কিছু মানুষ শুধুমাত্র জীবন কাটান না—ইতিহাস তৈরি করেন। তাঁদের মুখ, কণ্ঠ, দৃষ্টি আর হাঁটার ভঙ্গি ধীরে ধীরে মিশে যায় একটি জাতির স্মৃতির সঙ্গে। বাংলা সিনেমার জন্য তেমনই এক নাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

শেষ আপডেট: 19 January 2026 13:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কিছু মানুষ শুধুমাত্র জীবন কাটান না—ইতিহাস তৈরি করেন। তাঁদের মুখ, কণ্ঠ, দৃষ্টি আর হাঁটার ভঙ্গি ধীরে ধীরে মিশে যায় একটি জাতির স্মৃতির সঙ্গে। বাংলা সিনেমার জন্য তেমনই এক নাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন পর্দার মানুষ, অথচ তাঁর উপস্থিতি কখনও পর্দায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি ঢুকে পড়েছিলেন অনুভূতিতে, ব্যক্তিগত স্মৃতির অলিন্দে।
সিনেমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুরু হয়েছিল এমন এক ছবির মাধ্যমে, যা নিজেই বাংলা চলচ্চিত্রের মাইলফলক—‘অপুর সংসার’। তরুণ অপু চরিত্রে তাঁর অভিনয় যেন জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকেই পর্দায় তুলে এনেছিল। দারিদ্র্য, প্রেম, দায়িত্ব আর স্বপ্নের দ্বন্দ্বে দোল খাওয়া এক যুবকের গল্পে সৌমিত্র প্রথমবার প্রমাণ করেছিলেন, অভিনয় মানে জোরে সংলাপ বলা নয়—অভিনয় মানে চরিত্র হয়ে ওঠা। সেই ছবি থেকেই জন্ম নিয়েছিল বাংলা সিনেমার এক নতুন অধ্যায়।
এরপর একে-একে এল এমন সব ছবি, যা আজ কিংবদন্তি। ‘দেবী’ ছবিতে তিনি ধরা দিলেন এক দ্বিধাগ্রস্ত স্বামীর ভূমিকায়—যে বিশ্বাস আর যুক্তির মাঝে আটকে পড়ে নিজের কাছেই পরাজিত হয়। ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মানুষের অসহায় লড়াইকে তিনি যে গভীরতায় তুলে ধরেছিলেন, তা আজও দর্শককে কাঁপিয়ে দেয়। ঠিক তেমনই ‘তিন কন্যা’র গল্পে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দেখিয়েছিল, তিনি কত সহজে সাধারণ মানুষের আবেগকে পর্দায় রূপ দিতে পারেন।
‘চারুলতা’ ছবিতে অমল চরিত্রে সৌমিত্র যেন সত্যিই হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথের নায়ক। মাধবী মুখোপাধ্যায়ের বিপরীতে তাঁর চোখের ভাষা, সংযত অভিনয় আর ভেতরে লুকিয়ে থাকা অপ্রকাশিত আবেগ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল বাংলা সিনেমার সবচেয়ে সূক্ষ্ম প্রেমকাহিনিগুলোর একটি। একই রকমভাবে ‘কাপুরুষ’-এ তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন অপরাধবোধে দগ্ধ এক মানুষের অন্তর্দহন। প্রতিটি ছবিতে তিনি প্রমাণ করছিলেন—বড় অভিনেতা হতে গেলে চিৎকারের দরকার হয় না, দরকার হয় অনুভূতির।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মানেই যে কেবল গম্ভীর সাহিত্যধর্মী চরিত্র নয়, তা সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে ধরা পড়েছিল ফেলুদার ভূমিকায়। ‘সোনার কেল্লা’ এবং ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবিতে তাঁর অভিনীত ‘প্রদোষ মিত্র’ আজ বাঙালির কাছে প্রায় মিথের মতো। বুদ্ধিদীপ্ত, মার্জিত, তীক্ষ্ণ অথচ মানবিক—ফেলুদার যে চিরস্থায়ী রূপ আমাদের কল্পনায় গেঁথে আছে, তার পুরোটাই সৌমিত্রর অবদান। বইয়ের পাতার চরিত্রকে তিনি এমন জীবন্ত করে তুলেছিলেন যে আজও ফেলুদা বললেই প্রথম মনে পড়ে তাঁর মুখ।

