শারীরবিদ্যা বলছে, মানুষের পায়ে পাঁচটি লম্বা হাড়। যেগুলিকে একত্রে মেটাটারসাল বলা হয়। এগুলি আঙুল ও গোড়ালির সংযোগ স্থাপন করে। আঘাত লাগলে, অতিরিক্ত ব্যবহারে কিংবা পায়ের গঠনে ত্রুটি থাকলেও এতে ফাটল বা ভাঙন ধরতে পারে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 24 July 2025 17:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শচিন তেন্ডুলকরের (Sachin Tendulkar) সৌজন্যে ‘টেনিস এলবো’ (Tennis Elbow) জাতে উঠেছিল। ঋষভ পন্থ (Rishabh Pant) পায়ে চোট পেয়ে ছিটকে গিয়ে ‘মেটাটারসাল ফ্র্যাকচার’কে (Metatarsal Fracture) আমজনতার দরবারে হাজির করলেন!
এমন নয়, যে এই প্রথম পায়ের বিশেষ জায়গাটিতে আঘাত পেলেন কোনও ক্রিকেটার। কিন্তু ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার দুঃস্বপ্ন পেরিয়ে এসেছেন যিনি, তাঁর আবার চোট পেয়ে মাঠের বাইরে চলে যাওয়াটা বড় খবর-ই বটে! ফলে মেটাটারসালকে নিয়ে ক্রিকেট অনুরাগীদের ঔৎসুক্য তৈরি হওয়াটা যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত।
চতুর্থ টেস্টের প্রথম দিন। ব্যাট হাতে চেনা ভঙ্গিতে ঝড় তোলার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন ঋষভ পন্থ (Rishabh Pant)। ইংল্যান্ডের (England) বিরুদ্ধে ম্যাঞ্চেস্টারের (Manchester Test) ময়দানে বুধবার একের পর এক স্বভাবোচিত কায়দায় উদ্ভট শটে চাপে ফেলে দিচ্ছিলেন ব্রিটিশ বোলারদের।
ঠিক সেই সময়ই অঘটন। ক্রিস ওকসের (Chris Woakes) ইয়র্কার তাঁর ডান পায়ের পাতায়… রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে বল ব্যাটের কিনারা ঘুরে সোজা গিয়ে লাগল বুটে।
সময় নষ্ট না করে তড়িঘড়ি ছুটে এলেন ফিজিও। জুতো খুলতেই দেখা গেল, গোড়ালি ও পায়ের পাতা ফুলে ঢোল। তীব্র যন্ত্রণায় মাঠেই গড়াগড়ি দিতে থাকেন পন্থ। ব্যথা এতটাই প্রবল ছিল যে, শেষমেশ গলফ কার্টে চাপিয়ে তাঁকে মাঠ ছাড়াতে হয়। প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে, পন্থের ‘মেটাটারসাল’ হাড়ে চিড় ধরেছে (Metatarsal Fracture)। আর তাই, শুধু এই টেস্ট নয়, বাকি সিরিজ থেকেও ছিটকে গেলেন ঋষভ।
কিন্তু কাকে বলে মেটাটারসাল? এটা ভেঙে গেলে কোন ধরনের অসুবিধা দেখা দেয়? চিড় জুড়তে কতদিন সময় লাগে? চিকিৎসা পদ্ধতিই বা কী?
শারীরবিদ্যা বলছে, মানুষের পায়ে পাঁচটি লম্বা হাড়। যেগুলিকে একত্রে মেটাটারসাল বলা হয়। এগুলি আঙুল ও গোড়ালির সংযোগ স্থাপন করে। আঘাত লাগলে, অতিরিক্ত ব্যবহারে কিংবা পায়ের গঠনে ত্রুটি থাকলেও এতে ফাটল বা ভাঙন ধরতে পারে। বিশেষত, বাইরের দিকে থাকা পঞ্চম মেটাটারসাল নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয়। এর ফ্র্যাকচারেরও আবার বিভিন্ন রকমফের রয়েছে। যেমন:
অ্যাভালশন ফ্র্যাকচার—সবচেয়ে সাধারণ। কোনও লিগামেন্ট বা টেন্ডন হাড়ের সামান্য অংশ টেনে ছিঁড়ে যায়। অনেক সময় একে গোড়ালি মচকানোর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়ে থাকে।
জোনস ফ্র্যাকচার—আকছার না ঘটলেও এই চোট সবচেয়ে চিন্তার। পায়ের এমন একটি জায়গায় হয়, যেখানে রক্ত সঞ্চালন কম। ফলে, একবার ভাঙলে সেরে উঠতে অনেকটা সময় লাগে। হঠাৎ আঘাত কিংবা অতিরিক্ত খেলার চাপে এই আঘাত দেখা দিতে পারে।
মিডশ্যাফ্ট বা ‘ডান্সারস ফ্র্যাকচার’—এই ধরনের ফ্র্যাকচার হয় হাড়ের মাঝখানে। সজোরে ধাক্কা বা পা মোচড়ানো সম্ভাব্য কারণ।
‘ক্লেভল্যান্ড ক্লিনিকে’র মতে, যে সমস্ত উপসর্গ থাকলে মেটাটারসাল ফ্র্যাকচারের সম্ভাবনা থাকে, সেগুলো হল: পায়ে সরাসরি ধাক্কা লাগা, পায়ের গঠনজনিত সমস্যা (যেমন: বেশি খাঁজযুক্ত পা), অতিরিক্ত দৌড়ঝাঁপ এবং পা মোচড়ানো বা ঘোরানো। ঋষভের ক্ষেত্রে এই উপসর্গগুলোর প্রায় সবই দেখা গেছে, যা দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে।
এর চিকিৎসা নির্ভর করে ফ্র্যাকচারের ধরণ, কতটা গুরুতর চোট, রোগীর বয়স, স্বাস্থ্য ও জীবনধারার উপর। যদি হাড় সরে গিয়ে না থাকে অর্থাৎ, ডিসপ্লেস না হয়, তাহলে সাধারণত প্লাস্টার করেই নিরাময় সম্ভব। ক্রাচ ব্যবহার করে, চাপ না দিয়ে হাঁটাচলা করা যেতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ের জোনস ফ্র্যাকচার থেকেও এভাবে অনেকে সেরে ওঠেন।
তবে যদি হাড় সরে যায় বা রোগী সাধারণ চিকিৎসায় সাড়া না দেন, তাহলে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। চিকিৎসকরা তখন স্ক্রু, রড বা প্লেট বসিয়ে হাড়কে ঠিক জায়গায় বসিয়ে দেন। বিশেষ করে মিডশ্যাফ্ট বা জটিল ফ্র্যাকচারের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি জরুরি।
পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার সময়সীমা চোটের ধরনভেদে আলাদা। অ্যাভালশন ফ্র্যাকচার সাধারণত ৬ থেকে ৮ সপ্তাহে সেরে যায়। জোনস ফ্র্যাকচার, যদি অস্ত্রোপচার লাগে, তাহলে সারতে ৩ মাসও লাগতে পারে। মিডশ্যাফ্ট ফ্র্যাকচারের জন্য দীর্ঘ বিশ্রাম ও ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন। চিকিৎসার সময় পা উঁচু করে রাখা, বরফ দেওয়া এবং অহেতুক চাপ না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, যাতে ফোলা ভাব কমে ও রোগী দ্রুত সেরে ওঠেন।