‘নিপাট ভদ্রলোক’ বলে খ্যাত কলকাতার জল-হাওয়ায় যৌবন কাটানো এই মানুষটি। সিনেমা জগতে দুষ্প্রাপ্য, কোনও কলঙ্ক যাঁকে এ যাবৎ স্পর্শ করতে পারেনি।

৮৩ বছর বয়সেও ভারতীয় চলচ্চিত্রের কুলমর্যাদা রক্ষা করে চলেছেন বুক চিতিয়ে।
শেষ আপডেট: 11 October 2025 11:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় সিনেমার ‘ভীষ্ম পিতামহ’ অমিতাভ বচ্চনের আজ ৮৩-তম জন্মদিন। ‘গব্বর সিং’কে ‘জয়’ মারতে পারেনি, পর্দায় তার মৃত্যু হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু, এই একটি সিনেমায় আধুনিক পশ্চিমী ঘরানার ‘শোলে’ (আগুনের ফুলকি) জ্বালিয়ে দিয়ে ছিলেন অমিতাভ বচ্চন। যার পুঁজিতে আগামিদিনের দেশীয় সিনেমাতেও অমরত্ব লাভ করে থাকবেন, ‘নিপাট ভদ্রলোক’ বলে খ্যাত কলকাতার জল-হাওয়ায় যৌবন কাটানো এই মানুষটি। সিনেমা জগতে দুষ্প্রাপ্য, কোনও কলঙ্ক যাঁকে এ যাবৎ স্পর্শ করতে পারেনি। এবং ভীষ্মের মতোই যিনি ৮৩ বছর বয়সেও ভারতীয় চলচ্চিত্রের কুলমর্যাদা রক্ষা করে চলেছেন বুক চিতিয়ে।
উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম কোনও ঘরানার সিনেমা জগতের সঙ্গে কোনওদিন বৈরিতা ছিল না বচ্চনসাহাবের। দক্ষিণের প্রখ্যাত অভিনেতা যিনি অমিতাভের অনেক আগেই দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেই রাজকুমারের সঙ্গেও অমিতাভের ছিল গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক। দুজনের বন্ধুত্বের শুরুটাও ছিল আশ্চর্যজনক। দুজনের অভিনীত সিনেমা মুক্তি পাওয়ার আগে রাজকুমারের ভক্তরা রেগে তা আটকে দেন। শুনে অমিতাভ বিমান ধরে পৌঁছে যান বেঙ্গালুরুতে। এবং রাজকুমারের সঙ্গে দেখা করেন। দুজনে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে সেই সমস্যার হাল করেন। ছবি মুক্তি পায়।
দুজনের বন্ধুত্ব এতটাই গভীর ছিল যে, কুলি সিনেমার শ্যুটিংয়ে জখম অমিতাভের চিকিৎসার সময় প্রমাণ মিলেছিল। বেঙ্গালুরুতে কুলির শ্যুটিং চলাকালীন ডামি না একটি মারামারির দৃশ্যে অভিনয় করার সময় প্রাণঘাতী ঘায়েল হন বচ্চন। সেন্ট ফিলোমেনাস হাসপাতালে আপৎকালীন পরিস্থিতি হিসেবে ভর্তি করা হয়। সেই সময় দক্ষিণের কিংবদন্তি অভিনেতা রাজকুমার মহিশুর থেকে ২৩ কিমি দূরে কপিলা নদীর তীরে নঞ্জানগুড় বা দক্ষিণ কাশী বলে পরিচিত শ্রীকন্টেশ্বর শিব মন্দিরে গিয়েছিলেন পুজো দিতে। শুধু তাই নয়, রাজকুমার সেখানে স্থানীয় ভাষায় উরুলু সেবে (মেঝেতে গড়িয়ে গড়িয়ে মন্দির পরিক্রমা) করেছিলেন।
চন্দন দস্যু বলে তৎকালে কুখ্যাত বীরাপ্পন যখন রাজকুমারকে অপহরণ করে, তখন অমিতাভ বচ্চন থেকে থেকে তাঁর পরিবারের কাছে খোঁজ নিয়েছেন ফোনে। অমিতাভ বচ্চন চিরকালই কুসংস্কার বিরোধী ও জাতপাত বিরোধী বলে পরিচিত। বিয়ের সময় ব্রাহ্মণ কন্যা জয়া ভাদুড়ির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে আপত্তি তোলেন এক বাঙালি পুরোহিত। তিনি বলেন, এটা হিন্দু রীতির বিরোধী। কারণ অমিতাভ বচ্চনরা জাতে আলাদা। তখন এই কাজে এগিয়ে আসেন তাঁর বাবা বিখ্যাত কবি হরিবংশ রাই বচ্চন।
কৌন বনেগা ক্রোরপতি ১৭-র অনুষ্ঠানে অমিতাভ বচ্চনকে এক মহিলা প্রশ্ন করে বসেন যে, আপনার সঙ্গে জয়াজির নাকি জঞ্জিরের শ্যুটিংয়ে প্রেম শুরু হয়েছিল? আর তারপরেই নাকি বিয়ে করেন আপনারা! উত্তরে বচ্চনসাহাব বলেন, আপনি পুরোটাই ভুল জানেন। বিগ বি বলেন, জয়া আর আমি প্রথম সিনেমায় আসি গুড্ডিতে। সেই সময়ই রিলিজ করে আনন্দ। তাই হৃষীকেশদার (মুখোপাধ্যায়) মনে হয় আমি ঠিক নই ওই চরিত্রের জন্য। উনি ধর্মেন্দ্রকে নেন। কিন্তু, জয়া আর আমার দেখা ওখানেই। আর তারপর কী হয়েছে, আপনারা সকলেই জানেন, আমি আর বলতে চাই না।
পর্দার জীবনে আসার পর থেকে আর কোনওদিন থেমে থাকেননি অমিতাভ বচ্চন। ৫৬ বছরের অভিনয় জীবনে অক্লান্তভাবে কাজ করে গিয়েছেন। বিয়ের সময় জয়া বচ্চনকে তিনি শর্তও দিয়েছিলেন যে, ৯-৫টা শিফটে কাজ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, সেটা মেনে নিতে হবে। আর আজ ৮৩ বছর বয়সে এসেও কেউ যদি ভাবেন, এখন গতি কমে গিয়েছে বচ্চনসাহাবের, তাহলে তিনি মূর্খের স্বর্গে বাস করেন। তাঁর দীর্ঘদিনে মেকআপ শিল্পী তথা ঘনিষ্ঠ দীপক সাওয়ান্ত কিছুদিন আগে জানান, অমিতাভ বচ্চন এখনও ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন।
আর সে কারণেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের মহাযুদ্ধের রথের ঘোড়া অমিতাভ বচ্চনের ৮৩ বছরের জন্মদিনেও তাঁর বাংলা জলসার সামনে সকাল থেকে ভক্তরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছেন। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে শুভেচ্ছাপত্র, কেউ মোবাইল ক্যামেরা চালু করে ঠায় অপেক্ষা করে আছেন। এক ভক্ত তো স্পষ্টই বললেন, আজ এই শতকের সুপারস্টারের জন্মদিন। আমাদের কাছে এইদিনটাই দেওয়ালি, এই দিনটাই হোলি।