মোদ্দা বিষয়: সবাই বদলির পক্ষে, কিন্তু শর্ত-সহ। যেন কেউ অপব্যবহার করতে না পারে। কনকাশনে যখন ‘লাইক ফর লাইক’ চলে, তখন অন্য ক্ষেত্রেও নিয়ম রদবদলের দাবি তো উঠবেই।

ঋষভ পন্থ
শেষ আপডেট: 24 July 2025 15:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শেষ পাওয়া খবরে পায়ের হাড় ভেঙে শুধু ম্যাঞ্চেস্টার টেস্ট (Manchester Test) নয়, চলতি ইংল্যান্ড সিরিজ থেকেই ছিটকে গেলেন ঋষভ পন্থ (Rishabh Pant Injury)।
তাৎক্ষণিক প্রভাব বলতে, টিম ইন্ডিয়াকে (Team India) কার্যত দশজনে দুই ইনিংস ব্যাট করতে হবেন। পরিবর্ত উইকেটরক্ষক (সম্ভবত ধ্রুব জুরেল) কিপিং করতে পারবেন। কিন্তু ব্যাটিংয়ের অনুমতি পাবেন না। ফলে মরণ-বাঁচন ম্যাচের গোড়াতেই কার্যত ব্যাকফুটে ভারতীয় দল।
এর সুদূরপ্রসারী ফল এটাই যে, চলতি টেস্ট ভারত কোনওমতে জিতে গেলে সর্বশেষ ম্যাচ, যা কার্যত ফাইনাল লড়াই হতে চলেছে, সেখানে পন্থের বিকল্প খুঁজতে হবে। মারাত্মক দুর্ঘটনা পেরিয়ে আলোয় ফিরেছেন যিনি, তাঁর পক্ষে এহেন ভয়ংকর চোট কতটা গুরুতর, এর জবাব আগামী কয়েক সপ্তাহে মিলতে চলেছে।
আর এই দুই ধারার ফলাফল মিলিয়ে-মিশিয়ে উঠেছে সওয়াল উঠেছে: টেস্ট ক্রিকেটে ‘বদলি ব্যবস্থা’র এত সীমাবদ্ধতা কেন? এখন কি পুরাতন নিয়মের পরিবর্তন আনার সময় আসেনি?
আইসিসির ফরমান কী বলে? আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (ICC) টেস্ট খেলার আইন অনুযায়ী, চোট পাওয়া খেলোয়াড়ের জায়গায় নতুন কাউকে পুরোপুরি মাঠে নামানো যায় না। ফিল্ডিংয়ের সময় তিনি খেলতে পারেন ঠিকই। কিন্তু ব্যট বা বল করা বারণ। অধিনায়কত্বও নয়। উইকেটরক্ষক হিসেবে খেলতে হলে আম্পায়ারের অনুমতি লাগবে।
তবে চোটের ধরন নিয়ে একটি বড় ব্যতিক্রম আছে। কেবলমাত্র মাথায় আঘাত লাগলে পুরোদস্তুর পরিবর্ত ক্রিকেটার মাঠে নামতে পারেন। যাকে পরিভাষায় বলা হয় ‘কনকাশন সাবিস্টিটিউট’। ২০১৯ সাল থেকে চালু হয়েছে। এই নিয়মে বদলি খেলোয়াড় ব্যাট, বল দুটোই করতে পারেন। ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম কনকাশন সাব অস্ট্রেলিয়ার মার্নাশ ল্যাবুশেন। অ্যাসেজে স্টিভ স্মিথের মাথায় বল লাগার পর তিনি মাঠে নেমছিলেন।
কিছুদিনের জন্য, করোনার সময় ‘কোভিড বদলি’র নিয়মও চালু হয়। তবে অতিমারি চলে যাওয়ার পর এখন তা বাতিলের খাতায়।
প্রসঙ্গত, ক্রিকেটের যাবতীয় আইনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে লর্ডসের মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব (MCC)। ওদের নিয়ম অনুযায়ী যদিও বিপক্ষ অধিনায়কের অনুমতিক্রমে বদলি আনা সম্ভব। এমসিসি জানিয়েছে, নিয়মগুলি সময়োপযোগী রাখতে তারা সবসময় পর্যালোচনা করবে।
ইতিহাস বলছে, ঋষভ ব্যতিক্রম নন। চোট-আঘাত টেস্ট ম্যাচে হামেশাই প্রভাব ফেলেছে। ২০১৯ সালের অ্যাসেজ সিরিজের প্রথম টেস্টে চোট পান ইংল্যান্ডের জেমস অ্যান্ডারসন। মাত্র চার ওভার বল করে গোটা ম্যাচে আর খেলতেই পারেননি।
২০২৩-এ লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার স্পিনার নাথান লায়নও পায়ে চোট পেয়ে বাইরে চলে যান। এ বছর জিম্বাবোয়ের বোলার রিচার্ড এনগারাভাও ট্রেন্ট ব্রিজ টেস্টে পিঠে আঘাত পেয়ে মাত্র ৯ ওভার বল করতে পেরেছিলেন।
