প্রতি বছর World Theatre Day এলেই আবার নতুন করে মনে পড়ে—অভিনয়ের আসল ঘরটা কোথায়। ক্যামেরার ঝলকানি, লাল গালিচা, স্টারডম—এসবের অনেক আগেই এক অদৃশ্য, নিরাভরণ জায়গায় অভিনেতারা নিজেদের তৈরি করে।

শেষ আপডেট: 27 March 2026 15:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রতি বছর World Theatre Day এলেই আবার নতুন করে মনে পড়ে—অভিনয়ের আসল ঘরটা কোথায়। ক্যামেরার ঝলকানি, লাল গালিচা, স্টারডম—এসবের অনেক আগেই এক অদৃশ্য, নিরাভরণ জায়গায় অভিনেতারা নিজেদের তৈরি করে। সেই জায়গাটার নাম মঞ্চ। যেখানে গল্পের জন্ম হয় একেবারে খাঁটি রূপে, আর অভিনেতা শেখে নিজের ভেতরের সত্যিটা প্রকাশ করতে।
আজকের ডিজিটাল যুগে কনটেন্টের বন্যা বয়ে গেলেও, থিয়েটার এখনও অভিনয়ের সবচেয়ে কঠিন আর নির্ভরযোগ্য শিক্ষাঙ্গন। এখানে নেই কাট, নেই রিটেক। আছে শুধু মুহূর্ত, শ্বাস, আর দর্শকের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ার সাহস। এই কারণেই বলিউডের বহু পরিচিত মুখ তাদের যাত্রার শুরু করেছিলেন মঞ্চেই—শিখেছিলেন শৃঙ্খলা, স্বতঃস্ফূর্ততা আর আবেগের নিখাদ প্রকাশ।
এই বিশেষ দিনে ফিরে দেখা যাক সেইসব অভিনেতাদের পথচলা, যাদের সাফল্যের ভিতটা গড়ে উঠেছিল মঞ্চের অদৃশ্য আলো-ছায়ায়।
পঙ্কজ ত্রিপাঠীর গল্পটা যেন একেবারে সিনেমার মতোই। ১৯৯৬ সালে পাটনায় থিয়েটার দিয়ে শুরু। দিনের পর দিন রিহার্সাল, আর রাতের বেলা হোটেলের রান্নাঘরে কাজ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে তৈরি হচ্ছিল এক অভিনেতা। সেই আগ্রহই তাঁকে পৌঁছে দেয় ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায়। ২০০৪-এ মুম্বইয়ে এসে ছোট ছোট ৪০টিরও বেশি চরিত্রে অভিনয়—তারপর একদিন ‘গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর’ তাঁকে এনে দেয় সেই বহু প্রতীক্ষিত ব্রেক।
আলি ফজলের যাত্রাটা শুরু হয়েছিল স্কুলের মঞ্চে। দুন স্কুলে পড়ার সময় বাস্কেটবল খেলতে গিয়ে চোট পেয়ে তিনি ঢুকে পড়েন অভিনয়ের জগতে। ‘দ্য টেম্পেস্ট’-এ ট্রিনকুলো চরিত্রে অভিনয় করে বুঝেছিলেন, এটাই তাঁর পথ। এরপর মুম্বইয়ের থিয়েটার প্ল্যাটফর্ম, বিশেষ করে থেস্পো—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক শক্ত ভিত, যা পরে তাঁকে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও পৌঁছে দেয়।
রিচা চাড্ডার পথটা একটু আলাদা। মডেলিং দিয়ে শুরু হলেও, তিনি নিজেকে খুঁজে পান থিয়েটারের মধ্যেই। ব্যারি জনের মতো বিশিষ্ট পরিচালকের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে, দেশের নানা প্রান্তে মঞ্চে অভিনয় করেছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে তৈরি করে ‘ওয়ে লাকি! লাকি ওয়ে!’-এর মতো ছবির জন্য।
