শুনতে বিজ্ঞানসম্মত মনে হলেও ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট বিতর্কের ঊর্ধে নয়। সমালোচকদের যুক্তি—একজন তারকা খেলোয়াড় যদি বারবার বিশ্রামে থাকেন, তাহলে দর্শক-সমর্থকরা বঞ্চিত হন, ম্যাচের প্রতিযোগিতামূলক মান কমে যায়।

জসপ্রীত বুমরাহ
শেষ আপডেট: 10 August 2025 11:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক সময় ‘টেনিস এলবো’ শব্দবন্ধকে বিস্তর জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন শচিন তেন্ডুলকর। আসলে এক ধরনের চোটের নাম। যে কারণে দেশের প্রাক্তন ক্রিকেটারকে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকতে হয়। কিন্তু তাঁর আগে এমন শুনতে অদ্ভুত চোটের ধরনধারণ নিয়ে চর্চা জমেনি।
আজকাল জসপ্রীত বুমরাহকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে আরও একটি শব্দবন্ধ ‘ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট’। ফারাক দুটো। এক: এটা চোট নয়, বরং চোট-আঘাত সামলানোর দাওয়াই। দুই: আগেরটার মতো নির্বিষ নয়, ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট বেশ বিতর্কিত এবং চর্চাসাপেক্ষ ইস্যু।
চায়ের টেবিলে তুফান উঠছে, রকের আড্ডায় হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্তর শব্দব্যয় হচ্ছে। কিন্তু কাকে বলে ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট? কবে থেকে এর রমরমা শুরু?—এমন বেসিক প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর তর্কের বাদী-বিবাদী কোনও পক্ষই দিতে পারবেন বলে মনে হয় না। আমরা এই লেখায় ইস্যুটিকে সহজভাবে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করব।
একটা সময় ছিল, খুব বেশিদিন পুরনো নয়, কয়েক দশক আগে পর্যন্ত, ক্রিকেটারদের মাপা হত কেবল পারফরম্যান্সে—কে কটা উইকেট পেলেন, কে কত রান তুললেন, কে কত ওভার হাত ঘোরালেন—এসবের ভিত্তিতেই ভালমন্দ, সাফল্য-ব্যর্থতা মাপা চলত। এখন সেই সমীকরণে ঢুকে পড়েছে আরও এক অদৃশ্য পরিমাপক: শরীরের উপর চাপের পরিমাণ এবং তা সামলানোর বিজ্ঞান। যাকে এক কথায় বলা হচ্ছে ‘ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট’! সহজভাবে বললে, এর অর্থ: কোনও খেলোয়াড়ের শারীরিক ও মানসিক চাপ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাতে তাঁর পারফরম্যান্স দীর্ঘসময় ধরে ধারাবাহিক থাকে এবং চোট-আঘাতের ঝুঁকি অনেকখানি কমে যায়। এখানে ‘ওয়ার্কলোড’ বলতে বোঝানো হয় মোট চাপ—ম্যাচে খেলার সময়, অনুশীলন, ভ্রমণ, মানসিক ধকল। এমনকি ঘুমের মান ও ডায়েটের মাপও হিসেবের খাতায় যোগ হয়। অন্যদিকে ‘ম্যানেজমেন্ট’ মানে সেই চাপের ভারসাম্য রাখা—কোথাও কমানো, কোথাও বাড়ানো।
বস্তুত, গেল দশকে ক্রিকেটের গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়েছে তিন ফরম্যাটের ব্যস্ত সূচি। একসময় বছরে ৮-১০ টেস্ট খেলা খেলোয়াড়রা এখন প্রায় সারাবছর জুড়ে টেস্ট, ওয়ান ডে, টি-টোয়েন্টি, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে নামছেন। এর মধ্যে আইপিএল, বিগ ব্যাশ, সিপিএল, পিএসএল—সব মিলিয়ে একজন তারকা ক্রিকেটারকে বছরে ১০-১১ মাস মাঠে দেখা যায়।
এটা যে অবৈজ্ঞানিক, এভাবে যে চলতে দেওয়া যায় না—এই সত্য প্রথম বুঝতে পারে অস্ট্রেলিয়া। নব্বইয়ের দশকে সে দেশের ক্রিকেট বোর্ড প্রথমবার পেসারদের জন্য রোটেশন নীতি চালু করে। গ্লেন ম্যাকগ্রা, জেসন গিলেস্পির মতো বোলারদের বাছাই ম্যাচে খেলানো হত, যাতে তাঁদের টেস্ট ও বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে সতেজ রাখা যায়।
এর পর একুশ শতকে, যখন আইপিএল, বিগ ব্যাশ, ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগের মতো টুর্নামেন্টে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে পেশাদারি ম্যাচের সংখ্যা হু-হু করে বাড়তে শুরু করল, তখন ক্রিকেটারদের শরীরের চাপও সঙ্গত কারণে হয়ে গেল দ্বিগুণ! ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত—সবাই তখন ক্রীড়া-বিজ্ঞানীদের পরামর্শে পদ্ধতিগত চালু করল ‘ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট’। ২০১৫-১৬ থেকে প্রথমে অজিরা এবং তাদের দেখাদেখি ইংল্যান্ড, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা—শীর্ষ দলগুলো প্রথমে নিজেদের স্কোয়াডের মূল বোলারদের জন্য এই পদ্ধতি আরও ব্যাপকভাবে প্রণয়ন করে। অস্ট্রেলিয়ার প্যাট কামিন্স, ইংল্যান্ডের জোফরা আর্চার—তাঁরা যখন নিয়মিত চোটের কবলে পড়তে শুরু করেন, তখন শীর্ষ দেশের ক্রিকেট বোর্ডগুলি বুঝতে পারে—শুধু প্রতিভা কিংবা পরিশ্রম নয়, ক্রিকেটারদের সেরাটা বের করে আনতে শরীরকেও বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।
