনের মানুষ, তাই ওটিটিতে দেখে মন ভরে না”।