আজ প্রতিশ্রুতির দিন। ক্যালেন্ডারের পাতায় একটুখানি চিহ্ন মাত্র। বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ, কিন্তু মনের ভেতর যেন অদ্ভুত আলোড়ন তোলে এমন এক দিন।

শেষ আপডেট: 11 February 2026 14:58
আজ প্রতিশ্রুতির দিন। ক্যালেন্ডারের পাতায় একটুখানি চিহ্ন মাত্র। বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ, কিন্তু মনের ভেতর যেন অদ্ভুত আলোড়ন তোলে এমন এক দিন। কথা দেওয়ার দিন। হাতে হাত রেখে বলার দিন—থাকব, ফিরব, ভোলাব না। কথা দেওয়ার দিন। কথা বিশ্বাস করার দিন। অথচ সেই বিশ্বাসের ভিতরেই লুকিয়ে থাকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের দীর্ঘশ্বাস—“কেউ কথা রাখেনি”। (promise day, debasree roy, kotha dilam, asha bhosle, Kishore Kumar, Mithun Chakraborty)
সত্যিই তো, কত প্রতিশ্রুতি মাঝপথে থেমে যায়। কিছু ভেঙে পড়ে অভিমানের ভারে, কিছু হারিয়ে যায় চুপচাপ সময়ের চাপে। তবু আশ্চর্যভাবে সবকিছুর মাঝেও থেকে যায় কিছু মানুষ, কিছু সম্পর্ক, যারা নিঃশব্দে সত্যি সত্যিই কথা রাখে। প্রেমের এই বিশেষ সপ্তাহে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে—অনেকেই তাঁদের দেওয়া অঙ্গীকার সত্যি করেছেন, প্রচার ছাড়াই, আড়ালেই, কিন্তু অকপটে।
এই আবহেই যদি সুরের আশ্রয় নেওয়া হয়, বাংলা গানের ভাণ্ডার যেন নিজে থেকেই খুলে যায়। প্রথমেই ভেসে ওঠে এক আক্ষেপভরা গান—‘কথা দিয়ে এলে না’। অ্যালবামের সেই সৃষ্টিতে কণ্ঠে আশা ভোঁসলে, সুরে আর. ডি. বর্মণ, আর গানের কথায় গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। প্রতিশ্রুতি ভাঙার ব্যথাকে এত কোমল অথচ গভীরভাবে যে বলা যায়, তার অনন্য উদাহরণ।
তারপরই উঠে আসে রূপোলি পর্দা। ১৯৮২ সালের ছবি ‘ত্রয়ী’। সেখানে ‘কথা হয়েছিল’ গানটি যেন বন্ধুত্ব আর প্রেমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক অপ্রকাশিত অঙ্গীকার। আবারও কণ্ঠে আশা ভোঁসলে, সুরে আর. ডি. বর্মণ, আর কথায় স্বপন চক্রবর্তী। যে প্রতিশ্রুতি বলা হয়েছিল, কিন্তু পূরণ হয়নি—তারই সুরেলা প্রতিধ্বনি এই গান।
আবার ১৯৮৮ সালে ‘সুরের আকাশে’ ছবিতে শোনা গেল ‘কথা দিলাম আমি কথা দিলাম’। কিশোর কুমার ও আশা ভোঁসলের যুগল কণ্ঠে সেখানে প্রতিশ্রুতি যেন ঘোষণা হয়ে ওঠে—ভালোবাসার সামনে আর কোনও সংশয় নেই। স্বপন চক্রবর্তীর সুরেও সেই অঙ্গীকার।
একটি গান অ্যালবামের, দু’টি বাংলা ছবির অমলিন অধ্যায়। কিন্তু তিনটির মধ্যেই বারবার ফিরে আসে একটি শব্দ—‘কথা’। কখনও সে কথা রাখা হয়নি, কখনও হওয়ার কথা ছিল, কখনও দৃঢ়ভাবে দেওয়া হয়েছিল। শব্দটি যেন আলাদা আলাদা সুরে একই অনুভূতির নানা রূপ।
