অনুভা চট্টোপাধ্যায়ের প্রস্থান এখনকার মিডিয়ার হয়তো আর দরকার নেই। অবশ্য তাঁর পরিবারও চাননি। কিন্তু এক কিংবদন্তির সহধর্মিনীর প্রস্থান বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক যুগের অবসান। অনিল-অনুভার ভালবাসা আজ বাতাসে বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে গল্ফ ক্লাব রোড জুড়ে।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 16 July 2025 14:27
'এমন আমি ঘর বেঁধেছি
তাহারে যার ঠিকানা নাই
স্বপনের সিঁড়ি দিয়ে যেখানে পৌঁছে আমি যাই'
অনিল-অনুভার সংসার এমন শান্তিরই ছিল। অভাব-অনটন শুরুর দিকে থাকলেও স্ত্রীর সাহচর্যেই অনিল হতে পেরেছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায়। অভিনেতার কিংবদন্তি হয়ে ওঠার পেছনে আড়াল থেকে যে মানুষটির সবথেকে সাহচর্য ছিল তিনি অনিল চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী অনুভা চট্টোপাধ্যায়। সবার আড়ালে গত ৭ জুলাই সোমবার প্রয়াত হলেন অনুভা চট্টোপাধ্যায়। মিডিয়া তাঁর নাগাল পেল না। স্বামী তারকা হলেও অনুভা দেবী নিজেকে চিরদিন আড়ালেই রেখেছিলেন। তাই তাঁর প্রস্থানও হল লাইমলাইটের বাইরে। এই প্রথম অনিল চট্টোপাধ্যায়ের পরিবার মুখ খুলল দ্য ওয়ালে।

তবে পরিবার আর পাড়া প্রতিবেশীদের ভালবাসা, প্রণাম আর চোখের জলে শেষ বিদায় হল অনিল জায়ার। শোকসন্তপ্ত তিন ছেলে অমিত, অরূপ আর অর্ণব আর একমাত্র মেয়ে অন্তরা। আছেন দুই পুত্রবধূ বড় আর মেজ, নীলু ও নিবেদিতা। ছোট বৌমা আগেই প্রয়াত। আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে ভরভরন্ত সংসারের মধ্যেই সারা জীবন কাটিয়ে গেলেন অনুভা চট্টোপাধ্যায়।
একজন স্ট্রাগলার তরুণকে সবসময় মনের জোর দিয়ে তাঁর ভালবাসার নেশাকে পেশা করতে সাহচর্য করেছিলেন অনুভা। দু'জনের বিয়ে হয়েছিল ১৯৫১ সালে। সে কবেকার কথা। তখন সবে মাত্র পঁচিশ দিন হয়েছে অনিলের অফিস যাওয়ার। জার্মান কোলাবরেশনের কোম্পানি। মাসে সাত-আটশো টাকা বেতন। পাঁচের দশকে টাকাটা কম তো নয়ই, বরং বেশ বেশিই। একদিন বললেন স্ত্রীকে, ‘ধুর, এ সব পোষায় না। ছেড়ে দেব।' সদ্য তখন বিয়ে হয়েছে তাঁদের। আজ চাকরি ছাড়লে, কাল কী খাবে ঠিক নেই। তবু অনুভা বলে দিলেন, 'না পোষালে করো না।’ ছেড়ে দিলেন চাকরি। কারণ সৃজনশীল মানুষরা কখনও পারেন না বদ্ধ বাঁধাধরা গতে কাজ করে যেতে। কিন্তু সংসারের চাপে এমন সিদ্ধান্ত ক'জন নিতে পারেন? স্ত্রী অনুভার সাহচর্যে তিনি পেরেছিলেন।
আকাশবাণীতে অডিশন দিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন অনিল। কিন্তু তিনি সে চাকরিও ছেড়ে দেন। অনিলের জায়গায় সুযোগ পান আর এক তরুণ। যিনি পরবর্তীকালে পরে হন কিংবদন্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

অনিল-অনুভার একমাত্র ছোট মেয়ে অন্তরা মিত্র চট্টোপাধ্যায় দ্য ওয়ালকে বললেন 'বাবা যখন চলে গেলেন তখন আমি ম্যাচিউর হয়নি। মা আমাকে সারাজীবন আগলে রেখেছিলেন। মা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আমার বিয়ে দেন। এখন আমার ছেলে মেয়ে বড় হয়ে গিয়েছে। তবু যাবার কদিন আগেও বললেন আমার মামণি এখনও বড় হয়নি। যে যে এসেছেন মাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সবাই বলেছেন যে কথা তাঁরা সকলকে বলতে পারতেন না, কিন্তু মাকে বলতে পারতেন। মায়ের তিনটে দিক ছিল। মা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে বাংলায় এম এ করেন, রবীন্দ্রনাথের গান ভালবাসতেন এবং মায়ের একটা বিশাল আধ্যাত্মিক জগত ছিল। রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে মায়ের নিবিড় যোগ ছিল। মায়ের মৃত্যু খবরে মহারাজরাও ব্যথিত। বাবা বাবা হত না যদি না মা পাশে থাকত। মা নিজের গয়না বন্ধক রেখে বাবাকে জীবনধারণ করতে দিয়েছেন।
ঋত্বিক ঘটকের 'কোমল গান্ধার' ছবির শুটিং ডেট পড়েছে। এদিকে তখন মা সন্তানসম্ভবা। আমার মেজদা হবে। ঠিক শুটিংয়ের দিন মায়ের প্রসববেদনা শুরু হয়েছে। কিন্তু মা বাবাকে ভাত বেড়ে খাইয়ে শুটিংয়ে পাঠিয়ে দিলেন। বললেন না নিজের যন্ত্রণার কথা। দুপুরে ব্যথা আরও বাড়তে পাশের বাড়ির এক প্রতিবেশিনীকে নিয়ে মা রিকশা করে চলে গেলেন ভাঙড় হাসপাতালে। সেখানেই আমার মেজদা হল। এদিকে 'কোমল গান্ধার' বাবার জীবনে মাইলফলক হয়ে রইল। সেদিন কিন্তু মা বাবার উন্নতির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াননি। বাবা চলে যাবার পর আমাদের একান্নবর্তী সংসার মা আগলে রেখেছিলেন দীর্ঘ বছর। সেই জায়গাটা শূন্য হয়ে গেল।
বাবার তো হাঁপানি ছিল আর মায়ের সিওপিডি। মা বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ৮৭ বছর বয়সে চলে গেলেন।'

