হিন্দু ক্রিকেটারের স্বল্পতা নিছক পরিসংখ্যান নয়—এটা বাংলাদেশের সামাজিক সংকটের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। যদি এখনই সচেতন পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই ‘সংখ্যালঘুতা’ অতি দ্রুত ‘সংখ্যাহীনতা’য় পৌঁছবে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 5 September 2025 18:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মিরপুরে গ্যালারির গর্জন, বিশ্বকাপে হেভিওয়েট টিমকে নাস্তানাবুদ করে চমকপ্রদ জয় কিংবা ব্যস্ত গলির একচিলতে কোণে ব্যাট–বল হাতে ছেলেমেয়েদের হইচই—টুকরো টুকরো ছবিগুলো বলে দেয়, বাংলাদেশে ক্রিকেট নিছক খেলা নয়, আসলে জাতিসত্তার প্রতীক।
অথচ এই আবেগের ময়দানেই রয়ে যায় প্রকট অস্বস্তি। খোঁচা মারে জাতীয় দলে হিন্দু ক্রিকেটারের অনুপস্থিতি। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীতে হাতেগোনা কিছু নাম—অলোক কাপালি, তাপস বৈশ্য, রনি তালুকদার, সৌম্য সরকার, লিটন দাস। এর বাইরে তালিকাটা কার্যত শূন্য। বর্তমানে জাতীয় দলে নিয়মিত মুখ বলতে কেবল লিটন আর সৌম্য। প্রশ্ন তোলাটা তাই জরুরি—জনসংখ্যার অনুপাতে কেন বাংলাদেশ ক্রিকেটে সংখ্যালঘুদের প্রতিফলন এত কম?
আসলে হিন্দু সম্প্রদায় যে-দেশে স্বাধীনতার সময় ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৩.৫ শতাংশ, ধাপে ধাপে কমতে কমতে আজ তা নেমে এসেছে ৮ শতাংশেরও নিচে। এই সামাজিক বাস্তবতার সরাসরি প্রতিফলন ক্রিকেটেও পড়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে জাতীয় দলে হিন্দু ক্রিকেটারের উপস্থিতি নগণ্য। অথচ ঘরোয়া ক্রিকেটে চিত্রটা আলাদা। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ বা ফার্স্ট ক্লাস টুর্নামেন্টে হিন্দু ক্রিকেটারের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। শান্তনু ঘোষ, বিপ্লব দাশ, অমিত মজুমদার—অনেকেই আছেন যাঁরা ঘরোয়া মঞ্চে দাপট দেখিয়েছেন। কিন্তু জাতীয় দলে ওঠার দরজাটা তাঁদের জন্য সবসময় তালাবন্দি! কেউ সুযোগ পাননি, কেউ পেয়ে টিকতে পারেননি।
এর পেছনে কারণ বহুস্তরীয়। পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা যার অন্যতম। গ্রামীণ বাংলাদেশে ক্রিকেট জনপ্রিয় হলেও সুযোগসুবিধা সীমিত। হিন্দু পরিবারে খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রবণতা কম। কারণ একটাই: তা আর্থিক নিশ্চয়তা দেয় না। সেখানে পড়াশোনা আর চাকরি তুলনায় নিরাপদ রাস্তা। ফলে প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই ক্রিকেটে কেরিয়ার গড়তে চেয়েও পিছিয়ে যান।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পক্ষপাতও দীর্ঘদিনের অভিযোগ। বাংলাদেশের ক্রিকেট রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে। নির্দিষ্ট লবি, বোর্ড রাজনীতি, নির্বাচকের ঘনিষ্ঠতা—সবই ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে ওঠে। এই জটিলতা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের খেলোয়াড়দের বাধা করে তোলে দ্বিগুণ। প্রতিভা সত্ত্বেও তাঁরা সুযোগের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারেন না।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মৌলবাদী চাপ। ২০২২ সালে মহালয়ার দিন ফেসবুক পোস্ট করেছিলেন আজন্ম কৃষ্ণভক্ত লিটন দাস। তাতেই উঠেছিল কটূক্তি, হুমকি, এমনকি তাঁকে দল থেকে বাদ দেওয়ার দাবিও। বোর্ড প্রকাশ্যে পাশে দাঁড়ায়নি, বরং চুপ থেকেছে। এই নীরবতাই আসলে ভয়াবহ বার্তা—একজন হিন্দু ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয়ও তাঁর কেরিয়ারের পথে প্রতিবন্ধক হতে পারে! এহেন দৃষ্টান্ত স্বাভাবিকভাবে নতুন প্রজন্মকে নিরুৎসাহ করে।
