তিনি অভিনেত্রী রূপে যতটা দক্ষ, রবীন্দ্রনাথের গানেও তাঁর ততখানি দরদ। আর এই শিক্ষা চূর্ণী পেয়েছিলেন প্রথম যৌবনের রবিবারগুলিতে।

গ্রাফিক্স -দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 2 September 2025 14:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম ফিচার ফিল্ম ছিল 'ওয়ারিশ'। সালটা ২০০৪। দেবশ্রী রায়, সব্যসাচী চক্রবর্তী ও চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় অভিনীত ছবিটি নিয়ে দু দশক পর মানুষ এখন চর্চা করে। কিন্তু রিলিজের সময় সিনেমাহলে একেবারেই চলেনি ছবিটি। কৌশিক খুব মুষড়ে পড়েছিলেন প্রথম ছবি ফ্লপ হওয়াতে। মানুষ তখন নেয়নি এই ছবি। অথচ খুব সুক্ষবোধের ছবি বানিয়েছিলেন কৌশিক। 'ওয়ারিশ' ছবিতে চূর্ণীর নিজের কণ্ঠে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ছিল 'যদি প্রেম দিলে না প্রাণে'। অনেকেই জানত না এ গান চূর্ণীর গাওয়া। নায়িকা চূর্ণীর পাশাপাশি গায়িকা চূর্ণীকেও কৌশিক তাঁর প্রথম ছবিতে ব্যবহার করেন।

চূর্ণীর রবীন্দ্রনাথের গানে হাতেখড়ি অনেক আগে। সদ্য প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী অভিরূপ গুহঠাকুরতা। যাঁর কাছেই চূর্ণীর দীর্ঘ সময় গান শেখা। গুরুর প্রস্থানে গান শেখার স্মৃতিচারণে চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়।
চূর্ণীর স্মৃতিতর্পণে 'সম্ভবত ১৯৯০ সাল। রবীন্দ্রসদন। বহুবার শোনা একটি গান, নতুন ক’রে শুনলাম- 'তোমার কাছে এ বর মাগি মরণ হতে যেন জাগি গানের সুরে…'। কী আবেগ, কী তাঁর নম্রতার আর্তি, যেন কোন গভীরে ডুবে গিয়ে, সম্পূর্ণরূপে এক আত্মসমর্পণ! গানের শিল্পী অভিরূপ গুহঠাকুরতা। মাকে বললাম যে আমি এনার কাছে গান শিখতে চাই।'
মেয়ের যেমন ইচ্ছে মা তাই করলেন। কনভেন্টে পড়া চূর্ণী ভর্তি হলেন রবীন্দ্রনাথের গান শিখতে।
চূর্ণীর কথায় 'সেই আমার অভিকাকুর কাছে যাওয়া শুরু। প্রতি রবিবার। কত চেনা অচেনা রবীন্দ্রসঙ্গীত যত্ন করে শেখাতেন আমাদের! গানের কথায়, সুরে নিমগ্ন হয়ে তাঁর গলা বুজে আসত, চোখে জল চলে আসত। তাঁর সান্নিধ্যে এসে আমরা সন্ধান পেয়েছিলাম একজন আবেগপ্রবণ মানুষের। তাই তাঁর গান সামনাসামনি বসে শুনতে সব থেকে ভালো লাগত।

অভিকাকু খুব স্নেহ করতেন আমাদের ছাত্রছাত্রীদের। 'আমার প্রাণের ‘পরে চলে গেল কে…' গানটি আমাকে মাঝেমধ্যেই গাইতে বলতেন। শেষ হলে আশীর্বাদ করতেন মাথায় হাত দিয়ে।
এই গান তোমার জন্যই রইল, অভিকাকু। তোমাকেই উৎসর্গ করছি আজ। চাঁদের আলোর দেশে গিয়েও তুমি গানের সুরে রয়েই গেলে। তোমার গান মানেই একটা spiritual journey- তুমি তো শুধু শিল্পী নও, তুমি ছিলে একজন সাধক।'
আইকনিক প্রতিষ্ঠান 'দক্ষিণী' ও গুহঠাকুরতা পরিবার আজও রবীন্দ্রনাথের গানের শ্রেষ্ঠ তীর্থক্ষেত্র। সেখানে গান শিখতে ঢুকলে জীবনের পাঠও শেখা হয়ে যায়।
চূর্ণী যে ভাল রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে পারেন তার প্রমাণ আমরা পেলাম কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের 'ওয়ারিশ' ডেবিউ ছবিতে। ছবিতে চূর্ণী একজন ক্যানসার রোগী। যার একটি পুত্রসন্তান
আছে। কিন্তু সেই সন্তানের কোনও পিতৃপরিচয় নেই। বিয়ের আগেই এসেছিল এই অনাগত সন্তান। চূর্ণীর প্রেমিক সব্যসাচী চক্রবর্তী এখন দেবশ্রী রায়ের সঙ্গে সংসার করে। সেই বাড়িতেই এসে হাজির হয় ছেলে সমেত চূর্ণী। ক্যানসারে তার সময় ফুরিয়ে আসছে। তাই ছেলের দায়িত্ব সে তুলে দিতে চায় সব্যসাচীকে। সেই তো সন্তানের বাবা। চূর্ণীর শেষ অবস্থায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় সব্যসাচী। তখনই আবহে ভেসে আছে চূর্ণীর কণ্ঠে
'কেন তারার মালা গাঁথা,
কেন ফুলের শয়ন পাতা,
কেন দখিন-হাওয়া গোপন কথা জানায় কানে কানে?।
যদি প্রেম দিলে না প্রাণে।'
বহু দর্শক ভেবেছিল এ গান বোধহয় রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা গেয়েছেন। কিন্তু না! গানটি গেয়েছিলেন চূর্ণী। তিনি অভিনেত্রী রূপে যতটা দক্ষ, রবীন্দ্রনাথের গানেও তাঁর ততখানি দরদ। আর এই শিক্ষা চূর্ণী পেয়েছিলেন প্রথম যৌবনের রবিবারগুলিতে। অভিরূপ গুহঠাকুরতার স্নেহধন্যা চূর্ণী বড় অভিনেত্রী ও পরিচালক হয়েও আজও ভোলেননি শিক্ষাগুরুকে। গুরুর প্রয়াণে তাঁর চরণেই নিজেকে সমর্পণ করলেন চূর্ণী। পরলোক থেকেও তাঁর অভি কাকু নিশ্চয়ই আজ আশীর্বাদ করছেন।