এক মুহূর্তে যেন থমকে গিয়েছে সোশাল মিডিয়ার শ্বাস। ৩০ জানুয়ারি, আমেরিকার বিচার দফতর প্রকাশ করল কয়েক লক্ষ নয়, প্রায় তিরিশ লক্ষ নথি—যেগুলি যুক্ত সেই ভয়াবহ নামটির সঙ্গে, জেফ্রি এপস্টেইন।

শেষ আপডেট: 4 February 2026 14:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক মুহূর্তে যেন থমকে গিয়েছে সোশাল মিডিয়ার শ্বাস। ৩০ জানুয়ারি, আমেরিকার বিচার দফতর প্রকাশ করল কয়েক লক্ষ নয়, প্রায় তিরিশ লক্ষ নথি—যেগুলি যুক্ত সেই ভয়াবহ নামটির সঙ্গে, জেফ্রি এপস্টেইন। দণ্ডিত যৌন অপরাধীর ছায়া ঘিরে ধীরে ধীরে খুলে যেতে লাগল চিঠি, ইমেল, যোগাযোগের ইতিহাস। আর সেই বিস্তীর্ণ নথির ভিড়েই আচমকা ভেসে উঠল এক পরিচিত নাম—অনুরাগ কাশ্যপ। বলিউডের ‘বিদ্রোহী’ পরিচালক, যাঁর সিনেমা বরাবরই প্রশ্ন তোলে ক্ষমতা, নৈতিকতা আর সমাজের দ্বিচারিতা নিয়ে, তিনিই এবার আলোচনায়, এক অপ্রত্যাশিত কারণে। (Epstein files controversy, Epstein client list , Epstein client list, Epstein Report , Anurag Kashyap)
এই নথিগুলিতে অনুরাগের নাম নেই সরাসরি স্পষ্ট অক্ষরে লেখা পরিচয়ে। বরং অনুমান করা হচ্ছে, তিনিই সেই ‘বলিউডের লোক’—একটি সংক্ষিপ্ত, প্রায় অবহেলাভরা উল্লেখ। জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে আদানপ্রদানে থাকা জিউসেপ্পে বারসানি, জিনো ইউ এবং অর্নেলা কোরাজ্জার ইমেল কথোপকথনে উঠে এসেছে এই পরিচয়। আলোচনার বিষয় ছিল কিউবা, সাংহাইয়ের মতো জায়গায় সম্ভাব্য সফর, আর সেখানে আয়োজন করা কিছু কর্মশালা—বৌদ্ধ দর্শন, প্রযুক্তি, চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতো বিষয় ঘিরে।
এই ইমেলগুলিতে অনুরাগ কাশ্যপের নাম এসেছে সম্ভাব্য আমন্ত্রিতদের তালিকায়। বলা হয়েছে, তিনি নাকি সেইসব অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন, যেখানে ‘কুল’ এবং প্রভাবশালী মানুষদের উপস্থিতির কথা তুলে ধরা হচ্ছিল এপস্টেইনকে আকৃষ্ট করার জন্য। একই তালিকায় ছিলেন বেন গার্টজেল, ব্রুস ডেমার, ডি জে স্পুকির মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত নাম। কোথাও বলা হয়নি যে অনুরাগ সত্যিই সেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন, কিংবা এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর সরাসরি দেখা হয়েছিল। বরং নথিপত্র স্পষ্ট করে দেয়, এই উল্লেখ মানেই কোনও উপস্থিতি বা অংশগ্রহণের প্রমাণ নয়।
তবু নাম উঠে আসার পরেই শুরু হয় জল্পনার ঢেউ। ইন্টারনেট যেমনটা পারে, তেমনভাবেই এই তথ্য ছড়িয়ে পড়ে, বদলে যায় রসিকতায়, ক্ষোভে, বিস্ময়ে। এক রেডিট ব্যবহারকারী লেখেন, “এটা কি এপস্টেইনের ফাইল, না চিত্রগুপ্তের খাতা? সবাই তো আছেই। ভয় হচ্ছে, কোনওদিন আমার নামও বেরিয়ে না আসে!” আরেকজন মনে করিয়ে দেন, “যাঁরা সত্যিই এপস্টেইনের অপরাধে জড়িত ছিলেন, তাঁদের ধরুন। যাঁরা শুধু আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, তাঁদের নিয়ে হইচই করার দরকার কী?” কেউ আবার ঠাট্টার সুরে লেখেন, “এপস্টেইন ফাইলস নয়, যেন গুগল সার্চ। খুঁজলে ধোপার নামও বেরিয়ে আসবে।”
এই তালিকায় অনুরাগ একা নন। ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের আরেক পরিচিত মুখ, অভিনেত্রী নন্দিতা দাসের নামও উঠে এসেছে। ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের ব্রাথাই হলে আয়োজিত ‘লেক ডিস্ট্রিক্ট ফেস্টিভাল’-এর বক্তাদের তালিকায় তাঁর নাম ছিল। আয়োজক জেম বেন্ডেলের পাঠানো একটি নিউজলেটারে সেই উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে উৎসবের রূপরেখা ছিল অনেকটাই নিরীহ—সঙ্গীত, কায়াকিং, প্রকৃতির মাঝে হাঁটা, যোগব্যায়াম, তাই চি, নাচ আর গল্প বলার কর্মশালা। তবু এপস্টেইনের নামের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় সেই উল্লেখও আজ নতুন করে আলোচনায়।

