
অরুন্ধতী দেবী
শেষ আপডেট: 29 April 2025 18:45
পাঁচের দশকে বাংলা ছবিতে দুই নায়িকার উত্থান হয়েছিল। দেবকী কুমার বসুর 'ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য' ছবি দিয়ে এলেন যৌবন সরসী সুচিত্রা সেন আর কার্তিক চট্টোপাধ্যায়ের 'মহাপ্রস্থানের পথে' ছবি দিয়ে আর এক পরমা সুন্দরীর অভিষেক হল, তিনি অরুন্ধতী মুখোপাধ্যায়। দুই নবাগতা অভিনেত্রীই দুটি ছবিতে ছিলেন বসন্ত চৌধুরীর বিপরীতে।
সুচিত্রার মোহময়ী রূপ কিছুটা হলেও ম্লান হয়েছিল অরুন্ধতীর আভিজাত্যে। পরবর্তী সময়ে সাবিত্রী, সুপ্রিয়া, সন্ধ্যা, মাধবীরা কেউই অরুন্ধতীর সমকক্ষ হতে পারেননি। আজ বাংলা ছবির দীপ্তিময়ী অভিনেত্রী অরুন্ধতী দেবীর (Arundhati Devi) জন্মদিন। সদ্য অভিনেত্রীর শতবর্ষ পার হল ২০২৪ সালে। কিন্তু তাঁর কাজের মূল্যায়ন সত্যিই কি হল?

কদিন আগেই সিনে সেন্ট্রাল নন্দন ৩ প্রেক্ষাগৃহে অরুন্ধতী দেবীর শতবর্ষে দেখানো হল হিন্দি ছবি 'যাত্রিক'। নামটা শুনে হোঁচট খেলেন? আসলে প্রবোধ সান্যালের কাহিনি অবলম্বনে কার্তিক চট্টোপাধ্যায়ের 'মহাপ্রস্থানের পথে' বাংলা ছবিটির প্রিন্ট আর পাওয়া যায় না। হিন্দি ভার্সান যাত্রিক'ই শুধু অবশিষ্ট রয়েছে। পাঁচের দশকে এমন ভ্রমণ ছবি পঙ্কজকুমার মল্লিকের সংগীত পরিচালনায় ঐতিহাসিক হিট হয়। এই ছবিতেই স্বপ্নসুন্দরী অরুন্ধতী স্নিগ্ধ রূপের দখিন হাওয়া ছড়িয়েছিলেন।
এরপর একে একে 'কিছুক্ষণ', 'বিচারক', 'শিউলি বাড়ি', 'ঝিন্দের বন্দী', 'জতুগৃহ' একাধিক ছবিতে কাজ করেছেন অরুন্ধতী। সুচিত্রা,সাবিত্রীর জমানায় উত্তমকুমার আর অরুন্ধতী দেবীর ছবিগুলিকে বাঙালি অন্যধারার ছবির নজরে দেখত। রোম্যান্টিক ঢলঢল রূপ নয়, ব্যক্তিত্বে অরুন্ধতী ক্লাস কী জিনিস বুঝিয়ে দিতেন।
পৈতৃক নাম অরুন্ধতী গুহঠাকুরতা। জন্ম ঢাকায় ২৯ এপ্রিল ১৯২৪ সালে। আদতে তাঁরা বরিশালের মানুষ। আইনজীবী বাবা বিভুচরণ গুহঠাকুরতা ওকালতির পাশাপাশি ধর্মচর্চাতেও মনোনিবেশ করতেন। ব্রাহ্ম সমাজে তাঁর যাতায়াত ছিল। যে প্রভাব প্রত্যক্ষ করা যেত অরুন্ধতীর সাজেও। সবার আগে গায়িকা রূপে অরুন্ধতীর আবির্ভাব হয়। ছ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ডাকঘর' নাটকে অরুন্ধতী গেয়েছিলেন 'গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ'। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে অরুন্ধতী গান শুনিয়েছিলেন। গান শুনে গুরুদেব অরুন্ধতীকে বলেছিলেন 'তুমি শান্তিনিকেতনে থাকবে তো? কত মেয়ে আসে যায়, গান শেখে, আবার পাখির মতো ফুড়ুৎ করে উড়ে যায়। তুমি থেকে যেও!' যে কথা আজীবন মনে রেখেছিলেন অরুন্ধতী। কলকাতা বিয়ের পর থাকতে হলেও সময় পেলেই শান্তিনিকেতন যেতেন তিনি। অরুন্ধতীর সহপাঠী ছিলেন মোহর, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়।

অরুন্ধতী কিন্তু চেয়েছিলেন উচ্চশিক্ষা। লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সে পড়ার স্বপ্ন ছিল অরুন্ধতীর। আর পড়বার সেই টাকা তুলতে চেয়েছিলেন সিনেমার পারিশ্রমিক থেকে। এমন চিন্তা কোন অভিনেত্রী স্বপ্নেও ভাবে না। কিন্তু ব্যতিক্রম অরুন্ধতী। অরুন্ধতীর সবথেকে শ্রেষ্ঠ চরিত্র 'ভগিনী নিবেদিতা'। বিজয় বসু পরিচালিত এই ছবি সোনার মেডেল জিতেছিল।
অরুন্ধতীর প্রেমে পড়েছিলেন পরিচালক প্রভাত মুখোপাধ্যায়। তখন অরুন্ধতী সিনেমায় আসেননি। আকাশবাণীতে কাজ করতেন প্রভাত। বিয়ের পর দু'জনেই এলেন ছবির জগতে। উত্তম-অরুন্ধতীর ক্লাসিক ছবি 'বিচারক' প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের ছবি। যেখানে অরুন্ধতীর লিপে উৎপলা সেনের বিখ্যাত গান 'আমার মল্লিকা বনে'। উৎপলার গানের মাঝে উত্তমের সাইকেল নিয়ে কাদায় পড়ে যাওয়া দেখে অরুন্ধতীর হাসি আজও অমলিন বাঙালির মনে।

