২০২৬ বিশ্বকাপ এখন আর শুধু ক্রিকেটের বিস্তারের গল্প নয়… শক্তির বিন্যাস বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত। অ্যাসোসিয়েট দল কি বড় দলের সঙ্গে লড়তে পারে?—এটা আর সওয়াল নয়। নেপাল, আমেরিকা, নেদারল্যান্ডস তার উত্তর দিয়ে দিয়েছে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 9 February 2026 16:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাঠে হিসেবটা দাঁড়িয়েছিল শেষ বলের অঙ্কে। কিন্তু মাথার ভেতর লড়াইটা অনেক পুরনো—পরিচিত তুলনা ডেভিড বনাম গোলিয়াথ!
রবিবার ওয়াংখেড়ে। ইংল্যান্ড (England) ১৮৪ রান ডিফেন্ড করছে নেপালের (Nepal) বিরুদ্ধে। শেষ বলে দরকার ছয়। বোলিংয়ে স্যাম কারান (Sam Curran)। ব্যাটে লোকেশ বাম (Lokesh Bam)। অপর প্রান্তে করণ কেসি (Karan KC)। স্টেডিয়ামজুড়ে টানটান উত্তেজনা, সমর্থকদের নিশ্বাস আটকে আসার উপক্রম।
বলটা যখন বাউন্ডারির বাইরে নয়, ডিপ কভারের হাতে গিয়ে থামল, স্কোরবোর্ড বলে দিল, ইংল্যান্ড জিতেছে চার রানে। কিন্তু শুধু তথ্যের কারবারি নন যাঁরা, ভেতরের গোপনতম সত্যকেও খোঁজেন, তাঁরা বুঝে যান, কিছু একটা বদলে গিয়েছে! ওই ছ’খানা বলেই টি–২০ বিশ্বকাপ আর শুধুই ফেভারিটদের টুর্নামেন্ট নেই, হয়ে উঠেছে ‘ডিসরাপশনে’র মঞ্চ!
‘মিনো’ তকমার অবসান
চলতি প্রতিযোগিতার প্রথম সপ্তাহ একটা পুরনো ধারণা ভেঙে দিয়েছে—আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর ‘মিনো’ দল বলে কোনও বস্তু নেই। যে কারণে নামিবিয়ার (Namibia) অধিনায়ক গেরহার্ড ইরাসমাস (Gerhard Erasmus) প্রকাশ্যেই বলে দিলেন, ‘অ্যাসোসিয়েট’ বা ‘মিনো’—এই ট্যাগ তুলে দেওয়ার সময় এসেছে! বিশ্বকাপে দশখানা অ্যাসোসিয়েট দেশ খেলছে। নেপাল, আমেরিকা (USA), নেদারল্যান্ডস (Netherlands)—এরা কেউই আর তারকাখচিত, বনেদি টিমের সামনে মাথা নিচু করে থাকতে নারাজ। কেউ হেরেছে একটা–দুটো ক্যাচ ফেলে, কেউ শেষ ওভারের অনবদ্য বোলিংয়ে, কেউ বা সূর্যকুমার যাদবের (Suryakumar Yadav) মতো ব্যাটারের স্পেশ্যাল পারফরম্যান্সে। কিন্তু ভয়? সেটা নেই। উধাও। পুরোপুরি উবে গিয়েছে।
নেপাল ইংল্যান্ডকে প্রায় হারিয়েই দিয়েছিল। আমেরিকা ভারতের (India) কাছে নত হয়েছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে। নেদারল্যান্ডস পাকিস্তানকে (Pakistan) এমন চাপে ফেলেছে, যে করাচি-লাহোরের সমর্থকদেরও হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছিল। ফল যা-ই হোক, দ্বৈরথ সেয়ানে-সেয়ানে!
নীরস নয়, শুধুই রোমাঞ্চ: গ্রুপ পর্ব এখন ‘মাস্ট-ওয়াচ’
ড্র ঘোষণার সময় অনেকেই কাঁধ ঝাঁকিয়েছিল। দশটা অ্যাসোসিয়েট দল? গ্রুপ ম্যাচ মানে তো বড় দলের নেট প্র্যাকটিস! বিশ্লেষকেরা হিসেব কষে রেখেছিলেন, ব্রডকাস্টাররা বড় কমেন্ট্রি টিম রেখেছিলেন নকআউটের জন্য, দর্শকেরাও সুপার এইটের দিকে তাকিয়ে।
ভাগ্যিস সবাই ভুল করেছিলেন!