এখন দলের সাপোর্ট স্টাফে থাকেন স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট, ফিজিও, স্ট্রেংথ অ্যান্ড কন্ডিশনিং কোচ। তাঁদের কাজ খেলোয়াড়ের প্রতিটি ডেটা (যেমন: হৃদস্পন্দন, ঘুমের সময়, অনুশীলনের গতি ও তীব্রতা, আগের ম্যাচের পর পুনরুদ্ধারে কত ঘণ্টা লাগছে) ট্র্যাক করা। এই তথ্য থেকে হিসেব মেপে ঠিক করা হয়, কে কোন ম্যাচে খেলবেন আর কার বিশ্রাম প্রয়োজন।
জসপ্রীত বুমরাহ ভারতের সেরা পেসারদের একজন বলেই এই ইস্যুতে তিনি আলোচনায় উঠে এসেছেন। কেরিয়ারজুড়ে পিঠ ও হাঁটুর চোট বারবার তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিয়েছে। ২০২২ সালে পিঠের অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘসময় বাইরে ছিলেন। যে কারণে বোর্ড ও টিম ম্যানেজমেন্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—বুমরাহকে সব ম্যাচে নামানো হবে না। ফল—তেইশের বিশ্বকাপের আগে তাঁকে ধাপে ধাপে ফিরিয়ে আনা। এই শম্বুকগতির প্রত্যাবর্তন, নির্দিষ্ট সিরিজে বিশ্রাম—সবই ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের অংশ।
এই পদ্ধতির মূলত চার ধরনের উপযোগিতা রয়েছে:
১. চোট কমানো: সবচেয়ে বড় লাভ আঘাত প্রতিরোধ। অতিরিক্ত ওভার বোলিং করলে পেসারদের কাঁধ, কনুই, পিঠে চাপ পড়ে। ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট সেই চাপ সুষ্ঠুভাবে বন্টন করে দেয়।
২. পারফরম্যান্স ধরে রাখা: খেলোয়াড়রা বেশি সতেজ থাকলে গতি, ধার, প্রতিক্রিয়াশক্তি (ইমপ্যাক্ট) বজায় থাকে।
৩. দীর্ঘ কেরিয়ার: একটানা খেলে তাড়াতাড়ি ক্লান্ত হয়ে পড়া বা চোটের কবলে খেলোয়াড়জীবন ছোট হয়ে যাওয়া—এই ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
৪. মানসিক পুনরুজ্জীবন: সারাবছরের ক্রিকেট মানসিকভাবে ক্লান্তি আনে। সেখানে বিশ্রাম খেলোয়াড়কে নতুন করে প্রস্তুত করে তোলে।
শুনতে বিজ্ঞানসম্মত মনে হলেও ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট বিতর্কের ঊর্ধে নয়। সমালোচকদের যুক্তি—একজন তারকা খেলোয়াড় যদি বারবার বিশ্রামে থাকেন, তাহলে দর্শক-সমর্থকরা বঞ্চিত হন, ম্যাচের প্রতিযোগিতামূলক মান কমে যায়। বিশেষ করে ঘরের মাঠে বড় সিরিজে যদি বুমরাহ-ভারত বা স্টার্ক-অস্ট্রেলিয়া না খেলেন, অনুরাগীরা সঙ্গত কারণেই হতাশ হন!
আরেকটা দিক হল—সব ফরম্যাট খেলার ক্ষমতা ক্রিকেটারদের কাছে বরাবরই একটা শ্লাঘার বিষয়। ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট কখনও কখনও সেই বহুমুখিনতা সীমিত করে দেয়।
তৃতীয়ত, আইপিএল বা অন্যান্য লিগে খেলোয়াড়রা মোটা অঙ্কে চুক্তিবদ্ধ। ফ্র্যাঞ্চাইজি চায়: তাঁরা নিয়মিত খেলুন। কিন্তু জাতীয় দলের সাপোর্ট স্টাফের উদ্দেশ্য: সীমিত ম্যাচ খেলিয়ে ক্রিকেটারদের বড় টুর্নামেন্টের জন্য ফিট রাখা। এই দ্বন্দ্ব মাঝে মাঝে প্রকাশ্যে আসে, যেমন বুমরাহ বা আর্চারের ক্ষেত্রে হয়েছে।
টিম ইন্ডিয়ার বাৎসরিক সূচি এখন এমন যে, প্রায় প্রতি মাসে সিরিজ বা টুর্নামেন্ট লেগে রয়েছে। ফলে বুমরাহ, সামি, হার্দিক পান্ডিয়া—প্রধান বোলারদের জন্য রোটেশন অপরিহার্য। নির্বাচকরা তাই নির্দিষ্ট সিরিজে নবীন পেসারদের সুযোগ দেন, যাতে মূল বোলাররা বড় টুর্নামেন্টে সুস্থ-সবল ও সেরা ফর্মে থাকতে পারেন।
সুতরাং, ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট শুধু বিশ্রাম দেওয়ার কৌশল বা বিশ্রাম আদায়ের ছল—এমনটা ভাবা ভুল। এই পদ্ধতি আসলে খেলোয়াড়ের ‘কেরিয়ার বিনিয়োগ’। অনুরাগীরা যদি জসপ্রীত বুমরাহকে পনেরো বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেখতে চান, তার জন্য কিছু ম্যাচে তাঁকে না-দেখার যন্ত্রণা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে খেলোয়াড় যেন খেলায় অনুপস্থিতির কারণে দর্শকের সঙ্গে দূরত্ব না বাড়িয়ে ফেলেন এর জন্য ভারসাম্য থাকাও জরুরি।