প্রভাত-অরুন্ধতীর সংসার স্থায়ী হয়নি। এরই মাঝে তপন সিনহা অরুন্ধতীর প্রেমে পড়েন। সংসারে বিপর্যস্ত অরুন্ধতী তপন সিনহার ভালবাসায় যেন মলম পেলেন ভাঙা হৃদয়ে। ততদিনে মঞ্জু দে-র সঙ্গে তপন সিনহার সম্পর্কে দূরত্ব এসেছে। অসিত সেন উত্তম-অরুন্ধতীকে কাস্ট করে 'জীবন তৃষ্ণা' ছবি করছিলেন। হঠাৎ ছবির সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ফোন অসিতকে, 'আপনার ছবির নায়িকা তো তপন সিনহার সঙ্গে বিলেত চলে গেছেন। এবার ছবি কাকে নিয়ে করবেন?' অসিত সেনের মাথায় হাত! তাঁর 'পঞ্চতপা', "চলাচল' ছবির হিট নায়িকা এমন করতে পারে! শেষ অবধি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের হাতযশেই জীবন তৃষ্ণাতে অরুন্ধতীর জায়গায় এলেন সুচিত্রা সেন। শুরু হল অসিত সেন-সুচিত্রা সেন জুটি। 'দীপ জ্বেলে যাই' থেকে 'উত্তর ফাল্গুনী'।
অরুন্ধতী-তপন সিনহা দেশে ফিরে বিয়ে করলেন। এক মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে হল অরুন্ধতী-তপনের সংসার।
অন্যদিকে পরিচালনাতেও অরুন্ধতী দেবীর আবির্ভাব হল। ১৯৬৭ সালে প্রথম ছবি 'ছুটি'। নন্দিনী মালিয়া আর মৃণাল মুখোপাধ্যায়ের জুটিকে এমন ভাবে আনলেন অরুন্ধতী, যা আলোড়ন সৃষ্টি করল। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রাপ্ত 'ছুটি' ছবি দিয়ে পরিচালিকা রূপে অরুন্ধতী অন্য অভিনেত্রীদের তুলনায় আরো অনেক খানি এগিয়ে গেলেন। এরপর 'মেঘ ও রৌদ্র', 'পদিপিসির বর্মিবাক্স', 'দীপার প্রেম' প্রভৃতি ছবি পরিচালনা করেন।

তপন সিনহার ছবি সহ নিজের ছবিতেও সংগীত পরিচালনা করতেন অরুন্ধতী। শান্তিনিকেতনের আশ্রম কন্যা অরুন্ধতী 'হারমোনিয়াম' ছবিতে নিজের লিপে নিজেই গান গেয়েছিলেন। কানন দেবীর পর এত উৎকৃষ্ট গায়িকা নায়িকা চলচ্চিত্রে একমাত্র অরুন্ধতী।
অরুন্ধতীর ছেলে মেয়ে দুজনেই উচ্চশিক্ষিত। তাঁদের লাইমলাইটে কখনও আনেননি। মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন টি বোর্ডের ব্যক্তির সঙ্গে। নাম ছিল জয়ন্ত। কিন্তু অকালেই অরুন্ধতীর কন্যা বাবলি ক্যান্সারে মারা যান। মেয়ের মৃত্যুশোক ভোলা মা অরুন্ধতীর জন্য কঠিন ছিল। ছেলে অনিন্দ্য কর্মজগতে বাইরে বাইরে থেকেছেন।
হঠাৎই অরুন্ধতী অসুস্থ হয়ে পড়েন। অত সুন্দরী অভিনেত্রীর শরীরের একদিক পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে যায়। তারপরও তাঁর আভিজাত্য টলেনি। কিন্তু ছবির জগৎ থেকে দূরে চলে যান।

তপন সিনহার বহু আগেই প্রয়াত হন অরুন্ধতী দেবী। ১৯৯০ সালের ৩১শে জানুয়ারি। কেউই প্রায় খোঁজ রাখেনি। এমনকী মিডিয়ার এত রমরমা তখন ছিল না। অরুন্ধতীকে বৌদি মানতেন 'চারুলতা' মাধবী মুখোপাধ্যায়। মাধবী শ্মশানে যান অরুন্ধতীকে দেখতে। কেওড়াতলা মহাশশ্মানে একা পড়েছিলেন মৃত অরুন্ধতী। ছিলেন পরিজন গুটিকয়েক। মাধবী বলছেন 'আমিই দূরদর্শনকে খবর দিলাম। অনেকদিন অরুন্ধতী বৌদি অভিনয় জগৎ থেকে দূরে। এই চেহারায় তাঁকে আর চেনেনি মানুষজন। জনৈক একজন জিজ্ঞেস করলেন আমায় , কে হয় ইনি আপনার? বললাম ,বৌদি। তারা বললেন মাধবী মুখোপাধ্যায়ের বৌদি মারা গেছে। হায় এক লেজেন্ডারি নায়িকার এ কী বঞ্চনা।' দূরদর্শনকে খবর দেওয়া হলে শেষ প্রহরে তাঁরা এসেছিলেন খবর করতে। গায়িকা, নায়িকা, পরিচালক, গীতিকার, সুরকার, প্রযোজক এত গুণের এক নারীর প্রস্থান নীরবে নিঃশব্দে।
'মন বলে আমি মনের কথা জানি না ...
তারায় তারায় উড়ে বেড়ায় ... মাটিতে সে নামে না
মন বলে আমি মনের কথা জানিনা ... '