যদিও আহত অবস্থায় সাজঘরে ফিরে ফের মাঠে নেমে লড়াই চালিয়ে গেছেন অনেকে। ১৯৬৩ সালে ক্যারিবিয়ানদের বিরুদ্ধে ভাঙা হাতে ব্যাট করেন ইংল্যান্ডের কলিন কাউড্রে। ২০০৯ সালে সিডনিতে ভয়ংকর আঘাত পেয়েও দলের পরাজয় ঠেকাতে শেষ লগ্নে ব্যাট হাতে নেমেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রেম স্মিথ।
এই ধরনের ঘটনা ব্যকিক্রম এবং তা খেলার রোমাঞ্চ বাড়ায় ঠিকই। কিন্তু এটাই কি সমাধান? কেন পুরোপুরি বদলির নিয়ম আইসিসি এখনও লাগু করেনি? বাধা কোথায়? কারা আপত্তি তুলছে? প্রশ্ন উঠেছে।
আজ বলে নয়। অতীতেও কোনও দিন বদলি ব্যবস্থার চল ছিল না। তবে ‘সুপারসাব’ বলে একটা নিয়ম কিছুদিনের জন্য প্রবর্তিত হয়। ২০০৫ সালে হেডিংলিতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের বিক্রম সোলাঙ্কি প্রথম সুপারসাব হিসেবে নামেন। সেটা ছিল ওয়ান ডে ম্যাচ। আর এক বছরের মধ্যেই তা তুলে দেওয়া হয়।
যদিও টি-টোয়েন্টি লিগে এখনও বদলির ছোঁয়া আছে। আইপিএলে যার নাম ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’। নিয়ম অনুযায়ী: ম্যাচ চলাকালীন চারজন সাবস্টিটিউটের মধ্যে একজনকে খেলানো যায়। অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ-এ ‘এক্স-ফ্যাক্টর প্লেয়ার’ চালু ছিল ২০২০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত। তবে এ সবই কৌশলগত পরিবর্তন, চোটের জন্য নয়। আর টেস্টে তো এর ছিটেফোঁটা কিছুই দেখা যায় না।
ঋষভের চোট প্রশ্ন তুলেছে: এবার কি নিয়ম বদলানো উচিত? এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ইংল্যান্ডের প্রাক্তন অধিনায়ক মাইকেল ভনের বক্তব্য, ‘টেস্টের প্রথম ইনিংসে যদি কেউ চোট পান, তাহলে তাঁর বদলি খেলোয়াড় নামানো উচিত। একটা নিরপেক্ষ ডাক্তার থাকবেন মাঠে। তিনি যদি বলেন, এই খেলোয়াড় আর খেলতে পারবেন না, তাহলে পরিবর্ত খেলোয়াড় নামানো হোক। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে নয়। ওখানে চালাকি করার সুযোগ থাকে। কেউ প্রথমে চোট পেলে লড়াইটা একপেশে হয়ে যায়। দর্শক টাকা দিয়ে খেলা দেখতে আসেন। এই দিকটাও মাথায় রাখা দরকার!’
ভিক মার্কস, প্রাক্তন ইংল্যান্ড স্পিনার, বলেছেন, ‘খুব ভেবেচিন্তে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কেউ যেন এর অপব্যবহার না করে। মুখে শারীরিক সমস্যা বলে পরিবেশের সুবিধা নিতে বা কোনও খেলোয়াড় ফর্মে নেই বলে যেন বদলি না আনা হয়। রাগবিতে তো ‘নকল রক্ত’ পর্যন্ত দেখেছি। এটা ঠেকাতে কড়াকড়ি দরকার। তবেই বিষয়টা নিয়ে বিবেচনা করা যেতেই পারে!’
প্রাক্তন জিম্বাবুয়ে পেসার হেনরি ওলোঙ্গা আবার খোলাখুলি বদলির পক্ষে। তাঁর কথায়, ‘শুধু চোট নয়, কৌশলগত ভাবেও পরিবর্ত খেলোয়াড় আনা যাক। তবে সীমিত সংখ্যায়। কেন শুধু চোটে? যদি খেলা কোনও দিকে গড়ায়, তাহলে ফুটবলের মতো কৌশলগত বদলে আনা যেতে পারে! ধরা যাক, জোরে বোলার মার খাচ্ছেন, তাহলে স্পিনার নামিয়ে দিন। এই মত জনপ্রিয় হবে না, জানি। তবু এটাই আমার বক্তব্য!’
অর্থাৎ, মোদ্দা বিষয়: সবাই বদলির পক্ষে, কিন্তু শর্ত-সহ। যেন কেউ অপব্যবহার করতে না পারে। কনকাশনে যখন ‘লাইক ফর লাইক’ চলে, তখন অন্য ক্ষেত্রেও নিয়ম রদবদলের দাবি তো উঠবেই। সময়ের আর্জি—টেস্ট ক্রিকেটে বদলি ব্যবস্থার নতুন পরিভাষা আনা হোক। ক্রিকেটের প্রতিযোগিতার আঁচ তাতে বাড়বে। খেলাটা আরও যুগোপযোগী হয়ে উঠবে।