হঠাৎ উড়ে যাওয়া, নতুন পরিবেশ, বিশ্বকাপের চাপ—২৪ ঘণ্টায় নিজেকে দুম করে বদলে নেওয়া সহজ নয়। কিন্তু সিরাজের প্ল্যান ছিল সোজাসাপ্টা। কোনও নতুন অস্ত্র নয়, কোনও বাড়তি পরীক্ষা নয়।

মহম্মদ সিরাজ
শেষ আপডেট: 8 February 2026 10:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফেব্রুয়ারির প্ল্যান একেবারে পাকা ছিল। ১৫ তারিখ স্পেন উড়ে গিয়ে সান্তিয়াগো বের্নাবেউয়ে রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচ দেখা। তারপর পরিবার, রমজানের প্রস্তুতি, একটু বিশ্রাম। রঞ্জি ট্রফিতে হায়দরাবাদের নেতৃত্ব দিয়ে ঘরোয়া মরশুমে কাজের কাজ সেরে ফেলেছিলেন মহম্মদ সিরাজ (Mohammed Siraj)। টি-২০ বিশ্বকাপ ‘টু ডু লিস্টে’ ছিল না মোটেও।
কিন্তু ক্রিকেটে ভাগ্য কখনও কখনও বদলে যায়, ক্লাইম্যাক্স অপ্রত্যাশিত—আগাম সংকেত দিয়ে আসে না। সিরাজের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই হল। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় হিসেব বদল। বের্নাবেউয়ের টিকিট ঢুকে গেল ড্রয়ারে। উড়ানে চড়ার বদলে স্ট্রেট টিম ইন্ডিয়ার ড্রেসিংরুম! ডাক এল দেশের জার্সিতে নামার। সেটাও বিশ্বকাপে!
বের্নাবেউ থেকে ওয়াংখেড়ে—আকস্মিক!
ভারতের বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর ঠিক একদিন আগে, হায়দরাবাদে বাড়িতেই ছিলেন সিরাজ। গত দেড় বছর ধরে টি–২০ দলে জায়গা হয়নি। দ্বিপাক্ষিক সিরিজে না থাকা মানে বার্তাটা পরিষ্কার—এই বিশ্বকাপে তাঁর নাম নেই। সিরাজের নিজের জবানিতে, ‘আমি ভেবেই নিয়েছিলাম, এবার বিশ্বকাপ খেলব না।’
এমন সময় প্রথম মেসেজ আসে ভারতীয় সাপোর্ট স্টাফের এক সদস্যের কাছ থেকে—‘আপাতত প্ল্যান কী?’ সিরাজ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বিশ্রামে আছেন। রঞ্জির দু’টো চারদিনের ম্যাচ খেলেছেন। ভাবছেন স্পেনে যাবেন, ছুটিতে, রিয়ালের ম্যাচ স্টেডিয়ামে বসে দেখতে।
তারপর আকস্মিক দৃশ্যপট বদল। প্রস্তুতি ম্যাচে চোট পান হর্ষিত রানা (Harshit Rana)। বদলি চাই। কে আসবেন তাঁর জায়গায়? বৈঠকে বসেন নির্বাচকেরা। আর পছন্দের তালিকায় উঠে আসে সেই নাম, যিনি আগে টি-২০ বিশ্বকাপ জিতেছেন, বল হাতে বিশ্বস্ত মুখ, জানেন একা হাতে ম্যাচের রং বদলাতে—তিনি মহম্মদ সিরাজ!
‘সূর্য ভাই, মজা কোরো না’
প্রথম ফোনটা আসে অধিনায়কের থেকে। ওপারে সূর্যকুমার যাদব (Suryakumar Yadav)। বার্তা ছোট কিন্তু জোরালো—‘দেরি নয়। ব্যাগ গুছিয়ে ফেলো, চলে এসো।’ সিরাজের প্রথম প্রতিক্রিয়া? বিশ্বাস হয়নি। অকপট, ভণিতাহীন উত্তরটা বেরিয়ে আসে—‘সূর্য ভাই, মজা কোরো না। এটা হওয়ার কথা নয়।’ কিন্তু পরে বুঝতে পারেন কোনও রসিকতা নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই টিম ম্যানেজমেন্টের ফোন। খবর সত্যি, পাকা, ভেজাল নয়৷ টিম ইন্ডিয়ার হয়ে টি-২০ স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন তিনি! রিয়াল মাদ্রিদ ম্যাচ, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো—সব পিছিয়ে যায়। সিরাজের কথায়, ‘১৫ তারিখ রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচ দেখার কথা ছিল। কিন্তু ঈশ্বর যা লিখে রেখেছেন, সেটাই তো হয়।’
ময়দানে স্বপ্নের প্রত্যাবর্তন
হঠাৎ উড়ে যাওয়া, নতুন পরিবেশ, বিশ্বকাপের চাপ—২৪ ঘণ্টায় নিজেকে দুম করে বদলে নেওয়া সহজ নয়। কিন্তু সিরাজের প্ল্যান ছিল সোজাসাপ্টা। কোনও নতুন অস্ত্র নয়, কোনও বাড়তি পরীক্ষা নয়। বলেন, ‘রঞ্জিতে যে লাইন–লেন্থে বল করছিলাম, সেটাই ধরে রেখেছি। নতুন বলে উইকেট–টু–উইকেট।’ ফল মিলেছে হাতেনাতে। গতরাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। ভারতের জয়ে বড় ভূমিকা।
এই পারফরম্যান্সের গুরুত্ব আরও বেড়ে গিয়েছে ভারতের ব্যাটিং বিপর্যয়ে। ৭৭/৬ থেকে অধিনায়ক সূর্যকুমারের লড়াকু ইনিংসে ম্যাচে ফেরে দল। কিন্তু পাহাড়প্রমাণ কোনও টার্গেট দাঁড় করাতে পারেনি৷ দরকার ছিল দুরন্ত বোলিং। সিরাজ সেই কাজটাই করেছেন। তাঁর নতুন বল হাতে মারকাটারি স্পেলই রক্ষণের ভিত গড়ে দেয়। লড়াই শেষে টিম ইন্ডিয়ার পেসার বললেন, ‘আমি শুধু নিজের শক্তিতে ভরসা রেখেছিলাম। যেটা এতদিন আমায় সাফল্য এনে দিয়েছে!’
যে ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচ দেখার স্বপ্ন দিয়ে, তা বদলে গেল বিশ্বকাপের রোশনাইয়ে। বের্নাবেউ পরেও আসবে। কিন্তু বিশ্বকাপের এই ২৪ ঘণ্টার গল্প—হঠাৎ ডাক, উড়ান, তিন উইকেট—অমূল্য! নি:সন্দেহে সিরাজের কেরিয়ারে, রেকর্ড বুকে আলাদা জায়গা করে নেবে।