ঘরোয়া ক্রিকেট মানেই ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যতের শিকড়টা যে কতটা শক্ত, কোহলি–রোহিতের মতো তারকারা এই মঞ্চে নামার পর বোঝা যাচ্ছে—ভারতীয় খেলাধুলোর পরিসরে বিজয় হাজারের উত্তরাধিকার কতটা গভীরে প্রোথিত।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 25 December 2025 18:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আচমকাই ঘরোয়া ক্রিকেট ফিরে এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে। কারণটা খুব স্পষ্ট—দুই মহাতারকার উপস্থিতি। একজন বিরাট কোহলি (Virat Kohli)। অন্যজন রোহিত শর্মা (Rohit Sharma)। ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে নিজেদের ফিটনেস ও ফর্ম প্রমাণ করতে দুজনকেই নামতে হচ্ছে বিজয় হাজারে ট্রফিতে (Vijay Hazare Trophy)। অনেকটা অনিচ্ছের সিদ্ধান্ত। এত সাফল্য, এত খ্যাতির পর কে-ই বা স্বেচ্ছায় ‘ছোট’ টুর্নামেন্টে নামতে চায়? তবু বাস্তবটা এমনই।
গতকাল দুই তারকাই সেঞ্চুরি হাঁকালেন—দেশের দুই প্রান্তে। রোহিত খেললেন জয়পুরে, দর্শকের স্লোগানে মুখরিত মাঠে। আর কোহলি বেঙ্গালুরুর সেন্টার অফ এক্সিলেন্সে, রুদ্ধদ্বার ম্যাচ। এই বৈপরীত্যই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—টুর্নামেন্টের নেপথ্যে থাকা মানুষটি কে? যাঁর নামে এই প্রতিযোগিতা, সেই বিজয় হাজারে আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটে?
কে ছিলেন বিজয় হাজারে?
বিজয় স্যামুয়েল হাজারে (Vijay Samuel Hazare) ভারতীয় ক্রিকেটের এক নীরব স্তম্ভ। আধুনিক প্রচারের যুগের অনেক আগের ক্রিকেটার বলে তাঁর নামটা আজ অনেকের কাছেই ঝাপসা। অথচ ভারতের টেস্ট ইতিহাসে প্রথম জয়ের অধিনায়ক তিনিই। ১৯৫১–৫২ সালে মাদ্রাজে ইংল্যান্ডকে ইনিংস ও ৮ রানে হারিয়েছিল টিম ইন্ডিয়া—সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে নেতৃত্বে ছিলেন হাজারে।
ব্যাট হাতে তাঁর কৃতিত্ব আরও সমীহ জাগানোর মতো। ৩০টি টেস্টে ২ হাজার ১৯২ রান, গড় প্রায় ৪৮। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে গড় ৫৮-এর বেশি, ৬০টি শতরান, ১০টি ডাবল সেঞ্চুরি। প্রথম ভারতীয় হিসেবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরি, টেস্টে দু’ইনিংসেই সেঞ্চুরি—এমন বহু ‘প্রথমে’র সঙ্গে জড়িয়ে তাঁর নাম।
‘নেতৃত্ব’-ই কি আটকে দিল সর্বকালের সেরা হওয়া?
ক্রিকেট ইতিহাসে করুণ মূল্যায়ন, বিজয় মার্চেন্ট (Vijay Merchant) যাঁর অন্যতম প্রচারক, বলেছিলেন, ‘অধিনায়কত্বই হাজারেকে ভারতের সেরা ব্যাটার হতে দেয়নি!’ ‘উইজডেন’ও তাঁকে বর্ণনা করেছিল ‘শান্ত, অন্তর্মুখী’ মানুষ হিসেবে। নেতৃত্বের চাপ নাকি বিজয়ের ব্যাটিংকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
তবু এতকিছুর পরেও সংখ্যার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, এই ‘শান্ত’ ব্যাটারই কতটা উঁচু মানের খেলোয়াড় ছিলেন। ডন ব্র্যাডম্যানের (Donald Bradman) উইকেট তিনবার নেওয়ার কৃতিত্বও রয়েছে যাঁর ঝুলিতে, তাঁকে কি সহজে অবহেলা করা যায়?
কীভাবে এল বিজয় হাজারে ট্রফি?
ঘরোয়া একদিনের ক্রিকেট শুরু হয়েছিল ১৯৯৩–৯৪ মরশুমে, ‘রঞ্জি ওয়ান ডে ট্রফি’ নামে। প্রথম দিকে পুরোপুরি জোনাল প্রতিযোগিতা। ২০০২–০৩ থেকে জাতীয় স্তরে বিস্তার। বিজয় হাজারের প্রয়াণের পরে, ২০০৭–০৮ মরশুম থেকে ভারতীয় বোর্ড (Board of Control for Cricket in India) এই প্রতিযোগিতার নাম দেয় ‘বিজয় হাজারে ট্রফি’। আজ দেশের প্রধান ঘরোয়া ৫০ ওভারের টুর্নামেন্ট। ৩৮টি দল, একাধিক গ্রুপ, কোয়ার্টার–সেমিফাইনাল–ফাইনালের জটিল কাঠামো। যেখান থেকেই উঠে এসেছে বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, জসপ্রীত বুমরাহদের মতো তারকারা।
কোহলি–রোহিত কেন নামতে বাধ্য?
এই প্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধুনিক ক্রিকেটে ঘরোয়া ক্রিকেটকে অনেক সময়ই অবহেলা করা হয়। কিন্তু জাতীয় দলে জায়গা ধরে রাখতে হলে ম্যাচ প্র্যাকটিসের বিকল্প নেই। বিশ্বকাপের আগে তাই বোর্ডের স্পষ্ট বার্তা—ফর্ম প্রমাণ করতে হবে মাঠে নেমেই। ফলে বিজয় হাজারে ট্রফি শুধু ঘরোয়া টুর্নামেন্ট নয়। হয়ে উঠেছে জাতীয় দলে ফেরার মাপকাঠি। আর সেই সূত্রেই নতুন করে আলোয় ফিরে এসেছে বিজয় হাজারের নাম।
অবহেলা থেকে উত্তরাধিকার
যাঁর নামে এই ট্রফি, তিনি ছিলেন পরিসংখ্যানের বাইরের ক্রিকেটার। প্রচারের আলো এড়িয়ে নিজের কাজটুকু করে গেছেন। ঘরোয়া ক্রিকেট মানেই ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যতের শিকড়টা যে কতটা শক্ত, কোহলি–রোহিতের মতো তারকারা এই মঞ্চে নামার পর বোঝা যাচ্ছে—ভারতীয় খেলাধুলোর পরিসরে বিজয় হাজারের উত্তরাধিকার কতটা গভীরে প্রোথিত।