বাংলাদেশের পদক্ষেপ নিখুঁত না হলেও একেবারে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার মতোও নয়। ক্রিকেট যদি সত্যিই গ্লোবাল খেলা হতে চায়, তাহলে শুধু ‘নিয়ম’ নয়—‘সংবেদনশীলতাকে’ও জায়গা দিতে হবে।

ভারত বনাম বাংলাদেশ
শেষ আপডেট: 23 January 2026 17:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: টি-২০ বিশ্বকাপ ২০২৬ (T20 World Cup 2026) ঘিরে বিতর্কটা আপাতদৃষ্টিতে ক্রিকেটীয়। কিন্তু একটু গভীরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটা শুধুই সূচি, ভেন্যু বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার প্রশ্ন নয়। বাংলাদেশের (Bangladesh) অবস্থানকে ‘রাজনৈতিক’, ‘অযৌক্তিক’ বা ‘অতিরিক্ত সতর্কতা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যত সহজ, বাস্তব ততটা সরল নয়। সওয়ালটা তাই খুব সোজা—বাংলাদেশ যা বলছে, তা কি একেবারেই অগ্রহণীয়?
বাংলাদেশ তাদের ম্যাচ ভারত (India) থেকে শ্রীলঙ্কায় (Sri Lanka) সরানোর আবেদন জানিয়েছিল। আইসিসি (ICC) খারিজ করেছে। যুক্তি—‘কোনও বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা হুমকি নেই!’ আর এত কাছাকাছি সময়ে ময়দান বদলালে বিপজ্জনক নজির তৈরি হবে। কাগজে-কলমে যুক্তিগুলো নিখুঁত। কিন্তু ক্রিকেট তো শুধু কাগজের খেলা নয়। ফলে সংকট আরও জটিল হয়েছে।
মুস্তাফিজুর থেকে শুরু হওয়া অস্বস্তি
বাংলাদেশের অস্বস্তির সূত্রপাত কোনও বায়বীয় আশঙ্কা থেকে নয়। শুরুটা হয়েছিল একেবারে বাস্তব ঘটনায়—মুস্তাফিজুর রহমান (Mustafizur Rahman) সংক্রান্ত আইপিএল (IPL) পর্বে। জানুয়ারির শুরুতে কলকাতা নাইট রাইডার্স (Kolkata Knight Riders) তাঁকে ছেড়ে দেয়। কারণ হিসেবে সরাসরি ‘নিরাপত্তা’ বলা না হলেও, ভারতীয় রাজনীতির চাপ, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে অস্বস্তিকর, তা অস্বীকার করা কঠিন। একজন চুক্তিবদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার যদি রাজনৈতিক হাওয়ার চাপে ‘অপ্রয়োজনীয়’ হয়ে ওঠেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—একটা গোটা জাতীয় দল, সঙ্গে সাপোর্ট স্টাফ, সাংবাদিক আর সমর্থকদের নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ কেন নিশ্চিন্ত থাকবে?
এই জায়গাতেই আসল অভিযোগ। মুস্তাফিজুর ইস্যুর পর ভারত বা বিসিসিআইয়ের (BCCI) তরফে প্রকাশ্য আশ্বাস আসেনি। কোনো বিবৃতি নয়, বার্তা নয়—এক অদ্ভুত নীরবতা! যা সন্দেহের বীজ বপন করেছে।
আইসিসি বনাম বাংলাদেশ
আইসিসির বক্তব্য পরিষ্কার—একটা ঘরোয়া লিগের ঘটনা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের সঙ্গে যুক্ত করা ভুল। তাদের ভাষায়, এটা ‘বিচ্ছিন্ন ও অপ্রাসঙ্গিক ঘটনা’। কিন্তু বাংলাদেশের চোখে সামগ্রিক বিষয় প্রতীকী। বিসিবি পরিচালক ফারুক আহমেদ (Faruque Ahmed) বলেছেন, ‘একজন ক্রিকেটারের মর্যাদায় আঘাত মানে গোটা দেশের মর্যাদায় আঘাত।’ এই অনুভূতি সংখ্যায় মাপা যায় না। কোনও সিকিউরিটি রিপোর্টে ধরা পড়ে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বাংলাদেশ সরকার সরাসরি এই সিদ্ধান্তে যুক্ত। ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল (Asif Nazrul) স্পষ্ট বলেছেন, নিরাপত্তা কোনও তাত্ত্বিক বিষয় নয়। মুস্তাফিজুরের ঘটনাই তার প্রমাণ। আইসিসি নিরাপত্তা দেবে—এই যুক্তির জবাবে পাল্টা বক্তব্য, ‘আইসিসি কোনও দেশ নয়। নিরাপত্তা তো নিশ্চিত করবে সেই দেশের পুলিশ ও প্রশাসন।’ এই ধাঁধার উত্তর আইসিসির কাছে নেই।
দ্বিচারিতার অভিযোগ কি একেবারে অমূলক?
আরও একটা জায়গায় বাংলাদেশের সওয়াল স্বাভাবিক। ভারত নিজে পাকিস্তানে (Pakistan) খেলতে যায় না। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি (Champions Trophy) হোক বা অন্য ইভেন্ট—হাইব্রিড মডেলেই খেলে। পাকিস্তানও ভারত আসবে না ধরে নিয়েই সূচি বানায়। তাই বাংলাদেশ যদি বলে, ‘আমরাও নিরপেক্ষ ভেন্যু চাই’, সেটা কি ‘অ-ভূতপূর্ব’ দাবি? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে পরের প্রশ্ন: শুধু ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নে এক পক্ষের দাবি বেশি গুরুত্ব পায় কেন?
আইসিসি অবশ্যই নজির তৈরি করতে অনিচ্ছুক। কিন্তু প্রশাসনের কাজ শুধু নিয়ম মানা নয়—পরিস্থিতি বোঝাও দায়িত্বের আওতায় পড়ে। বাংলাদেশের বক্তব্যে রাজনীতি থাকতে পারে, কিন্তু উদ্বেগ পুরোপুরি কল্পিত নয়। দিনান্তে এটা ভারত নিরাপদ কি না—প্রশ্ন নয়। সওয়ালটা বিশ্বাসের। মুস্তাফিজুর পর্বে সেই বিশ্বাসে চিড় ধরেছে। যা মেরামত না করে সামনে পা বাড়ালে সংঘাত অনিবার্য।
বাংলাদেশের পদক্ষেপ নিখুঁত না হলেও একেবারে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার মতোও নয়। ক্রিকেট যদি সত্যিই গ্লোবাল খেলা হতে চায়, তাহলে শুধু ‘নিয়ম’ নয়—‘সংবেদনশীলতাকে’ও জায়গা দিতে হবে। নইলে এই বিশ্বকাপ-বিতর্ক ভবিষ্যতের আরও বড় ফাটলের ইন্ধন জোগাবে।