শেষ জীবনে কিন্তু ঐরকম স্থুলকায় চেহারার ছিলেন না টুনটুন। একেবারেই রোগা হয়ে ভেঙে গিয়েছিল চেহারা। অভাব অনটন ছিল তবে তার জন্য খারাপ মানের ছবি করেননি।

শেষ আপডেট: 11 July 2025 16:48
পৃথুলা চেহারাকেই তিনি করে তোলেন নিজের জনপ্রিয়তার কারণ। ভীষণ ভারী চেহারার মহিলারা চিরকালই বডি শেমিং-এর শিকার হন। কিন্তু এই নারী নিজের স্থুলকায় চেহারাকে করে তুলেছিলেন তাঁর ইউএসপি। নারীর ললিত লোভন রূপ তাঁর শরীরে ভগবান না দিলেও তিনি পিছিয়ে থাকেননি। তিনি যা, তিনি সেভাবেই দর্শকের সামনে এসেছেন ও মন ভরিয়েছেন দীর্ঘ সময়।
তিনি পর্দায় এলেই ছুটত হাসির ফোয়ারা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আজও তাঁর কমেডি অভিনয়ের ভক্ত। টুনটুন এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিলেন বলিউডে, যে পরবর্তীকালে মেয়েদের ভারী চেহারা মানেই তা হয়ে উঠেছিল টুনটুনের সমার্থক।
তিনি বলিউডের স্বর্ণযুগের প্রথম মহিলা কৌতুকাভিনেত্রী টুনটুন। পুরুষ কমেডিয়ানদের দাপটের দুনিয়ায়, একা নারী টুনটুন সারা ভারতকে হাসিয়ে ছাড়তেন। তবে টুনটুন অভিনেত্রীর আগে একজন দাপুটে গায়িকা। গায়িকা অভিনেত্রীর দুই সত্ত্বা ছিল তাঁর ভিতর। নীরবে পার হয়ে গিয়েছে তাঁর শতবর্ষ। আজ টুনটুনের জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক তাঁর জীবন সফর।
চার্লি চ্যাপলিনের থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন সেযুগের অভিনেতা নুর মহম্মদ মেমন। এত সুনিপুণ ভাবে চার্লি চ্যাপলিনকে নকল করতেন তিনি, যে তাঁর নামই হয়ে গিয়েছিল নুর মহম্মদ চার্লি। ভারতীয় সিনেমায় কমেডির নতুন ধারা শুরু হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। সে সময় নাজির মহম্মদ বা মনোহর দীক্ষিতের মতো কৌতুকাভিনেতাদের থেকে তাঁর অভিনয় ছিল একেবারেই ব্যতিক্রম। নুর মহম্মদ চার্লির দেখানো পথেই হিন্দি সিনেমা পেল জনি ওয়াকার বা মেহমুদের মতো কৌতুকাভিনেতাদের। তবে তখনও সে জগতে মেয়েদের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। সেই বাধার পাহাড় ভাঙলেন এক নারী, তিনি টুনটুন।
আসল নাম উমাদেবী খাতরি। নেপথ্যগায়িকা রূপে পা রেখেছিলেন বম্বে পাড়ায়। উমার জন্ম উত্তরপ্রদেশের আমরোহা জেলার আলিপুর গ্রামের উত্তর ভারতীয় পরিবারে। জমি সংক্রান্ত বিবাদের জেরে টুনটুনের বাবা, মা ও বড় ভাই তিনজনেই মারা যান। তখন এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবহেলায় পরিচারিকার কাজ করে কিশোরীবেলা কেটেছিল উমার। এরপর দিল্লীতে এক এক এক্সাইজ কর্তার সঙ্গে চলে আসেন তিনি। তিনি উমাকে পিতৃস্নেহেই মানুষ করেছিলেন। তাঁর প্রেরণায় উমার গান শেখা শুরু। এরপর দেশভাগের সময় এক্সাইজ কর্তা পাকিস্তান চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। সেসময় উমার বয়স ২৩। উমা চলে আসেন বম্বেতে।
নিজের বলতে উমার কেউ ছিল না। যাযাবর জীবনে থেকেও তাঁর ছিল দুটো স্বপ্ন দেখার চোখ আর অসীম সাহস। বম্বেতে পা রেখেই সোজা চলে যান সুরকার নওশাদ আলির কাছে। নওশাদের বাড়ির দরজা নাড়তেই দরজা খোলেন স্বয়ং নওশাদ। আসার কারণ নওশাদ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন 'আমি গান গাইতে পারি। আপনার তালিমে গায়িকা হতে চাই। যদি না নেন তাহলে আমি সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করব।' মেয়ের গানের প্রতি আকুতি দেখে নওশাদ তাকে গান শেখাতে নিয়ে নেন।

