বছরটা টলিপাড়ার জন্য যেন ছিল তীব্র দোলাচলের। কোথাও উত্তেজনার ঢেউ, কোথাও বিভাজনের চোরাস্রোত, আবার কোথাও জমাট তিক্ততার দাগ।

স্বরূপ বিশ্বাস ও সুজিত কুমার হাজরা।
শেষ আপডেট: 4 December 2025 11:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বছরটা টলিপাড়ার জন্য যেন ছিল তীব্র দোলাচলের। কোথাও উত্তেজনার ঢেউ, কোথাও বিভাজনের চোরাস্রোত, আবার কোথাও জমাট তিক্ততার দাগ।
ফেডারেশনকে কেন্দ্র করে একের পর এক বিতর্ক, কোর্ট-কাছারির দৌড়ঝাঁপ—সব মিলিয়ে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশে নেমেছিল এক অচেনা অস্বস্তি। শিল্পী থেকে টেকনিশিয়ান, সকলের মধ্যেই যেন সময় অদৃশ্য এক রেখা টেনে দিয়েছিল। কিন্তু বছরের অন্তিম প্রান্তে এসে সেই কালো মেঘ সরতে শুরু করেছে। শুটিং ফ্লোরে আবার ফিরছে একসুরে কাজের ছন্দ, ক্যামেরার পিছনের মানুষগুলোয় ফিরে আসছে পুরোনো বিশ্বাসের হাতধরা।
এই কঠিন সময়েও আশার আলো নিভে যায়নি। কাজের সময়সীমা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যেমন টেকনিশিয়ানদের স্বস্তি মিলেছে, তেমনই ছোটপর্দার কর্মীদের ৩০ শতাংশ এবং বড়পর্দার টেকনিশিয়ানদের ৩৩ শতাংশ পারিশ্রমিক বৃদ্ধি হয়েছে। উন্নত মানের পুষ্টিকর খাবার, প্রতিটি স্টুডিওতে সুশৃঙ্খল ক্যান্টিন, মহিলাদের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শৌচাগার—সব মিলিয়ে সিনেমার কর্মপরিবেশ যেন এক ধাপে মানবিক হয়েছে আরও। তার সঙ্গে স্বচ্ছতার স্বার্থে গঠিত হয়েছে একটি ত্রিপক্ষীয় কমিটি এবং একটি পৃথক পর্যবেক্ষণ কমিটি—যা এই পরিবর্তনের ভিতকে আরও শক্ত করেছে।
এই সব ইতিবাচকতার মাঝেই এল আর-একটা বড়সড় খবর। ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক সুজিত কুমার হাজরা জানালেন এক নতুন উদ্যোগের কথা—‘উৎকর্ষ সম্মান’। ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের ভাবনায় জন্ম নেওয়া এই প্রয়াস মূলত সেই সব কলাকুশলীদের মর্যাদা দিতে তৈরি, যাঁরা নীরবে দিনের পর দিন কাজ করে যান, অথচ আলোয় আসার সুযোগ পান না। সুজিতের কথায়, ফেডারেশন গঠিত হয়েছে মোট ২৭টি গিল্ডের সমন্বয়ে। সেই ২৭টি গিল্ডের মধ্যেই রয়েছেন অসংখ্য সিনেকর্মী, যাঁদের অবদান অসামান্য। তাঁদেরই যোগ্য সম্মান দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই প্রয়াস—যা পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম।
তিনি আরও বলেন, পরিচালনা, সহ-পরিচালনা কিংবা মেকআপের মতো বিভাগ এখন নানা পুরস্কার মঞ্চে প্রাপ্য স্বীকৃতি পেলেও আর্ট সেটিং থেকে লাইট সেটিং—এমন কত মানুষ রয়েছেন যাঁরা এখনও পাদপ্রদীপের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পাননি। তাঁদের সেই অন্ধকার থেকে তুলে আনতেই সভাপতির এই ভাবনা। ফেডারেশনের ৫৬ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনও উদ্যোগ নিয়ে গর্বিত হতে পারছে সংস্থা—এ কথাও জানালেন তিনি। ‘ফেডারেশন’ শব্দের অন্তর্নিহিত শক্তি—২৭টি গিল্ডের সঙ্ঘবদ্ধ একাগ্রতা, দৃঢ়তা আর বিশ্বাস—এই অনুষ্ঠান সেই অর্থকে জনসমক্ষে তুলে ধরবে।
সিনেমা, সিরিয়াল, ডকুমেন্টারি, শর্টফিল্ম, মাইক্রো ড্রামা, বিজ্ঞাপন কিংবা ইউটিউব—নিত্য নতুন সৃষ্টির নেপথ্যে যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেন, যাঁদের হাতেই তৈরি হয় পর্দার ম্যাজিক—তাঁদের সেই নিরলস পরিশ্রম ও সৃষ্টিশীলতার প্রতি সম্মানই হলো এই ‘উৎকর্ষ সম্মান’-এর মূল উদ্দেশ্য। সাধারণত পুরস্কারের তালিকায় সামনের সারির কয়েকটি গিল্ডই জায়গা পায়, কিন্তু এবার আলো এসে পড়বে সেই অর্ধ-অন্ধকারে থাকা মুখগুলোর ওপর—যাঁরা প্রদীপের তলায় থেকেও জ্বালিয়ে রাখেন শিল্পের আলো।
১৪ ডিসেম্বর টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতে আয়োজিত হবে এই বছরের সবচেয়ে ভিন্নধর্মী সন্ধ্যা—এক সন্ধ্যা, শুধুই পর্দার আড়ালে থাকা শ্রমিকদের জন্য উৎসর্গীকৃত।