পোস্ট-প্যান্ডেমিক ধাক্কায় টালমাটাল হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্প বহুদিন ধরেই খুঁজছিল এক অলৌকিক সমাধান—এমন এক সর্বগ্রাসী ব্লকবাস্টার, যা থিয়েটারের আসন ভরাবে, দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনবে, আর বলিউডকে আবার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দুতে বসাবে।

শেষ আপডেট: 27 March 2026 19:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পোস্ট-প্যান্ডেমিক ধাক্কায় টালমাটাল হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্প বহুদিন ধরেই খুঁজছিল এক অলৌকিক সমাধান—এমন এক সর্বগ্রাসী ব্লকবাস্টার, যা থিয়েটারের আসন ভরাবে, দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনবে, আর বলিউডকে আবার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দুতে বসাবে। সেই প্রেক্ষাপটে ‘ধুরন্ধর’ ফ্র্যাঞ্চাইজির বক্স অফিস সাফল্য প্রথম দর্শনে যেন ঠিক সেই কাঙ্ক্ষিত টনিক। কিন্তু এই সাফল্যকে যদি গোটা ইন্ডাস্ট্রির পুনর্জাগরণ বলে ধরা হয়, তবে তা বর্তমান দর্শক-মানসিকতা ও শিল্পের ভঙ্গুর কাঠামো—দুটোকেই ভুল বোঝা হবে।
অস্বীকার করার উপায় নেই, ‘ধুরন্ধর’ যা করেছে, তা হল বিস্ফোরণ। মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই ‘ধুরন্ধর ২’ বিশ্বজুড়ে প্রায় ₹১,০০৭.৭৫ কোটির ব্যবসা করে ফেলেছে। আরও কয়েক দিনের মধ্যেই প্রথম ছবির ₹১,৩০৭.৩৫ কোটির লাইফটাইম কালেকশন ছাপিয়ে যাওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে।
পরিচালক আদিত্য ধরের এই ছবির দাপুটে পারফরম্যান্স—ওপেনিং উইকেন্ড থেকে ধারাবাহিক আয়—অনেক ক্ষেত্রেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে অতীতের প্রতিষ্ঠিত ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলির রেকর্ড। ‘এক থা টাইগার’, ‘স্ত্রী’, ‘গদর’, ‘ভুলভুলাইয়া’, ‘সিংহম’, ‘ধুম’—প্রতিটিই নিজ নিজ সময়ে বলিউডের অর্থনীতি ও দর্শক রুচিকে সংজ্ঞায়িত করেছে। ২০০০-এর দশকে ‘ধুম’ ফ্র্যাঞ্চাইজির নতুন ভাষা তৈরি করেছিল, ২০১০-এর দশকে ‘সিংহম’ ও ‘এক থা টাইগার’ তারকা-কেন্দ্রিক ম্যাস এন্টারটেইনারকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল, আর পরবর্তীতে ‘স্ত্রী’ ও ‘ভুলভুলাইয়া’ দেখিয়েছিল মাঝারি বাজেটের কনসেপ্ট-চালিত ছবিও কতটা সফল হতে পারে। ‘গদর’-এর সিক্যুয়েল আবার প্রমাণ করেছে নস্টালজিয়ার শক্তি কতটা গভীর।
এই সব ধারার এক অদ্ভুত মিশ্রণ যেন ‘ধুরন্ধর’। এখানে আছে রোহিত শেট্টি বা যশরাজ ফিল্মসের অ্যাকশন ঘরানার মাংসলতা, আবার আছে ‘স্ত্রী’-র মতো কনসেপ্ট-চালিত গল্প বলার ধারা। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একেবারে নতুন যুগের মার্কেটিং কৌশল—প্যান-ইন্ডিয়া ব্র্যান্ডিং, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আক্রমণাত্মক প্রচার, আর ছবিকে ঘিরে এক ‘ইভেন্ট’ তৈরির পরিকল্পনা—যা পুরনো ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো পুরোপুরি ধরতে পারেনি।
স্বাভাবিকভাবেই, ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই এই সাফল্যকে মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন। আল্লু অর্জুন, বিজয় দেবরাকোন্ডা, প্রীতি জিন্টা থেকে প্রিয়দর্শন বা রাম গোপাল বর্মা—প্রায় সবাই প্রকাশ্যে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’-কে। রাম গোপাল ভার্মা তো এক ধাপ এগিয়ে লিখেছেন, এই ছবি দেখার পর তিনি যেন নিজের পুরনো কাজ মুছে ফেলে নতুন করে শুরু করতে চান। তাঁর কথায়, ‘গডফাদার’ যদি এতদিন মানদণ্ড হয়ে থাকে, তবে ‘ধুরন্ধর ২’ যেন তারও ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছে—নির্মাণশৈলী, গল্প বলার ভঙ্গি, চরিত্র নির্মাণ, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, আবেগের বিন্যাস বা অ্যাকশন—সব দিক থেকেই।
তিনি আরও সতর্ক করেছেন, যে কোনও নির্মাতা বা তারকার পক্ষে এই ছবিকে গুরুত্ব না দেওয়া আত্মঘাতী ভুল হবে। তাঁর মতে, ১৯ মার্চ ২০২৬-এ পুরনো সিনেমাটিক বিশ্বাসগুলো কার্যত ভেঙে পড়েছে—এখনও যদি কেউ সেই পুরনো পথে হাঁটতে চান, তবে তাদের অস্তিত্বই বিপন্ন।