যারা খেলা দেখেছে, তারা জানে, নেপাল বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচটা কোনও প্রস্তুতি ম্যাচ ছিল না—ছিল বিশুদ্ধ থ্রিলার। ওয়াংখেড়ে গর্জে উঠেছিল নকআউটের উন্মাদনায়। আমেরিকার বিরুদ্ধে ভারতের জয় কোনও ৩০০ রানের প্রদর্শনী নয়, হয়ে ওঠে সত্যিকারের অগ্নিপরীক্ষা। নেদারল্যান্ডস–পাকিস্তান ম্যাচে ছড়িয়ে পড়ে ‘হেরে গেলে বিদায়ে’র আতঙ্ক। বিশ্বকাপের প্রথম কটা ম্যাচ শুধু টুর্নামেন্টের যোগ্য বোধন ঘটায়নি, বৈদ্যুতিক চার্জ সঞ্চার করেছে! এখন গ্রুপ ম্যাচ মানেই নিশ্চিত বিনোদন। কারণ, কোনও কিছুই আর গ্যারান্টি নেই।
কেন টি–২০ এত বিপজ্জনক?
টি–২০ ক্রিকেট আসলে সবচেয়ে বড় ‘ডেমোক্রাটাইজার’। বিশ ওভার মানে এমন একটা পরিসর, যেখানে একজনের অসাধারণ পারফরম্যান্স পুরো হিসেবকেই উল্টে দিতে পারে। কেউ ৩৫ বলে ৭০ করলেই ম্যাচের রং বদলে যায়। বোলার দু’ওভারে চাপ তৈরি করলে অভিজ্ঞ ব্যাটিং লাইন–আপ দিশেহারা। টেস্টে পাঁচ দিনে জৌলুস বেরিয়ে আসে। ওয়ানডে-তে ৫০ ওভার ভ্যারিয়েশন মসৃণ করে। কিন্তু টি–২০ মানেই ভোলাটিলিটি। চারটা খারাপ ওভার, তিনটা ক্যাচ ফসকে যাওয়া, একজন ব্যাটারের হঠাৎ ফর্ম—সব মিলিয়ে দশকের পরিকাঠামোগত ফারাকও মুছে যেতে বাধ্য!
এই ব্যবধান আরও কমিয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ। আইপিএল (IPL), বিগ ব্যাশ (Big Bash), সিপিএল (CPL)—অ্যাসোসিয়েট দেশের ক্রিকেটাররা নিয়মিত খেলছেন বিশ্বের সেরা বোলার–ব্যাটারদের বিরুদ্ধে। ফলে ওয়াংখেড়ে যখন নেপালের ব্যাটাররা জোফ্রা আর্চারকে (Jofra Archer) তেড়ে হাঁকাচ্ছিল, কেউ ভয় পায়নি। ওই গতি, ওই লাইন-লেন্থ—সবই আগে দেখা।
ফুটবল বিশ্বকাপের ছায়া: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
ক্রিকেট এখন শিখছে, যা ফুটবল বহু আগেই জেনে ফেলেছে। বিশ্বমঞ্চ মানেই অঘটন। ২০২২–এ সৌদি আরব (Saudi Arabia) হারিয়েছিল আর্জেন্তিনাকে (Argentina)। ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়া (South Korea) ছিটকে দেয় জার্মানিকে (Germany)। ২০১৪–তে কোস্টা রিকার (Costa Rica) রূপকথা, ১৯৯০–এ রজার মিল্লার (Roger Milla) ক্যামেরুন—এই গল্পগুলোই বিশ্বকাপের প্রাণ।
কিন্তু সত্যি বলতে, টি–২০ ক্রিকেট ফুটবলের থেকেও বেশি অঘটন–প্রবণ। ১–০ এগিয়ে গেলে রক্ষণে জমাট বাঁধা যায়। টি–২০-তে ১৬০–১৭০ রান মানে অজস্র টার্নিং পয়েন্ট। একটা ইনিংস, একটা ওভার, একটা সিদ্ধান্ত—সবই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে।
এরপর কী?
২০২৬ বিশ্বকাপ এখন আর শুধু ক্রিকেটের বিস্তারের গল্প নয়… শক্তির বিন্যাস বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত। অ্যাসোসিয়েট দল কি বড় দলের সঙ্গে লড়তে পারে?—এটা আর সওয়াল নয়। নেপাল, আমেরিকা, নেদারল্যান্ডস তার উত্তর দিয়ে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই—প্রথম কোন অ্যাসোসিয়েট দল এই ট্রফি জিতবে? নির্ভীক ব্যাটিং, শক্তিশালী পরিকাঠামো, ধারাবাহিকতা—সব মিলিয়ে দিনটা খুব দূরে মনে হচ্ছে না। ফিরে তাকালে আমরা হয়তো বলে উঠব, ওয়াংখেড়েতে স্যাম কারানের সেই শেষ ওভারটাই ছিল বাঁকবদলের প্রথম মোড়, যেদিন ডেভিডরাই হয়ে উঠেছিল নতুন গোলিয়াথ।