রাজা ঘোষ সত্যি অবাক করে দিলেন। তাঁর ছবির বেশিরভাগ ফ্রেমে পাওয়া গেল প্রয়াত পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 8 June 2025 19:08
অভিনয়ে - শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, অমৃতা চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক কর, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়
পরিচালনা - রাজা ঘোষ
প্রযোজক : রাজ কুমার ভূনিয়া ও ধাগা প্রোডাকশন
দ্য ওয়াল রেটিং : ৮.৫/১০
নির্জন দুপুরে একসময় কলকাতা শহরের আনাচে কানাচে শোনা যেত চাবিওয়ালাদের চাবির শব্দ। নানা ধরনের তালা খোলার চাবি তৈরি করত তারা। রেলস্টেশন বা ডালহৌসি চত্বরেও এদের দেখা যেত। শিলকাটাও দের মতো শহর থেকে চাবিওয়ালারাও হারিয়ে যাচ্ছে আজকাল। কিন্তু চাবিওয়ালাদের মনের হদিশ কেউ কখনও রাখেনি। এমন মানুষদের প্রধান চরিত্র করে নবাগত পরিচালক রাজা ঘোষ বানিয়েছেন 'চাবিওয়ালা' ছবি। অনেক বাধার পাহাড় পেরিয়ে এই ছবি মুক্তি পেল। এমনকি দেশে বিদেশে একাধিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে 'চাবিওয়ালা' প্রদর্শিত হলেও, ছবিটি সেভাবে চর্চায় উঠে আসেনি। কিন্তু ছবিটি রিলিজ করার পর পর্দায় মন্ত্রমুগ্ধ করে দিল। কিন্তু এই ছবির খোঁজ রেখেছেন কজন?

গ্রামের হাট উঠে যাবার পর, চাবির ছোট্ট ডুকরি কাঁধে নিয়ে কলকাতায় এসে পড়ে, ভবেন ( কৌশিক কর), নগেন ( সৌমেন চক্রবর্তী)। এই ছবির গল্প এগোতে থাকে ভবেনকে ধরেই।
ভবেন শহরে এসে, খুঁজতে শুরু করে তার হারিয়ে যাওয়া ভালবাসা ফাতিমাকে (অমৃতা চট্টোপাধ্যায়)। তাদের সামাজিক ও ধার্মিক অবস্থানগত পার্থক্যের জন্য, ফাতিমার বাবা প্রায় জোর করেই, কলকাতায় তার বিয়ে দিয়ে দেয়। ভবেনের বিশ্বাস, সে বিরাট কলকাতা শহরে তার হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকাকে খুঁজে পাবেই। এদিকে তার সাথে দেখা হতে থাকে, শহরের নানান সামাজিক অবস্থানে থাকা মানুষজনদের। যাদের নানান ধরনের চাবি হারিয়ে গেছে। কারুর বা ড্রয়ারের বা কারুর মনের। শহরের আড়ালে থাকা নানা মানুষের নানা ধরণের মন ক্রমশ প্রকাশ পেতে থাকে। কিন্তু ভবেন-ফতেমার কী দেখা হয়?

রাজা ঘোষ সত্যি অবাক করে দিলেন। তাঁর ছবির বেশিরভাগ ফ্রেমে পাওয়া গেল প্রয়াত পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে। বুদ্ধদেবের মতোই পর্দাকে ক্যানভাসের মতো ব্যবহার করেছেন রাজা ঘোষ। কিন্তু এই পোড়া টলিউডে বহু সম্ভাবনাময় পরিচালক হারিয়ে যান। আশা করি 'চাবিওয়ালা' ডিরেক্টর আলোয় থাকবেন। দর্শকরা যদি এই প্রচারের বাইরে থাকা ছবিটি সিনেমাহলে গিয়ে দেখেন তাহলে এমন ছবির পরিচালকরা আরও ছবি বানানোর ভরসা পাবেন।
বাস্তবের দুই অতি সাধারণ চরিত্র এই ছবির হিরো-হিরোইন। চাবিওয়ালা ভবেন আর তার বিয়ে হয়ে যাওয়া প্রেমিকা ফতেমা। কৌশিক কর মঞ্চ থেকে উঠে আসা অভিনেতা পর্দাতেও চোখে জল আনা অভিনয় করলেন। নাটকের অভিনয়ের ছাপ এতটুকু নেই ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিক অভিনয়ে। তেমনই দুর্দান্ত নায়িকা চরিত্রে অমৃতা চট্টোপাধ্যায়। সদ্য ফোটা হাস্নুহানার মতো রূপ নিয়েও শাবানা আজমি, স্মিতা পাতিলের স্পর্শ পাওয়া গেল। হাঁটাচলা থেকে বোরখার ফাঁক দিয়ে দেখা সবেতেই অমৃতা তাঁর শ্রেষ্ঠ অভিনয় করেছেন। এখনকার বহু প্রচারে থাকা অভিনেত্রীকে হারিয়ে দিলেন প্রথাবর্হিভূত অভিনেত্রী অমৃতা।

সোহাগ সেন উকিলের চরিত্রে যথাযথ। শুভাশিস মুখোপাধ্যায় এক ফুরিয়ে যাওয়া লেখকের চরিত্রে আবারও চমকে দিলেন। এমন এক অভিনেতাকে নতুন ভাবে পর্দায় আনলেন পরিচালক। শুভাশিসের এমন ধারালো অভিনয় বুঝিয়ে দেয় তাঁকে জীবনের প্রাইম টাইমে ভাঁড় সাজিয়ে রেখে টলিউড কী ভুল করেছে।
চাবি কতভাবে কত মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাই দেখায় এই ছবি। ভূখারাম, যাকে শহরের নানান প্রান্তে, নানান পেশায় ও পোষাকে দেখা যায়। ভূখারাম শহরের প্রতিভূ হয়ে ধরা পড়তে থাকে, ভবনের চোখে। এই ভূখারামের চরিত্রে মন কাড়া অভিনয় করলেন রাহুল অরুনোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। যে কোন চরিত্রেই যে বাস্তব হয়ে উঠতে পারেন রাহুল অরুনোদয় তা তিনি আবার প্রমাণ করলেন। ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় থেকে শঙ্কর দেবনাথের মতো বলিষ্ঠ অভিনেতারাও ছবিটিতে পালক যোগ করেছেন। দেবপ্রতিম দাশগুপ্ত, মনশ্রী বিশ্বাস বিশ্বাসযোগ্য।

এই ছবির মূল সম্পদ পরিচালকের মন কাড়া চিত্রনাট্যে সঙ্গে প্রসেনজিৎ চৌধুরীর সিনেমাটোগ্রাফি। সে দ্বিতীয় হুগলি ব্রিজের ওপর হোক বা সবুজ গ্রামের প্রান্তরে, বহুদিন পর বাংলা ছবিতে এমন চোখ জুড়োনো ক্যানভাস দেখা গেল। অনির্বাণ মাইতির সম্পাদনা আরও ছবিটিকে টানটান করেছে।

'চাবিওয়ালা' ছবিটি কিন্তু সমস্ত শ্রেণীর মানুষকে স্পর্শ করবে, এখানেই ছবিটি অনন্য। জানা নেই, এমন ছবি প্রেক্ষাগৃহে কতদিন জায়গা পাবে! খাঁটি জিনিস চিনে নেবার জহুরির চোখ তো সবার থাকে না। এমন ছবি দেখুন অবশ্যই। দেখতে যাবার পরিশ্রম টুকু সার্থক হবে।