শেষ পর্যন্ত আর জয়ী হওয়া হল না। মারণ রোগের সঙ্গে দীর্ঘ, যন্ত্রণাময় লড়াইয়ের শেষে সোমবার সকাল ঠিক ন’টার সময় জীবনের পর্দা নামিয়ে দিলেন ছোটপর্দার পরিচিত মুখ, অভিনেত্রী শ্রাবণী বণিক।

শেষ আপডেট: 29 December 2025 13:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শেষ পর্যন্ত আর জয়ী হওয়া হল না। মারণ রোগের সঙ্গে দীর্ঘ, যন্ত্রণাময় লড়াইয়ের শেষে সোমবার সকাল ঠিক ন’টার সময় জীবনের পর্দা নামিয়ে দিলেন ছোটপর্দার পরিচিত মুখ, অভিনেত্রী শ্রাবণী বণিক। হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে, অক্সিজেনের নিঃশ্বাসে ভর করে চলছিল তাঁর শেষ কয়েকটি দিন। ফুসফুসের অ্যাডেনোকার্সিনোমা—লাং অ্যাডেনোকার্সিনোমা—এবং তার সঙ্গে শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মেটাস্টেসিস ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিয়েছিল তাঁকে। কয়েক সপ্তাহ ধরে অবস্থার অবনতি হচ্ছিল, আশার আলো ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সমস্ত চেষ্টা, সমস্ত প্রার্থনা অতিক্রম করে তিনি পাড়ি দিলেন না-ফেরার দেশে।
কিন্তু এই বিদায় শুধু একটি জীবনের অবসান নয়, এটি এক অসমাপ্ত সংগ্রামের কথাও বলে। চিকিৎসা ছিল দীর্ঘ, কঠিন এবং ভয়াবহ ব্যয়বহুল। টলিউডে বহু বছর কাজ করেও জীবনের এই কঠিন সময়ে আর্থিক দুশ্চিন্তা যেন আরও নির্মম হয়ে উঠেছিল। সেই অসহায় মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে ভরসা খুঁজতে হয়েছিল অভিনেত্রীর পরিবারকে। মায়ের প্রাণ বাঁচানোর আকুতি নিয়ে সামনে এসেছিলেন তাঁর ছেলে অচ্যুত আদর্শ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেলের সেই পোস্ট ছুঁয়ে গিয়েছিল অসংখ্য মানুষকে। সেখানে লেখা ছিল—সকলের প্রিয় অভিনেত্রী শ্রাবণী বণিক দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত, তাঁর চিকিৎসার জন্য সাহায্যের প্রয়োজন। অচ্যুত জানিয়েছিলেন, মায়ের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন প্রায় বারো লক্ষ টাকা। পরিবার নিজের সাধ্য মতো সবকিছু করলেও এই বিপুল অঙ্ক জোগাড় করা সময়সাপেক্ষ ও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছিল। তাই তিনি সকলের কাছে অনুরোধ করেছিলেন—অল্প হলেও যেন সবাই পাশে দাঁড়ান, কারণ প্রতিটি ছোট সাহায্যই তখন অমূল্য।

শুধু আবেদনেই থেমে থাকেননি অচ্যুত। ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম কেটোতে মায়ের চিকিৎসার জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। সেই আবেদনে বিস্তারিতভাবে লিখেছিলেন শ্রাবণীর শারীরিক অবস্থার কথা—ফুসফুসের ক্যানসার, তার সঙ্গে মেটাস্টেসিস, এবং চিকিৎসার জন্য যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। পোস্টের সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য ও কিউআর কোডও দেওয়া হয়েছিল, যাতে যে কেউ সরাসরি সাহায্য করতে পারেন।
এই আবেদন দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। বন্ধু, সহকর্মী, দর্শক—অনেকে শেয়ার করেছিলেন সেই পোস্ট। মানবিকতার ডাক পৌঁছেছিল বহু হৃদয়ে। তবু সময় বড় নিষ্ঠুর। অর্থ জোগাড়ের লড়াই চললেও শরীর আর সঙ্গ দেয়নি অভিনেত্রীর।
শ্রাবণী বণিক ছিলেন ছোটপর্দা ও বড়পর্দার এক সুপরিচিত নাম। ‘লালকুঠি’, ‘গোধূলি আলাপ’, ‘রাঙাবউ’, ‘মিষ্টু’, ‘সোহাগ চাঁদ’-এর মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকে তাঁর অভিনয় তাঁকে এনে দিয়েছিল দর্শকের ভালোবাসা ও পরিচিতি। পর্দায় যাঁকে দেখা যেত দৃঢ়, সংবেদনশীল চরিত্রে, বাস্তব জীবনে সেই মানুষটিকেই শেষ দিনগুলোতে লড়তে হয়েছে নীরব যন্ত্রণা আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে।
শেষ পর্যন্ত সব আবেদন, সব প্রার্থনা, সব চেষ্টা পেরিয়ে মৃত্যুই জয়ী হল। যে হাতগুলো মায়ের জন্য সাহায্যের আকুতি জানিয়েছিল, সেই হাতই আজ শূন্য। আলো, ক্যামেরা, অভিনয়ের দুনিয়া থেকে অনেক দূরে, নিঃশব্দে বিদায় নিলেন শ্রাবণী বণিক।

তাঁর প্রস্থান শুধু এক অভিনেত্রীর মৃত্যু নয়—এ এক মায়ের অসমাপ্ত চিকিৎসা, এক ছেলের অসহায় লড়াই, আর এক শিল্পীর নীরব পতনের গল্প। পর্দার আলো নিভে গেলেও, শ্রাবণীর স্মৃতি থেকে যাবে তাঁর অভিনয়ে, তাঁর মুখে বলা সংলাপে, আর সেই মানবিক আবেদনে—যেখানে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বেঁচে থাকার আকুতি ছিল নিখাদ, নির্মল এবং হৃদয়ভাঙা।