সাবিত্রী ও অনিল কন্যা
স্ত্রীকে সব ছবির প্রিমিয়ারে নিয়ে যেতেন অনিল চট্টোপাধ্যায়। বলতেন 'সবাই তো আমার প্রশংসা করবে কিন্তু সত্যি কেমন অভিনয় করেছি কেউ বলবে না। অনু তুমি আমার অভিনয় দেখে সঠিক সমালোচনা করবে।'
অনিল চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী অনুভা দেবীর সঙ্গে অনিলের নায়িকাদের কেমন সম্পর্ক ছিল? মেয়ে অন্তরা বললেন 'মা আর সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় সেই কুমিল্লার থেকে বন্ধু। দু'জনে এক থালায় ভাত মেখে খেতেন। সাবিত্রী মাসি বলতেন অনুর সঙ্গে আমার পরিচয় অনিলদার সঙ্গে বিয়ে হবার অনেক আগেই। কলকাতা এসেও সবাই আমরা দুই বান্ধবী একসঙ্গে কোথাও গেলে অনুই পেত ফিল্মের অফার। কিন্তু অনু তো পড়াশোনাতেই ছিল।' আবার সুচিত্রা সেনের সঙ্গেও মায়ের ভীষণ বন্ধুত্ব ছিল। আমার মেজদা আর মুনমুন দি এক বয়সী। তখন সুচিত্রা সেন বহুবার আমার মায়ের কাছে মুনমুনদিকে রেখে শুটিংয়ে যেতেন। সেই ভরসা মাকে সুচিত্রা সেন করতেন। পরের দিকেও মায়ের সঙ্গে ওঁর যোগাযোগ ছিল। আবার সুপ্রিয়া দেবী তো বাবার বোন নীতার ভূমিকায় চিরস্মরণীয়। 'মেঘে ঢাকা তারা'র প্রিমিয়ারে মা খুব প্রশংসা করেছিলেন বেণু আন্টির অভিনয়ের। তবে উনি তো সাজতে ভালবাসতেন। উনি মাকে বলেছিলেন 'দেখো না, ঋত্বিকদা (ঘটক) আমাকে একটু সাজতে দেননি।'
অনুভা দেবী রবীন্দ্রনাথের গানের ভীষণ ভক্ত ছিলেন। মেয়ে চাকরি পেয়ে হারমোনিয়াম কিনে দেন মাকে। অনিল চট্টোপাধ্যায় যখন ভোটে দাঁড়ালেন তখন অনুভা জানতেন স্বামী ভোটে ঠিক জিতবেন। তাই তিনি আগে থেকেই বরকে কনগ্র্যাচুলেট করতে গ্রিটিংস কার্ড কিনে রেখেছিলেন। আর মানুষের ভালবাসায় বাবা জিতলেন।

গল্ফ ক্লাব রোডের পাড়ার সকলে কিন্তু শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন অনিল জায়াকে। প্রতিবেশী অভিনেতা দেবপ্রতিম তাজু দাশগুপ্ত দ্য ওয়ালকে জানালেন 'বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় এরআগে অনেকবার উনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। প্রতিবারই ফিরে এসেছেন। এবার আর ফেরা হল না। আমার মা অনিল চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে অন্তরাকে গান শেখাতে ওঁদের বাড়ি যেতেন। সেখানে মায়ের সঙ্গে অনুভা মাসিমার ভীষণ হৃদতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। অনিল চট্টোপাধ্যায় মাইনে নিজে হাতে দিতেন মাকে। অনুভা দেবীর সঙ্গে আমার মায়ের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এখন তো আমার মাও বার্ধক্যজনিত কারণে সব ভুলে যান।অনুভা দেবী খুব কম কথার মানুষ ছিলেন। বাড়িতে নাতি-নাতনি পরিবৃত্ত হয়ে থাকতেন।'
অনুভা দেবীর নিয়ম মতে শ্রাদ্ধবাসর কদিন পরেই ও তারপরদিন তাঁকে গানেগানে শ্রদ্ধা জানাবেন পরিবার ও বন্ধুবর্গ।

অনুভা চট্টোপাধ্যায়ের প্রস্থান এখনকার মিডিয়ার হয়তো আর দরকার নেই। অবশ্য তাঁর পরিবারও চাননি। কিন্তু এক কিংবদন্তির সহধর্মিনীর প্রস্থান বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক যুগের অবসান।
অনিল-অনুভার ভালবাসা আজ বাতাসে বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে গল্ফ ক্লাব রোড জুড়ে।
'জানলা দিয়ে সোনা রোদের আলো,
যায় যে ধুয়ে মলিনতার কালো,
দরজা খুলে ফুলের হাসি দেখতে আমি পাই,
প্রতিদিন দেখতে আমি পাই ...'