তিলক বর্মার মতো তরুণ ক্রিকেটার দেখিয়ে দিলেন—ধোনির স্কুল থেকে পাস করে আসা নতুন প্রজন্মও এবার বড় ময়দানের জন্য প্রস্তুত! তারা জানে, ফিনিশিং মানে একবগগা দাপট নয়, বরং বুদ্ধি, ধৈর্য আর নির্ভুল সময়জ্ঞানকে কাজে লাগানো!

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 30 September 2025 14:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শেষ ওভারে চার বল বাকি। দরকার মাত্র দু’রান। বল হাতে হ্যারিস রউফ এগিয়ে আসছেন। সামনে দাঁড়িয়ে এক তরুণ বাঁ-হাতি—তিলক বর্মা। গ্যালারি গর্জে উঠছে, ভারতীয় সমর্থকদের বুকভরা আশা।
সে আশা জলে যেতে দেননি তিলক। রউফের শর্ট পিচ বল দুরন্ত শট্র মাঠের বাইরে! এক লহমায় ফাইনালের উত্তেজনা মুছে গেল, ভারত চ্যাম্পিয়ন! খাতায়-কলমে তিলকের ওই ছক্কা ছিল প্রতীক্ষার ফুলস্টপ। কিন্তু আসল গল্প লেখা হয়েছিল তার অনেক আগেই।
এই ইনিংসের ব্যাখ্যা খুঁজতে হলে মনে পড়তে বাধ্য মহেন্দ্র সিং ধোনির নাম। ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ফিনিশারদের একজন। যে কোনও পরিস্থিতি ঠাণ্ডা মাথায় বোঝা, ঝুঁকি মেপে শট খেলা, সঠিক মুহূর্তে আঘাত হানা—ধোনির এই তিন মূলমন্ত্র যেন মুখস্থ করেই রবিবার মাঠে নেমেছিলেন তিলক।
তরুণ ব্যাটারের ৫৩ বলে ৬৯ রানের ইনিংস এশিয়া কাপ ফাইনালের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সত্যি বলতে, বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনী দেখাতে যাননি তিলক। বরং, মেলে ধরেন বুদ্ধিমত্তার এক ক্লাসিক উদাহরণ। ম্যাচের প্রথমার্ধে স্ট্রাইক রেট ধরে রেখেছিলেন ৯০-এর আশেপাশে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে যেখানে ব্যাটসম্যানদের ১৫০+ স্ট্রাইক রেটই দস্তুর সেখানে এই ধীরগতিকে অনেকেই হয়তো সন্দেহের চোখে দেখেছেন। কিন্তু তিলক জানতেন, শেষের ধাক্কা আসতে বাকি। ধোনির মতোই ধরে ফেলেন ম্যাচের পালস! ফিনিশিং মানে শুরু থেকেই ঝড় তোলা নয়, সঠিক সময়ে আঘাত হানা।
১৩তম ওভারের বিরতিতে শিবম দুবে এসে বলেছিলেন, ‘তুই থিতু থাক, আমি মারব।’ তিলক মাথা নেড়ে রাজিও হয়েছিলেন। কিন্তু যখন রউফকে পেলেন, তখনই তাঁর ভেতরের ইনস্টিংক্ট জেগে উঠল। প্রথমে এক হাফ-ভলি সামলে অসাধারণ ফ্লিক, তারপর বাউন্সারে নিখুঁত পুল শট—এক ওভারেই ১৭ রান তুলে ম্যাচের সমীকরণ পুরো ঘুরিয়ে দিলেন! লক্ষ্য তখন ৬৪ রান থেকে নেমে এল ৪৭-এ। পাকিস্তানি শিবিরে একরাশ দুশ্চিন্তা, ভারতীয় ডাগআউটে ফেরত এল আত্মবিশ্বাস।
ধোনির সবসময় বক্তব্য ছিল, ফিনিশারকে হতে হবে দাবার গ্র্যান্ডমাস্টারের মতো। প্রতিপক্ষের প্রতিটি চাল আগেভাগে পড়ে নিতে হবে। কোন বোলার কোন ভ্যারিয়েশন করবে, কোন ফিল্ডার কোথায় থাকবে, কোন বলে কেমন শট নিরাপদ—সবকিছু মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। তিলকের ব্যাটিংয়ে সেই ছাপ স্পষ্ট। স্পিনারদের বিরুদ্ধে তিনি ঝুঁকি নেননি। বরং, কেবল স্ট্রাইক রোটেট করে সিঙ্গল নিয়েছেন। স্লগ-সুইপ কিংবা সুইপ বেছে নিয়েছেন, সেটাও নির্দিষ্ট বোলারকে টার্গেট করে। মহম্মদ নওয়াজের বিপক্ষে এক বিধ্বংসী সুইপই ছিল তাঁর একমাত্র সীমার বাইরে মারা শট। বাকি সময় স্পিনারদের বিরুদ্ধে মেপে খেলে ডট বল মেনে নিতে অস্বস্তি হয়নি।