উমার গান শুনে তৎক্ষণাৎ তাঁকে পছন্দ করে ফেলেন নওশাদ। ‘নাজির ওয়ামিক আজরা’ নামে একটি ছবিতে গান দিয়ে বলিউড অভিষেক হয় গায়িকা উমার। একক নেপথ্য গায়িকা রূপে টুনটুনের প্রথম ছবি ছিল 'আজরা'। নওশাদের সংগীত পরিচালনায় গান গেয়ে সে যুগের নূরজাহান, রাজকুমারী, জোহরা বাঈদের পাশাপাশি নিজের জায়গা তৈরি করে নেন উমা। ১৯৪৭ সালে টুনটুনের বিখ্যাত গান ছিল 'আফসানা লিখ রাহিঁ হু'।
এই গান শুনে উমার প্রতি মুগ্ধ হয়ে গেলেন এক তরুণ। তিনি প্রেম পড়লেন উমার। প্রেম থেকে বিয়ে হতে বেশি সময় লাগেনি। এক ঘরছাড়া মেয়ে এতদিনে ঘর পেলেন। রূপে না ভুলিয়ে, গানেই ভুলিয়ে দিয়েছিলেন উমা। তাঁর স্বামীর নাম ছিল মোহন। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে তাঁদের।

কিন্তু লতা মঙ্গেশকর আর আশা ভোঁসলে, বলিউডে দুই বোনের উত্থানে উমার কেরিয়ারে আগুন লাগে। উমার কন্ঠে ততদিনে বয়সের ছাপ এসেছে আর নায়িকার লিপে অনেক বেশি এগিয়েছিলেন লতা ও আশা। ক্রমশ তাঁর গানের বাজার ফুরিয়ে আসছিল। সেই সময় নওশাদ তাঁকে বুদ্ধি দেন গানের জগতে যখন উমার দর কমছে, তখন অভিনয় জগতে তাঁকে চলে যেতে। বাবলি স্বভাব আর ভারী চেহারায় কৌতুকাভিত্রীর রোলে তিনি সুযোগ পেয়ে যান।
কিন্তু অভিনয়ের জন্য বেছে নিয়েছিলেন টুনটুন ছদ্মনাম। পরে এমন একটা সময় এল যখন তাঁকে সারা বিশ্ব টুনটুন বলেই চিনল, হারিয়ে গেল উমা। তবে তাঁর গান মনে রেখেছিল শ্রোতারা।
প্রথম দিলীপ কুমারের সাহচর্যে 'বাবুল' ছবিতে নজর কেড়ে নেন টুনটুন। গুরু দত্তের ছবিতে সুযোগ পেয়ে টুনটুন বিশাল জনপ্রিয়তা পান। 'আর পার', 'মিঃ অ্যান্ড মিসেস ৫৫',' পিয়াসা' তে কমেডিয়ানের ভূমিকায় অভিনয় করে বিশাল সাফল্য পান। তবে তখন কিন্তু টালিগঞ্জ পাড়ায় অনেক আগেই রাজলক্ষ্মী দেবী এসে গিয়েছেন। তিনিও পৃথুলা চেহারায় দাপুটে অভিনয় করতেন। দজ্জাল ও কমেডি রোলে রাজলক্ষ্মী ছিলেন আদর্শ। তবে বলিউডে টুনটুন মহিলা কৌতুকাভিনেতাদের পথিকৃৎ বলা চলে। একের পর এক ছবিতে অভিনয় করে জনপ্রিয়তার শিখরে ওঠেন তিনি।
/bollyy/media/media_files/uploads/2019/07/Tun-Tun.jpg)
পাঁচ দশকে নানা ভাষায় অসংখ্য ছবি করেছিলেন টুনটুন। জনি ওয়াকার, ভগবান দাদা, আঘা, সুন্দর, কেষ্ট মুখার্জী ও ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন টুনটুন। বিশ্বজিতের পরিচালনায় 'শোরগোল' বাংলা ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বাংলার লেজেন্ডারি অভিনেতার সঙ্গে অভিনয় করেন টুনটুন। তবে সেখানে টুনটুন ও ভানু , বাড়ির পরিচারক-পরিচারিকার মজার প্রেম দেখানো হয়েছিল। একই ফর্মুলায় কমেডি মানেই বেশিরভাগ পরিচারিকার রোল পেতেন টুনটুন। যে কারণে টুনটুন তাঁর অভিনয়ের স্বীকৃতি পাননি। পেলেন না ভাল চরিত্রও।
তাঁর অভিনীত একাধিক ছবি হল পরদেশ, বাবুল, বাজ, প্রভু কি মায়া, চার পয়সা, শ্রী ৪২০, সি আই ডি, ক্যাপ্টেন কিশোর আরও কত।

শেষ জীবনে কিন্তু ঐরকম স্থুলকায় চেহারার ছিলেন না টুনটুন। একেবারেই রোগা হয়ে ভেঙে গিয়েছিল চেহারা। অভাব অনটন ছিল তবে তার জন্য খারাপ মানের ছবি করেননি। ২৩ নভেম্বর ২০০৩ সালে ৮০ বছর বয়সে প্রয়াত হন টুনটুন। তবে আজও তাঁর ছবি টেলিভিশনে, ইউটিউবে ভেসে উঠলেও দর্শকের মুখে হাসি ফুটে ওঠে।