পয়লা মার্চ, ১৯৮৬। প্রতি বৃহস্পতিবার রাত আটটায় বাংলার দর্শকদের জন্য শুরু হল প্রথম বাংলা সিরিয়াল ‘তেরো পার্বণ'। বাঙালির সান্ধ্য-জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ।

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 8 September 2025 19:31
তখন 'সিরিয়াল' শব্দটার সঙ্গে পরিচিত ছিল না মানুষ। 'সিরিয়াল' খায় না মাথায় মাখে তাই বুঝত না লোকে। কোনও প্রোডাকশন হাউসেরও সঠিক অর্থে ধারণা ছিল না সিরিয়াল তৈরি করলে কতটা লাভজনক ব্যবসা হতে পারে। বাংলা সিরিয়ালের পথিকৃত যদি কাউকে বলা যায় তিনি একমাত্র লেজেন্ড জোছন দস্তিদার। তাঁর হাত ধরেই বাংলা সিরিয়ালের (Bengali serial) জয়যাত্রা শুরু। সেই শুরু 'তেরো পার্বণ' ধারাবাহিক। আর সেই ধারাবাহিকে হিরো হয়ে এসেছিলেন গোরা-র চরিত্রে সব্যসাচী চক্রবর্তী। আজ সব্যসাচীর জন্মদিনে ফিরে দেখা তাঁর প্রথম পর্দায় অভিনীত চরিত্রের গল্প।
পয়লা মার্চ, ১৯৮৬। প্রতি বৃহস্পতিবার রাত আটটায় বাংলার দর্শকদের জন্য শুরু হল প্রথম বাংলা সিরিয়াল ‘তেরো পার্বণ'। বাঙালির সান্ধ্য-জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ।

'তেরো পার্বণ' এর ভাবনা ও পরিচালনা জোছন দস্তিদারের। অভিনয়ে জোছন দস্তিদারের স্ত্রী বিশিষ্ট অভিনেত্রী চন্দ্রা দস্তিদার, ইন্দ্রজিৎ দেব (তখন উনিও নবাগত), জয়শ্রী রায় (ইনি উত্তমকুমারের সঙ্গে 'সব্যসাচী' ছবিতে অভিনয় করেছিলেন পরে বাংলাদেশের নায়িকা হয়ে বাংলাদেশী পরিচালককে দ্বিতীয় বিবাহ করে হন জয়শ্রী কবির), আর ছিল 'তেরো পার্বণ'-এ একঝাঁক নতুন মুখ যারা আজকের সব স্টার।
সিরিয়ালের হিরো রূপে অবতীর্ণ হলেন গৌরব বা 'গোরা', যার প্রেমে পড়ে গেল গোটা বাংলা। গোরার চরিত্রে নবাগত সব্যসাচী চক্রবর্তী (Sabyasachi Chakraborty)।
কলকাতা থেকে এক মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবক আমেরিকায় গিয়েছে৷ সেখানে বছর দশেক কাটানোর পর আবার গোরা এই শহরে ফিরে আসছে৷ এই ফিরে আসার পরে সে যে শহরটাকে দেখছে, তাকে সে আগে চিনত না৷ তার চোখে শহরটা তখন সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে৷ সে তখন এই বদলের প্রতিটা বাঁককে আলাদা ভাবে আবিষ্কার করছে এবং পরতে পরতে নতুন ভাবে চিনছে প্রতিটি মানুষকে। এ ধরণের গল্প কিন্তু এ যুগের মেগা সিরিয়ালের মোটা দাগের গল্পের চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও শিক্ষিত রুচির দর্শকের কথা ভেবেই তৈরি হয়েছিল। অথচ 'তেরো পার্বণ' সব স্তরের দর্শককে ছুঁয়ে গিয়েছিল।

সুন্দর মুখের অভিনেতা না হয়েও যে স্মার্ট অভিনয়ের দ্বারা নায়ক হওয়া যায় তা প্রমাণ করলেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। তিনি ভাঙলেন তথাকথিত হিরোর লুক। 'গোরা' চরিত্র এতটাই জনপ্রিয় হয়ে গেল তাঁকে গোটা বাংলা 'গোরা' বলেই ডাকত। হারিয়ে গেল সব্যসাচী নামটা। যদিও 'তেরো পার্বণ'-এর পর সব্যসাচীকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
এই ধারাবাহিকের আরও এক জনপ্রিয় চরিত্র টিনা, ভূমিকায় খেয়ালি দস্তিদার। জোছন-চন্দ্রা কন্যা খেয়ালিকে প্রথম সিরিয়াল করেই অটোগ্রাফ দিয়ে বেড়াতে হত। আবার এই 'তেরো পার্বণ' ধারাবাহিকে গোরার ভাইঝির চরিত্রে অভিনয় করতে প্রথম যে টিনএজার অভিনেত্রী পর্দার সামনে দাঁড়ান তিনি ইন্দ্রাণী হালদার। ইন্দ্রাণী ও তাঁর ভাই ইন্দ্রনীল দুজনেই 'তেরো পার্বণ'-এ ভাইবোনের চরিত্র করেছিলেন। কয়েক বছর হল দীর্ঘ রোগভোগের পর ইন্দ্রনীল প্রয়াত।

সব্যসাচী নাটকের বাড়ির ছেলে। তাঁর মা ছিলেন নাটকের দাপুটে অভিনেত্রী মণিকা চক্রবর্তী।
সব্যসাচী প্রথমে কিন্তু ছিলেন 'তেরো পার্বণ'-এর টেকনিক্যাল ডিরেক্টর। সেখান থেকে জোছন দস্তিদার ও প্রযোজক শ্যামল সেনগুপ্ত সব্যসাচীকে নায়ক রূপে আনেন ছোট পর্দার সামনে। সব্যসাচী-খেয়ালীর গোরা-টিনা ছোট পর্দার জুটি হয়ে গেছিল সেসময়। যদিও বাস্তবে সব্যসাচী সম্পর্কে ছিলেন খেয়ালির তুতো দাদা।

'তেরো পার্বণ'-এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার। প্রথমে কথা ছিল ১৩ পর্বেই শেষ হবে ধারাবাহিক। কিন্তু জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে উঠল যে ৩৯ পর্ব দেখাতে বাধ্য হয় কলকাতা দূরদর্শন। তারপরও জনপ্রিয়তা এতটুকু কমেনি। পুনঃসম্প্রচারে থাকত এক চাহিদা। এরপর তো সোনেক্স 'এত টুকু বাসা', 'সেই সময়', 'নাচনি' কত বিখ্যাত ধারাবাহিক বানিয়েছে।
'তেরো পার্বণ' এর শেষ দৃশ্যে ছিল গোরা আবার আমেরিকা ফিরে যাচ্ছে। সেই দৃশ্য দেখে কেঁদে ভাসিয়েছিল সারা বাংলা। সব বাঙালির চোখে জল গোরার বিদায়ে। আজও পুরনো দিনের মানুষদের কাছে সব্যসাচী মানে ফেলুদা নয়, একমাত্র সেই গোরা।