শ্বেতা ত্রিপাঠীর জীবনে থিয়েটার যেন এক অপ্রত্যাশিত মোড়। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্যাশন টেকনোলজিতে পড়াশোনা করার পর হঠাৎই তিনি খুঁজে পান নিজের আসল ভালোবাসা। মুম্বইয়ের এক থিয়েটার দলে যোগ দেন, এমনকি নিজের প্রোডাকশন হাউস ‘অল মাই টি প্রোডাকশন্স’ও গড়ে তোলেন। ‘মাসান’-এর আগে পর্দার আড়ালেও বহু কাজ করেছেন তিনি—ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলেছেন।
লিসা মিশ্রা, যাঁকে আমরা মূলত গায়িকা হিসেবেই চিনি, তাঁর মধ্যেও রয়েছে এক মঞ্চ-শিল্পীর সত্তা। মিউজিক্যাল থিয়েটারের অভিজ্ঞতা নিয়ে, প্রায় ১৫ বছর পর আবার মঞ্চে ফিরে আসেন তিনি। ‘কল মি বে’-এর মাধ্যমে পর্দায় আত্মপ্রকাশের পরেও তাঁর এই ফিরে আসা যেন প্রমাণ করে—মঞ্চ কখনও ছেড়ে যায় না কাউকে।
অক্ষয় ওবেরয়ের গল্পটা শুরু মুম্বইয়ের প্রিথ্বি থিয়েটারে। মকরন্দ দেশপান্ডের মতো অভিজ্ঞ মানুষের তত্ত্বাবধানে প্রথমে ব্যাকস্টেজ, তারপর মঞ্চে অভিনয়—‘মিস বিউটিফুল’-এর মতো নাটকে অংশগ্রহণ। এরপর জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটিতে থিয়েটার আর্টস নিয়ে পড়াশোনা—দেশ-বিদেশ মিলিয়ে নিজেকে গড়ে তোলার এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
আদর্শ গৌরবের যাত্রায় থিয়েটার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ‘দ্য ড্রামা স্কুল মুম্বই’-এ প্রশিক্ষণ নিয়ে, রায়েল পদমসির থিয়েটার কোম্পানির সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ‘লুক্রেস’-এর মতো প্রযোজনায় ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টসে অভিনয়—সব মিলিয়ে তাঁর অভিনয়ের ভিতটা তৈরি হয়েছে একেবারে মঞ্চেই।
গুলশন দেবাইয়ার ক্ষেত্রেও একই ছবি। বেঙ্গালুরুর ইংরেজি থিয়েটার জগতে ‘ফোরাম থ্রি’-র মতো দলের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। প্রায় এক দশক ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে কাটানোর পর সিনেমায় আসেন, আর ‘শয়তান’-এর মাধ্যমে নজর কাড়েন।
নিমৃত কৌর আহলুওয়ালিয়ার যাত্রা আরও দীর্ঘ। প্রায় ১৫ বছর থিয়েটারে প্রশিক্ষণ, ‘অ্যাটেলিয়ার স্কুল অফ ড্রামাটিক আর্টস’-এ পড়াশোনা—তারপর ফেমিনা মিস মণিপুর খেতাব জেতা, আর টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘ছোটি সরদারনি’-তে অভিনয়—সব মিলিয়ে তাঁর পথচলাও মঞ্চ থেকেই শুরু।
এই গল্পগুলো শুধু সাফল্যের নয়, অপেক্ষার, পরিশ্রমের, আর নিজের প্রতি এক অটল বিশ্বাসের। মঞ্চ তাঁদের শিখিয়েছে কীভাবে ভেঙে পড়তে হয়, আবার উঠে দাঁড়াতে হয়—কীভাবে এক চরিত্রে ঢুকে নিজের অস্তিত্ব ভুলে যেতে হয়।
তাই আজ যখন আমরা তাঁদের বড় পর্দায় দেখি, বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাঁদের অভিনয়ে মুগ্ধ হই, তখন মনে রাখা দরকার—এই জৌলুসের পেছনে আছে বহু বছরের অদেখা পরিশ্রম, ছোট ছোট মঞ্চ, অল্প আলো, আর অল্প দর্শক।
মঞ্চ শুধু এক ধাপ নয়, এটা এক আজীবনের ভিত্তি। এখানেই অভিনেতার জন্ম হয়—তারকা হয়ে ওঠা অনেক পরে।