ইতিহাস বলছে, অলোক কাপালি বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু ক্রিকেটার যিনি টেস্টে হ্যাটট্রিক করেছিলেন। অথচ সেই সাফল্য তাঁকে কী দল? না পেলেন স্বীকৃতি, না দীর্ঘমেয়দি কেরিয়ার! নির্বাচকদের আস্থালাভে ব্যর্থ! তাপস বৈশ্য একসময় দলে ছিলেন, দ্রুত হারিয়ে যান। রনি তালুকদারের ২০১৫ সালে অভিষেকের পর আবার ফিরতে সময় লেগেছে আট বছর। আর সৌম্য সরকার—কিছুদিন নিয়মিত থাকলেও পারফরম্যান্সের ওঠানামায় পাকা জায়গা ধরে রাখতে পারেননি। এঁদের গুচ্ছ গুচ্ছ কাহিনি মিলিতভাবে একটাই ইঙ্গিত দেয়—হিন্দু ক্রিকেটারদের জন্য জাতীয় দলে সুযোগ বিচ্ছিন্ন, খণ্ডিত, অস্থায়ী।
এদিক দিয়ে লিটন দাসের সাফল্য ব্যতিক্রম হিসেবে উজ্জ্বল। দিনাজপুরের মফস্বল থেকে উঠে এসে ধারাবাহিক রান করে জাতীয় দলে নিজের জায়গা করেছেন। উইকেটকিপার-ব্যাটার হিসেবে তাঁর ভূমিকা এই মুহূর্তে প্রায় অপরিহার্য। কিন্তু তাঁকেও বারবার মৌলবাদের নিশানা হতে হয়েছে। একদিকে পারফরম্যান্সের দায়িত্ব, অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে অযথা চাপ—এই টানাপড়েন যেন ললাটলিপির মতোই অবধারিত, অপরিবর্তনীয়।
সমস্যার মূলে আরেকটি বড় বিষয় হল—বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা মিডিয়া কখনও খোলাখুলি এই ঘাটতি আর সংকট নিয়ে আলোচনা করেনি। বোর্ডের কোনও স্বচ্ছ পরিসংখ্যান নেই: কতজন হিন্দু ক্রিকেটার ঘরোয়া ময়দানে খেলেছেন। সচেতনতা তৈরি হয়নি। ফলে বৈষম্য চাপা থেকেছে। অথচ বাস্তব বলছে, জাতীয় দলে সংখ্যালঘুর উপস্থিতি আকস্মিক নয়, বরং এক অনুচ্চারিত কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতিফলন।
বাংলাদেশের সমাজে হিন্দু জনসংখ্যার ক্রমহ্রাসমান-এও এক অস্বীকৃত সত্য। সেই ছায়া পড়েছে ক্রিকেটে। মাঠে খেলা অন্তর্ভুক্তিমূলক হলেও মাঠের বাইরে মৌলবাদী হুমকি, সামাজিক অনিশ্চয়তা আর বোর্ড রাজনীতির জট বাইশ গজের যুদ্ধকে সংখ্যাগরিষ্ঠের দখলদারিতে পরিণত করছে।
প্রশ্ন উঠছে—এই প্রবণতা কি বদলানো সম্ভব? যদি সত্যিই বাংলাদেশ ক্রিকেটকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক করতে হয়, তবে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্বাচনে স্বচ্ছতা আনতে হবে, যাতে প্রতিভাই প্রধান হয়ে ওঠে, পক্ষপাত নয়। সংখ্যালঘু ক্রিকেটারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। মৌলবাদী চাপে বোর্ডের নীরবতা ভাঙতে হবে। গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায় পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন, যাতে সংখ্যালঘু পরিবারও সমান সুযোগ পায়।
বাংলাদেশ ক্রিকেট আজ বিশ্বমানের প্রতিপক্ষকে হারাতে পারে। সেই কাজটা কালেভদ্রে হলেও দলে প্রতিভার কমতি নেই। কিন্তু জাতীয় দলে সমাজের সর্বস্তরের প্রতিফলন অসম্পূর্ণ থাকলে সেই সাফল্য খণ্ডিত রয়ে যাবে। হিন্দু ক্রিকেটারের স্বল্পতা নিছক পরিসংখ্যান নয়—এটা বাংলাদেশের সামাজিক সংকটের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। যদি এখনই সচেতন পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই ‘সংখ্যালঘুতা’ অতি দ্রুত ‘সংখ্যাহীনতা’য় পৌঁছবে।