শুধু সত্যজিৎ রায় নয়—অন্যান্য পরিচালকদের ছবিতেও তিনি সমান উজ্জ্বল। ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’-তে তাঁর উপস্থিতি ছিল সময়ের দলিলের মতো—যেখানে এক অস্থির সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল তাঁর চরিত্র। তপন সিংহের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এ তিনি আবার অন্যরকম—রহস্যময়, রোম্যান্টিক, অভিজাত। বিভিন্ন ধারার সিনেমায় নিজেকে ভেঙে গড়ার যে ক্ষমতা, তা খুব কম অভিনেতার মধ্যেই দেখা যায়।
‘অশনি সংকেত’ ছবিতে গ্রামীণ চিকিৎসকের ভূমিকায় তাঁর শান্ত অথচ দৃঢ় অভিনয় আজও মন ছুঁয়ে যায়। ‘গণশত্রু’-তে তিনি হয়ে ওঠেন যুক্তিবাদী প্রতিবাদের মুখ—যে অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। ‘ঘরে-বাইরে’ ছবিতে সন্দীপ চরিত্রে তাঁর তীক্ষ্ণ ও জটিল অভিনয় দেখিয়েছিল, নেতিবাচক ছায়াময় চরিত্রেও তিনি কতটা শক্তিশালী।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অভিনয় আরও গভীর, আরও পরিণত হয়েছে। নয়ের দশক এবং তার পরবর্তী সময়ে ‘দেখা’, ‘পদক্ষেপ’, ‘হুইলচেয়ার’-এর মতো ছবিতে তিনি প্রমাণ করেছেন—অভিনয়ের বয়স বাড়ে না, বরং তা অভিজ্ঞতায় আরও উজ্জ্বল হয়। জীবনের শেষ পর্বে এসে ‘বেলাশেষে’ ছবিতে তাঁর অভিনয় যেন হয়ে উঠেছিল সম্পর্কের এক জীবন্ত দলিল। দীর্ঘ দাম্পত্যের টানাপোড়েন, অভিমান, ভালবাসা—সবকিছু তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন অসম্ভব মমতায়।

নতুন শতাব্দীতেও তিনি থেমে থাকেননি। তরুণ পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন, নতুন ধরণের চরিত্র গ্রহণ করেছেন। ‘ময়ূরাক্ষী’ ছবিতে বৃদ্ধ বাবা হিসেবে তাঁর অভিনয় ছিল অসম্ভব রকমের সত্যি। ‘সাঁঝবাতি’ ছবিতে আবার ধরা দিলেন এক ভিন্ন মানবিক উষ্ণতায়। প্রতিটি চরিত্রে তিনি যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতেন।
এভাবেই গড়ে উঠেছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সিনেমার জগৎ—যেখানে একের পর এক ছবির ভেতর দিয়ে তৈরি হয়েছে এক বিরল অভিনয়-ঐতিহ্য। তিনি কখনও নায়ক, কখনও সাধারণ মানুষ, কখনও দার্শনিক, কখনও গোয়েন্দা—কিন্তু সব ভূমিকাতেই অদ্ভুত রকম বিশ্বাসযোগ্য। তাঁর অভিনয় কখনও আরোপিত মনে হয়নি; বরং মনে হয়েছে জীবনেরই প্রতিফলন।
আজ তিনি শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু রয়ে গিয়েছে তাঁর কণ্ঠ, তাঁর চোখের চাহনি, তাঁর উচ্চারণ, তাঁর নীরবতাও। রয়ে গেছে সেই সব ছবি, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেখে যাবে, ভালোবাসবে, আবিষ্কার করবে নতুন করে।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আসলে কোনও নির্দিষ্ট সময়ের অভিনেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন বাংলা সংস্কৃতির এক চলমান প্রতিষ্ঠান। তাঁর ছবিগুলো বিনোদন নয়—সেগুলো স্মৃতি, অনুভূতি আর ইতিহাসের মিশেল। যতদিন বাংলা সিনেমা থাকবে, যতদিন বাঙালি গল্প শুনতে ভালোবাসবে—ততদিন তিনি থাকবেন পর্দার ভেতর দিয়ে আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে।

পর্দা নামতে পারে, আলো নিভে যেতে পারে—কিন্তু কিছু মুখ কখনও হারিয়ে যায় না। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তেমনই এক অনন্ত উপস্থিতি। তিনি ছিলেন, আছেন, আর থেকে যাবেন—অপুর সহজ হাসিতে, অমলের নীরবতায়, ফেলুদার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। ঠিক যেন সিনেমার শেষ ফ্রেমের মতো—যেখানে গল্প শেষ হয়েও শেষ হয় না।