অন্যদিকে, প্রদর্শক অক্ষয় রাঠির বক্তব্য—দর্শক সিনেমা ছেড়ে যায়নি, তারা কেবল মাঝারি মানের কাজকে প্রত্যাখ্যান করছে। করণ জোহরও একই সুরে বলেছেন, ভবিষ্যতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখবে মূলত ‘ইভেন্ট ফিল্ম’। ইন্ডাস্ট্রির ভিতরে এই ধারণাই এখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে—দর্শক থিয়েটারে আসবে, কিন্তু শুধুমাত্র তখনই, যখন ছবিটি বড় পর্দার অভিজ্ঞতাকে ন্যায্যতা দিতে পারে।
কিন্তু এখানেই প্রশ্ন উঠছে। এই সাফল্যের উল্লাসের আড়ালে কি লুকিয়ে আছে অন্য বাস্তবতা? ‘ধুরন্ধর’ আসলে যেন বলিউডের ভেতরের এক গভীর বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে—একদিকে বিশাল বাজেটের ইভেন্ট ফিল্ম, অন্যদিকে বাকি সব। যে বাজার একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে হাজার কোটির ক্লাবে পৌঁছে দেয়, সেই বাজারেই মাঝারি বাজেটের গল্পভিত্তিক সিনেমা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় ‘স্ত্রী’ বা ‘ভুলভুলাইয়া’ যে মধ্যপথের সম্ভাবনা দেখিয়েছিল, তা আজ যেন সংকুচিত।
ইন্ডাস্ট্রির ভেতর থেকেও সতর্কতার সুর শোনা যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন, একটি ব্লকবাস্টার কোনও ট্রেন্ড তৈরি করে না। পুরো বছরের ছবি তালিকার দিকে তাকালে এখনও সেই ধারাবাহিকতা দেখা যায় না। প্রযোজকরাও স্বীকার করছেন, বাড়তি প্রোডাকশন ও মার্কেটিং খরচের যুগে লাভ করতে গেলে প্রায় ‘ইভেন্ট’ হওয়াই একমাত্র পথ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘ধুরন্ধর’ হয়তো পুনর্জাগরণের প্রতীক নয়, বরং এক বিরল ব্যতিক্রম।
পুরনো সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে ছবিটা আরও পরিষ্কার হয়। ‘ধুম’ বা ‘সিংহম’-এর সময় থিয়েটারই ছিল প্রধান মাধ্যম, দর্শকের অভ্যাসও ছিল নিয়মিত সিনেমা দেখা। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম দর্শকদের ঘরে বসেই বৈচিত্র্য ও স্বাচ্ছন্দ্যের অভ্যাস তৈরি করেছে। ফলে বড় পর্দায় যাওয়ার মানদণ্ড অনেক উঁচু। ‘ধুরন্ধর’ সেই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ—কিন্তু বেশিরভাগ ছবিই পারে না।
এর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক দিকটাও গুরুত্বপূর্ণ। ‘ধুরন্ধর’ এমন এক সময়ের আবহকে ধরেছে, যেখানে জাতীয়তাবাদ, ভিজ্যুয়াল স্পেকট্যাকল আর নায়কোচিত ভাবমূর্তি একসঙ্গে কাজ করছে। ফলে ছবিটি শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, সামাজিক আলোচনার অংশও হয়ে উঠেছে। সংলাপ, ভিজ্যুয়াল, চরিত্র—সবই ছড়িয়ে পড়েছে জনমনে। এই প্রভাব একসময় ‘গদর’ বা ‘ধুম’-এর ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এটাই কি সত্যিকারের টার্নিং পয়েন্ট? একটি প্রকৃত পরিবর্তন মানে নতুন গল্প বলার ধারা, আয়ের নতুন পথ, বা দর্শকের নতুন ভিত্তি তৈরি হওয়া। ‘ধুরন্ধর’ সেই পরিবর্তন আনে না; বরং আগে থেকেই চলা এক প্রবণতাকে আরও তীব্র করে—বড় বাজি, বড় ঝুঁকি, আর বড় পুরস্কার।
আসলে প্রকৃত পুনরুদ্ধারের লক্ষণ একক সাফল্যে নয়, বিস্তারে। নানা বাজেট ও ঘরানার ছবি কি সমানভাবে দর্শক পাচ্ছে? নতুন নির্মাতারা কি উঠে আসছে? সারা বছর জুড়ে কি থিয়েটারের ব্যবসা স্থিতিশীল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
সেই অর্থে ‘ধুরন্ধর’ একসঙ্গে সাফল্য ও সতর্কবার্তা—দু’টোরই প্রতীক। এটি প্রমাণ করে, বলিউড এখনও এমন সিনেমা বানাতে পারে যা জনতার মন জয় করে। কিন্তু এটাও মনে করিয়ে দেয়, পুরো ইন্ডাস্ট্রি যদি কেবল এই ধরনের ছবির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে সেই ভিত্তি কতটা টেকসই?
আজ ‘ধুরন্ধর’ হয়তো নতুন যুগের ‘ধুম’, ‘সিংহম’ বা ‘এক থা টাইগার’-এর সারিতে জায়গা করে নিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়—এ কি সত্যিই এক নতুন সূচনা, নাকি কেবলই এক বিরল বিস্ময়, যাকে আমরা ভুল করে বিপ্লব বলে ভাবছি?