তিলকের মোদ্দা ব্যাটিং ফিলসফি একটাই—প্রতিটি বোলারকে আলাদা করে পড়া। শাহিন আফ্রিদির ইন-সুইং আর অফ-কাটারের সামনে তিনি ঝুঁকি নেননি। কিন্তু রউফ কিংবা ফাহিম আশরাফকে দেখামাত্রই ব্যাট চালিয়েছেন নির্ভয়ে। চার-ছক্কার ৯০ শতাংশ এসেছিল এই দুই বোলারের বিরুদ্ধে। এই নমনীয়তাই ম্যাচ ফিনিশিংয়ের চরিত্রলক্ষণ—সবাইকে নয়, প্রতিপক্ষ বেছে বেছে কেবল দুর্বল জায়গায় আঘাত হানো।
পুরো ইনিংসে তিনি ১৬টি ডট বল খেলেছেন। কিন্তু একবারও নার্ভাস হননি। বরং ঠিক সময়ে বাউন্ডারি বের করে ম্যাচকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। ৫৩ বলে ৬৯ রান, স্ট্রাইক রেট ১৩০। প্রথমে শ্লথ, কিন্তু শেষে হিসেবমাফিক গতি বাড়িয়েছেন। তিলকের কেরিয়ারের গড় স্ট্রাইক রেট ১৪৯, ফলে এদিনের ইনিংস স্বভাববিরুদ্ধে নয়। কেবল পরিস্থিতির দাবিতে নিজেকে বদলে নিয়েছিলেন মাত্র!
মাইকেল বেভান একবার বলেছিলেন, ‘ফিনিশার হিসেবে নামার সময় জেতার কথা ভাবা উচিত নয়। বরং টিকে থাকো, রান-রেটকে নিয়ন্ত্রণে রাখো, আর সঠিক সময়ে ঝাঁপাও!’ তিলক সেই নীতিতেই ব্যাট করেছেন। এশিয়া কাপ ফাইনালে তাঁর ইনিংস সত্যি বলতে, ম্যাচ ফিনিশিং পাঠ্যপুস্তকের নয়া অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
কোচ গৌতম গম্ভীর প্রকাশ্যে ‘ফিনিশার’ শব্দটা পছন্দ করেন না। কিন্তু অবাক করা বিষয় এই, যে তাঁর কোচিংয়ে এমন এক তরুণ উঠে এলেন, যিনি দায়িত্ব নিয়ে লড়াই খতম করতে জানেন! তিলকের মতো ব্যাটসম্যানই ভবিষ্যতের ভরসা। বহুমাত্রিক খেলোড়া। তিনি ওপেনার হতে পারেন, টপ-অর্ডারে খেলতে পারেন, আবার নিচে নেমে ম্যাচ শেষ করতেও সিদ্ধহস্ত!
এই ইনিংসে বড় ছক্কার সংখ্যা কম। কেবল চারটে ছয় আর চারটে চার। তবু প্রত্যেক বাউন্ডারি ছিল পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার অস্ত্র। তিনি হঠাৎ করে শট খেলেননি, বরং পুরো ইনিংসটাকে ছক কষে সাজিয়েছেন। যেন প্রতিটি বল তাঁর তৈরি নকশার অংশ। সেই কারণেই ভারত কখনও দিশেহারা হয়নি। লক্ষ্য যত দূরে মনে হোক না কেন, একেকটা সঠিক শটে তিনি দলকে টেনে এনেছেন লক্ষ্যের আরও কাছে।
এই জয় শুধুমাত্র একটি ট্রফি নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য এক দৃষ্টান্ত। কারণ তিলক বর্মার মতো তরুণ ক্রিকেটার দেখিয়ে দিলেন—ধোনির স্কুল থেকে পাস করে আসা নতুন প্রজন্মও এবার বড় ময়দানের জন্য প্রস্তুত! তারা জানে, ফিনিশিং মানে একবগগা দাপট নয়, বরং বুদ্ধি, ধৈর্য আর নির্ভুল সময়জ্ঞানকে কাজে লাগানো! ধোনির ফিনিশিং ম্যানুয়াল তিলক গুলে গেয়েছেন অক্ষরে অক্ষরে। এশিয়া কাপ ফাইনাল ছিল তারই ঝলক মাত্র—যেখানে ব্যাট হাতে এক তরুণ প্রমাণ করলেন, চাপের মুখে কীভাবে বরফের মতো ঠাণ্ডা থেকে জয় এনে দেওয়া যায়।