এই নথিগুলিতে নাম রয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের প্রভাবশালী মানুষের—দীপক চোপড়া, অনিল আম্বানি, এমনকি দলাই লামার মতো ব্যক্তিত্বদেরও উল্লেখ ঘুরে ফিরে এসেছে সোশাল মিডিয়ার আলোচনায়। পুরনো দিনের কিছু ছবিও নতুন করে ছড়িয়েছে, যেখানে দেখা যায় বিল ক্লিনটন, মাইকেল জ্যাকসন, কেভিন স্পেসির মতো তারকাদের। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের দাবি, অন্তত ১৬টি ফাইল নাকি ইন্টারনেট থেকে উধাও হয়ে গেছে। এই সবকিছু মিলিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত।
এপস্টেইন ফাইলস আসলে কী? এটি সেই নথিসমূহের সংগ্রহ, যা জেফ্রি এপস্টেইন ও তাঁর সহযোগীদের অপরাধমূলক কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’-এর আওতায় মার্কিন সরকার বাধ্য ছিল তাদের কাছে থাকা সমস্ত অশ্রেণিবদ্ধ তথ্য প্রকাশ করতে। এক সময় মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতেও এই ফাইলস নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প একে সামনে এনেছিলেন প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে, যদিও পরে তিনি দাবি করেন, এগুলি ডেমোক্র্যাটদের সাজানো গল্প।

এই বিশাল নথির ভিড়ে অনুরাগ কাশ্যপের নাম এসেছে মাত্র দু’টি ইমেলে। সেখানে তাঁর প্রসঙ্গে জেফ্রি এপস্টেইনের কোনও প্রত্যুত্তরও পাওয়া যায় না। ২০১৭ সালের সেই ইমেল আদানপ্রদানে দেখা যায়, মূলত জিউসেপ্পে বারসানি ও জিনো ইউ একে অপরকে কপি করে এপস্টেইনকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, কত ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মানুষ সেইসব অনুষ্ঠানে আসতে পারেন। অনুরাগ সেখানে শুধু এক নাম, এক সম্ভাব্য পরিচয়।
তবু নাম মানেই তো গল্প। আর সেই গল্পই আজ অনুরাগকে এনে ফেলেছে অস্বস্তিকর এক আলোয়। অথচ নথিগুলি নিজেই বলে দেয়, এই উল্লেখ কোনও সম্পর্ক, কোনও সহাবস্থান বা কোনও অপরাধের প্রমাণ নয়। এটি শুধুই তথ্যের এক খণ্ড, যার চারপাশে মানুষের কৌতূহল, ভয় আর কল্পনা জড়িয়ে গেছে।