'আদালত ও একটি মেয়ে' ছবির শেষ দৃশ্য মন ভাল করে দেয়, যখন স্কুলের ছোট ছোট ছাত্রীরা তাঁদের উর্মিলাদিকে স্কুল ছাড়তে দেয় না। বিকৃত কামের উর্ধ্বে জয় হয় অপাপবিদ্ধ ভালবাসার।

শেষ আপডেট: 12 July 2025 19:35
'দোলপূর্ণিমা রাতে ছিঁড়ে-খুড়ে খেলো তাকে কয়েকটা
শেয়াল-শকুন । আমার বুকের দুধে যত ধার, তারো
চেয়ে খরতর জ্যোৎস্না ছিল, তবু তাতে শুশ্রুষা ছিল
না কোনও । তাহলে সে ঈশ্বরী-প্রতিমা কেন
তিল তিল করে গড়েছিলে ? কেন বলেছিলে তাকে
ভালোবাসা ভেসে আসে রজনীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ?'
সেই মহাভারতের যুগের দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ থেকে আজও নারীর সম্মান যেন পুরুষের যৌন-ইচ্ছানির্ভর। যুগ যুগ ধরে সভ্যতা শিখিয়ে এসেছে পৌরুষের অর্থই দখলদারি, `জিতে নিতে হবে ভূমি / সেই জেদে রোখা তুমি ... জিতে নিতে হবে নারী / লিঙ্গই তরবারি ।'
কলকাতা শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আজও পরপর ঘটছে ধর্ষণের নক্কারজনক ঘটনা।

বাংলা চলচ্চিত্রে প্রথম ধর্ষণ ঘটনা তুলে ধরেছিলেন যিনি তিনি কিংবদন্তি পরিচালক তপন সিনহা। ছবির নাম 'আদালত ও একটি মেয়ে'। তাঁরই কাহিনি ও পরিচালনা। সেখানেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষিকা ধর্ষিতা হন। তবে স্কুলে নয় তিন শিক্ষিকা গোপালপুর ঘুরতে গিয়ে এই ঘটনার শিকার হন।
১৯৮২ সালে ধর্ষণ কেন্দ্রিক গল্প নিয়ে বাংলায় প্রথম বিপ্লব ঘটান তপন সিনহা। 'আদালত ও একটি মেয়ে'। তরুণী স্কুল শিক্ষিকা উর্মিলা তাঁর আরও দুই সহকর্মী শিক্ষিকার সঙ্গে ট্রেনে করে গোপালপুর ঘুরতে যান। ট্রেনের ভিতরেই শুরু হয় তাঁদের উত্ত্যক্ত করা। কালপ্রিট ক্ষমতাশালী বড়লোকের চার মদ্যপ যুবক। ট্রেন থেকে নেমেও নিস্তার মেলে না। বখাটে ছেলেগুলি মেয়ে তিনটিকে ফলো করতে থাকে। যদিও তাদের লক্ষ্য উর্মিলা (তনুজা করেছিলেন যে চরিত্রটি)।
শেষমেশ চার যুবক সমুদ্রের ভিতর টেনে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে উর্মিলাকে। সমুদ্রের ভিতর হাড়হিম দৃশ্য রচনা করেন তপন সিনহা।

হাসপাতালে থেকে কলকাতায় ফেরে মেয়ে। ছিছিক্কার পড়ে যায়। মেয়েটির বাবা (পতঞ্জলি গুহঠাকুরতা) সমাজের সজ্জন মানুষ। বাবা আর মেয়ের শান্তির সংসারে নেমে আসে কালো মেঘ। সবার এক প্রশ্ন, 'আপনার রেপড মেয়ে কেমন আছে?' শেষমেষ ক্লান্ত পিতা অফিসের ডেস্কে লিখে রাখেন, 'আমার ধর্ষিতা কন্যা ভাল আছে!' এই একটা লাইন দেখিয়ে যেন তপন সিনহা সমাজের নির্লজ্জতার গায়ে চাবুক মারেন।
কারণ সমাজ সংসারে উর্মিলাই হয়ে যায় অপরাধী। তাঁর স্কুলের চাকরি অবধি চলে যেতে বসে।
অথচ বড়লোক বাপের ছেলেরা কতটুকু শাস্তি পায়? আর সবথেকে বলিষ্ঠ চরিত্র ছিল কড়া পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় মনোজ মিত্রর। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করতে মনোজ মিত্রের অভিনয় এই ছবির প্রধান সম্পদ। কেউ ভুলতে পারবে না তাঁকে। তনুজার দুই সহকর্মী শিক্ষিকার ভূমিকায় ছিলেন দেবিকা মুখার্জী ও কুমকুম ভট্টাচার্য।

তবু 'আদালত ও একটি মেয়ে' ছবির শেষ দৃশ্য মন ভাল করে দেয়, যখন স্কুলের ছোট ছোট ছাত্রীরা তাঁদের উর্মিলাদিকে স্কুল ছাড়তে দেয় না। বিকৃত কামের উর্ধ্বে জয় হয় অপাপবিদ্ধ ভালবাসার।
'আদালত ও একটি মেয়ে' আটের দশকের অসম্ভব সাহসী ছবি। পুরীর সমুদ্রের মধ্যে তনুজার গণধর্ষণের দৃশ্য যে ভাবে শুট করেছিলেন তপন সিনহা তা আগে বা পরে বাংলা ছবিতে হয়নি। যেখানে ধর্ষিতাকে অত্যাচার করার শব্দ ধর্ষকরা টেপ রেকর্ডারে গান চালিয়ে চাপা দিয়ে দেয়। তনুজার শ্রেষ্ঠতম অভিনয়ের একটি 'আদালত ও একটি মেয়ে'।

একটি নিরপরাধ মেয়ের সম্মানহানির পর তাঁর একলা বাবার কী অবস্থা হতে পারে তা মর্মে মর্মে পর্দায় তুলে ধরেন তপন সিনহা।