‘ত্রয়ী’ ও ‘সুরের আকাশে’—দুটিতেই পর্দায় ছিলেন দেবশ্রী রায়। আজ, যখন চারপাশে প্রতিশ্রুতির কথা উঠছে, সেই সময়ের স্মৃতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠেও ফিরে আসে আবেগের কথা।
দেবশ্রী রায় বললেন, “প্রত্যেকটি প্রতিশ্রুতির গান। তখন অঙ্গীকারের অর্থ সত্যিই অঙ্গীকার ছিল। এখন সেটা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এখন যেন তার কোনও দাম নেই। ‘কথা দিলাম’ মানে আমরা সারাজীবন একসঙ্গে থাকব—এই ছিল অর্থ। আর ‘কথা হয়েছিল’—তোমার আসার কথা ছিল, তুমি এলে না। কেন এলে না, সেটাই বোঝা যায় না। দু’রকমের গান—একটা দেওয়া অঙ্গীকার, আর একটা অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি।”
তিনি থেমে আবার বললেন, “অনেক মানুষ আমাকে কথা দিয়েছে, রাখেনি। অনেকবার এমন হয়েছে। বোধহয় প্রত্যেক মানুষের জীবনেই এটা ঘটে। কিন্তু উল্টো দিক থেকে দেখলে—আমি যাঁদের কথা দিয়েছি, তার গুরুত্ব বুঝেছি এবং রাখার চেষ্টা করেছি। সেটা পেশাগত হোক বা ব্যক্তিগত। যদি কোনও দুর্ঘটনা বা অঘটন ঘটে, তা হলে আলাদা কথা। কিন্তু কেন রাখতে পারলাম না, সেটা আমি বুঝিয়ে বলেছি। কাজের সময় আমি সিনিয়র শিল্পীদের যে কমিটমেন্ট দেখেছি, তাঁদের থেকে শিখেছি। তাঁদের দেখেই বড় হয়েছি। আমার মায়ের উপদেশ ছিল—কথা দেওয়া মানে কথা রাখা। অন্যথা চলবে না।”
দেবশ্রীর কথায় স্পষ্ট, প্রতিশ্রুতি তাঁর কাছে শুধু সংলাপ নয়, জীবনদর্শন। তিনি জানালেন, এই দু’টি গান তিনি আজও লুপে শোনেন। স্টেজে উঠলে, এই গান না গেয়ে নামতে পারেন না। ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা জড়িয়ে আছে গানগুলোয়।
আজকের প্রজন্মের প্রতিশ্রুতি উদ্যাপন নিয়ে তাঁর ভাবনা? অভিনেত্রী সোজাসাপটা বললেন, “ওরা অনেক কিছুই খুব হালকাভাবে নেয়। খুব গভীরে যায় না। কেউ তাদের কথায় আঘাত পেতে পারে—সেটা বুঝতে চায় না। আমার মনে হয়, একটা ইনসিকিওরিটি কাজ করে। আর অস্থিরতা। প্রতিশ্রুতি তো অনেক দূরের কথা।”
কথা রাখা যায় না—এ কথা জেনেও মানুষ আবার বিশ্বাস করে। কারণ মানুষ বাঁচে সেইসব গল্পে, যেখানে কেউ না কেউ শেষ পর্যন্ত কথা রাখে। আজকের দিনে তাই গানগুলো আবার শোনা যায়। মনে হয়, প্রতিটি সুর কানে কানে মনে করিয়ে দেয়—প্রতিশ্রুতি ভাঙার যন্ত্রণা যেমন গভীর, তেমনই তা রক্ষা করার সৌন্দর্যও অসীম। হয়তো সেই সৌন্দর্যই প্রেমকে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছে।